খণ্ড 74
ফন্ট:100%
থিম:

৬.১ ওয়েলফেয়ার স্টেট (Welfare State) ধারণার ইসলামি উদ্ভব: চ্যারিটি (Charity) থেকে প্রাতিষ্ঠানিক পাবলিক পলিসি (Public Policy)

১. প্রাক-ইসলামি আরবের আর্থ-সামাজিক নৈরাজ্য এবং ইসলামি কল্যাণরাষ্ট্রের পটভূমি


প্রাক-ইসলামি আরব উপদ্বীপের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ছিল চরম বৈষম্য, শোষণ এবং গোত্রীয় নৈরাজ্যে জর্জরিত। মক্কার কুরাইশ ও অন্যান্য প্রভাবশালী গোত্রগুলোর অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে উঠেছিল মূলত কুসীদ প্রথা বা সুদের (Riba) ব্যবসায়িক একচেটিয়া আধিপত্য এবং দুর্বল শ্রেণির শোষণের ওপর। সেখানে কোনো কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা বা রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী (Social Safety Net) ছিল না। অনাথ, বিধবা, দাস এবং নিঃস্ব মানুষের বেঁচে থাকা নির্ভর করত কেবল গোত্রপতির খেয়ালখুশি কিংবা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত দয়ার ওপর। এই নৈরাজ্যিক পরিস্থিতিতে মক্কার ধনিক শ্রেণি সম্পদ পুঞ্জীভূত করত, যার ফলে সমাজে এক গভীর অর্থনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হয়েছিল। ঐতিহাসিক শামস উদ্দিন আল-জাহাবি প্রাক-ইসলামি আরবের এই সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক দেউলিয়াত্বকে অত্যন্ত নিপুণভাবে চিত্রায়িত করেছেন [1]

তৎকালীন আরবের এই আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে পুঁজিপতিরা দরিদ্রদের ঋণগ্রস্ত করে তাদের দাসত্বে বাধ্য করত। এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ও তাত্ত্বিক আঘাত হানে ইসলাম। ইসলাম কেবল আধ্যাত্মিক সংস্কারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং একটি সুষম ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক সংস্কারের ডাক দেয়। আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে ইবনে কাসির উল্লেখ করেছেন যে, জাহিলি যুগের আরবরা দুর্বলদের অধিকার হরণ করাকে নিজেদের বীরত্ব মনে করত এবং সেখানে এতিম ও নারীদের সম্পত্তির কোনো অধিকার ছিল না [2] । এই চরম নৈরাজ্যের বিপরীতে রাসুলুল্লাহ সা. মক্কি জীবনেই ব্যক্তিগত চ্যারিটি বা দানের ধারণাকে উৎসাহিত করতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে মদিনায় গিয়ে একটি সুসংহত পাবলিক পলিসি বা রাষ্ট্রীয় নীতিতে রূপান্তরিত হয়।

ঐতিহাসিক সাফিউর রহমান মুবারকপুরী তাঁর বিখ্যাত সীরাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, প্রাক-ইসলামি আরবের গোত্রীয় যুদ্ধগুলোর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল অর্থনৈতিক সম্পদ ও চারণভূমির ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা [3] । এই অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা দূর করতে এবং একটি কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে ইসলামি দর্শনে সম্পদের ব্যক্তিমালিকানার পাশাপাশি তার সামাজিক দায়বদ্ধতাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। জাহিলি যুগের সেই অন্ধকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিবরণ দিতে গিয়ে ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন:

«كانت الجاهلية تعتمد على القوة والربا الفاحش، ولم يكن للضعيف ولا لليتيم حق في المجتمع حتى جاء الإسلام بالعدل والرحمة»

অনুবাদ: "জাহিলি সমাজ শক্তি এবং ভয়াবহ সুদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। সমাজে দুর্বল ও এতিমদের কোনো অধিকার ছিল না, যতক্ষণ না ইসলাম ন্যায়বিচার ও রহমত নিয়ে আবির্ভূত হয়।" [4] । এই ঐতিহাসিক সত্যটি প্রমাণ করে যে, ইসলামি কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণাটি কোনো শূন্যতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বরং তা ছিল তৎকালীন আরবের চরম অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে এক বৈপ্লবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প।

২. মদিনার সনদে সামাজিক নিরাপত্তা ও যৌথ দায়বদ্ধতার আইনি রূপরেখা


হিজরতের পর মদিনায় রাসুলুল্লাহ সা. যে ঐতিহাসিক সনদ (Constitution of Medina) প্রণয়ন করেন, তা কেবল একটি রাজনৈতিক চুক্তি ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম লিখিত সামাজিক নিরাপত্তা ও যৌথ দায়বদ্ধতার আইনি দলিল। এই সনদের মাধ্যমে মদিনার বহুত্ববাদী সমাজকে একটি একক রাজনৈতিক ও সামাজিক ইউনিটে (Ummah) রূপান্তর করা হয়। সনদের বিভিন্ন ধারায় সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য 'মাআকিল' (Ma'aqil) বা রক্তপণ এবং 'ফিদইয়াহ' (Fidyah) বা যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণের মতো বিষয়গুলোকে গোত্রীয় পর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক যৌথ দায়বদ্ধতার অধীনে আনা হয়। এটি ছিল আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় 'কালেক্টিভ সিকিউরিটি' (Collective Security) এবং 'সোশ্যাল ইন্সুরেন্স' (Social Insurance)-এর আদি রূপ।

মদিনার সনদের আইনি কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এতে প্রতিটি গোত্রের জন্য তাদের নিজস্ব দুর্বল ও ঋণগ্রস্ত সদস্যদের আর্থিক দায়িত্ব বহন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। ইবনে হিশাম তাঁর সীরাত গ্রন্থে সনদের মূল পাঠ সংরক্ষণ করেছেন, যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, কোনো গোত্রই তাদের কোনো সদস্যকে ঋণের দায়ে বা বন্দিদশার কারণে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারবে না [5] । ড. মুহাম্মাদ হামিদুল্লাহ তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, মদিনার সনদ ছিল বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান, যা নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তার আইনি গ্যারান্টি প্রদান করেছিল [6] । এই সনদের মাধ্যমে চ্যারিটি বা দানকে একটি ঐচ্ছিক বিষয় থেকে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বে উন্নীত করা হয়।

ইমাম আবু উবায়দ তাঁর 'কিতাবুল আমওয়াল' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মদিনার সনদের এই ধারাগুলো মদিনার নবগঠিত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল [7] । সনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা ছিল নিম্নরূপ:

«المهاجرون من قريش على ربعتهم يتعاقلون بينهم وهم يفدون عانيهم بالمعروف والقسط بين المؤمنين»

অনুবাদ: "কুরাইশ থেকে আগত মুহাজিরগণ তাদের পূর্বপ্রথা অনুযায়ী যৌথভাবে রক্তপণের দায়িত্ব বহন করবে এবং তারা নিজেদের মধ্যকার বন্দীদের মুক্তিপণ ন্যায়বিচার ও সদ্ব্যবহারের ভিত্তিতে পরিশোধ করবে।" [8] । এই আইনি বাধ্যবাধকতা প্রমাণ করে যে, ইসলামি কল্যাণরাষ্ট্রের ভিত্তি ছিল পারস্পরিক সহযোগিতা এবং রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যা আধুনিক পাবলিক পলিসির মূল চালিকাশক্তি।

৩. মুয়াখাত (ভ্রাতৃত্বকরণ): চ্যারিটি থেকে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে রূপান্তর


মদিনায় হিজরতের পর মুহাজিরদের পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য রাসুলুল্লাহ সা. যে 'মুয়াখাত' বা ভ্রাতৃত্বকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন, তা ছিল মানব ইতিহাসের এক অনন্য অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা। মক্কার মুহাজিরগণ তাদের সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি মক্কায় ফেলে সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায় মদিনায় এসেছিলেন। এই বিশাল শরণার্থী সংকট দূর করার জন্য রাসুলুল্লাহ সা. মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করেন। এটি কেবল কোনো সাময়িক লঙ্গরখানা বা চ্যারিটি ক্যাম্পের মতো ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচি ছিল না, বরং এটি ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (Economic Partnership) এবং সম্পদ পুনর্বণ্টন নীতি।

আনসার সাহাবিগণ রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাদের ঘরবাড়ি, জমি এবং খেজুর বাগান মুহাজির ভাইদের সাথে সমানভাগে ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু মুহাজিরগণ কেবল পরজীবী বা গ্রহীতা হিসেবে থাকতে চাননি। যেমন, আবদুর রহমান বিন আওফ রা. তাঁর আনসার ভাই সাদ ইবনুর রাবী রা.-এর অর্ধেক সম্পত্তি গ্রহণের প্রস্তাব বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, "আমাকে বাজারের পথ দেখিয়ে দিন" [9] । এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ইসলামি কল্যাণরাষ্ট্রের লক্ষ্য কেবল মানুষকে সাহায্য করা নয়, বরং তাকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। ড. আকরাম জিয়া আল-উমরি তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মুয়াখাত ব্যবস্থার মাধ্যমে মদিনার অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব গতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছিল এবং এটি সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল [10]

পবিত্র কুরআনে আনসারদের এই অতুলনীয় ত্যাগের প্রশংসা করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:

{وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ}

অনুবাদ: "আর যারা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে এই নগরীতে (মদিনায়) বসবাস করত এবং ঈমান এনেছিল, তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে এবং মুহাজিরদের যা দেওয়া হয়েছে তার জন্য নিজেদের অন্তরে কোনো ঈর্ষা পোষণ করে না। আর তারা নিজেদের ওপর তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়, নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও।" [11] । এই আয়াত এবং এর বাস্তব প্রয়োগ প্রমাণ করে যে, মুয়াখাত ছিল চ্যারিটির ঊর্ধ্বে উঠে একটি টেকসই অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা মডেল, যা সামষ্টিক কল্যাণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল [12]

৪. জাকাত ও সদকার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: পাবলিক পলিসি ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব


মক্কি জীবনে জাকাত ও সদকা ছিল মূলত একটি ব্যক্তিগত ও ঐচ্ছিক নৈতিক দায়িত্ব (Voluntary Charity)। কিন্তু হিজরি দ্বিতীয় সনে মদিনায় জাকাত ফরজ হওয়ার পর এবং পরবর্তীতে নবম হিজরিতে এর পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক রূপরেখা নির্ধারিত হওয়ার পর, এটি একটি রাষ্ট্রীয় কর ব্যবস্থা এবং বাধ্যতামূলক পাবলিক পলিসিতে (Public Policy) রূপান্তরিত হয়। জাকাত আর কোনো ব্যক্তিগত দয়ার বিষয় রইল না, বরং তা দরিদ্রদের আইনি অধিকারে পরিণত হলো। রাসুলুল্লাহ সা. জাকাত আদায় এবং তা সুনির্দিষ্ট খাতসমূহে বণ্টনের জন্য একটি সুসংহত প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলেন। তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে 'আমিল' বা জাকাত সংগ্রাহক নিয়োগ করেন, যা ছিল ইসলামি কল্যাণরাষ্ট্রের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক রাজস্ব ও বণ্টন বিভাগ।

রাসুলুল্লাহ সা. যখন মুয়াজ ইবনে জাবাল রা.-কে ইয়ামেনে পাঠান, তখন তাঁকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিলেন যে, জাকাত কীভাবে আদায় ও বণ্টন করতে হবে। সহিহ বুখারিতে এই ঐতিহাসিক নির্দেশনাটি সংরক্ষিত রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, জাকাত ধনীদের কাছ থেকে আদায় করে সেই অঞ্চলের দরিদ্রদের মাঝেই বণ্টন করতে হবে [13] । ইমাম আল-মাওয়ার্দি তাঁর 'আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, জাকাত ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণের দায়িত্ব গ্রহণ করে [14] । এটি ছিল আধুনিক 'ডিস্ট্রিবিউটিভ জাস্টিস' (Distributive Justice) বা বণ্টনমূলক ন্যায়বিচারের এক অনন্য বাস্তবায়ন।

পবিত্র কুরআনে জাকাত বণ্টনের আটটি সুনির্দিষ্ট খাত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় বাজেটের সামাজিক নিরাপত্তা খাতের মতো কাজ করে:

{إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ}

অনুবাদ: "নিশ্চয়ই সদকা (জাকাত) হচ্ছে কেবল ফকির, মিসকিন, জাকাত আদায়কারী কর্মচারী, যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা প্রয়োজন তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরয।" [15] । এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্র নিশ্চিত করেছিল যে, সম্পদের প্রবাহ যেন কেবল ধনীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং তা যেন সমাজের সর্বনিম্ন স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায় [16]

৫. অমুসলিম নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা: জিযিয়া ও যিম্মি ব্যবস্থার মানবিক উপযোগিতা


ইসলামি কল্যাণরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কেবল মুসলিম নাগরিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা অমুসলিম নাগরিকদের (Dhimmi) জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য ছিল। অমুসলিম নাগরিকগণ রাষ্ট্রে জিযিয়া কর প্রদানের বিনিময়ে সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেত এবং তাদের জান, মাল ও ধর্মীয় স্বাধীনতার পূর্ণ নিরাপত্তা রাষ্ট্র গ্রহণ করত। যদি কোনো অমুসলিম নাগরিক বার্ধক্য, পঙ্গুত্ব বা দারিদ্র্যের শিকার হতো, তবে ইসলামি রাষ্ট্র কেবল তার জিযিয়া মওকুফই করত না, বরং রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে তার ও তার পরিবারের সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা নিশ্চিত করত। এটি ছিল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বজনীন মানবাধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তার এক অনন্য ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।

ড. ওয়াহবাহ আল-জুহায়লি তাঁর বিখ্যাত 'আল-ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহু' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার ও নিরাপত্তা ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ় এবং রাষ্ট্র তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে বাধ্য ছিল [17] । এই নীতির সবচেয়ে উজ্জ্বল ঐতিহাসিক উদাহরণ পাওয়া যায় খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. কর্তৃক হিরার খ্রিস্টান নাগরিকদের সাথে সম্পাদিত চুক্তিতে। ইমাম আবু ইউসুফ তাঁর 'কিতাবুল খারাজ' গ্রন্থে এই চুক্তির মূল পাঠটি উদ্ধৃত করেছেন, যা ইসলামি কল্যাণরাষ্ট্রের সর্বজনীনতার এক অকাট্য দলিল [18] । ইবনে আল-কাইয়্যিমও তাঁর গ্রন্থে অমুসলিমদের প্রতি ইসলামি রাষ্ট্রের এই মানবিক ও আইনি দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তারিত আলোচনা করেছেন [19]

খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. কর্তৃক সম্পাদিত সেই ঐতিহাসিক চুক্তির বিবরণ নিম্নরূপ:

«وإن عجز عن العمل أو أصابته آفة من الآفات، أو كان غنياً فافتقر... طرحت جزيته وعيل من بيت مال المسلمين وعياله»

অনুবাদ: "যদি কোনো অমুসলিম নাগরিক বার্ধক্যের কারণে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, অথবা কোনো দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, কিংবা সে ধনী ছিল কিন্তু পরবর্তীতে দরিদ্র হয়ে পড়ে... তবে তার জিযিয়া মওকুফ করা হবে এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তাকে ও তার পরিবারকে জীবিকা নির্বাহের ভাতা প্রদান করা হবে।" [20] । এই নীতিটি প্রমাণ করে যে, রাসুলুল্লাহ সা. যে কল্যাণরাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা ছিল ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার কল্যাণে নিবেদিত এক অনন্য পাবলিক পলিসি, যা আধুনিক বিশ্বের যেকোনো কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি মানবিক ও সুদূরপ্রসারী ছিল।

""
৬.১ ওয়েলফেয়ার স্টেট (Welfare State) ধারণার ইসলামি উদ্ভব: চ্যারিটি (Charity) থেকে প্রাতিষ্ঠানিক পাবলিক পলিসি (Public Policy)
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

৬.১ ওয়েলফেয়ার স্টেট (Welfare State) ধারণার ইসলামি উদ্ভব: চ্যারিটি (Charity) থেকে প্রাতিষ্ঠানিক পাবলিক পলিসি (Public Policy) কুইজ

1 / 5

প্রাক-ইসলামি আরবে গোত্রীয় যুদ্ধগুলোর অন্যতম প্রধান কারণ কী ছিল?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...