৯.১.১ কনফিউজড সিটিজেনস (Confused Citizens): যারা সুবিধাবাদী কিন্তু অ্যাক্টিভ কন্সপিরেটর (Active Conspirator) নয়
মদিনার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যখন ইসলামের বিজয় ও স্থিতিশীলতা অর্জিত হচ্ছিল, তখন সমাজ কেবল মুমিন এবং মুনাফিক—এই দুই মেরুর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং একটি অত্যন্ত জটিল ও ধূসর এলাকা (Gray Area) বিদ্যমান ছিল, যেখানে এমন এক শ্রেণির মানুষ বাস করত যারা সরাসরি ইসলামের বিরুদ্ধে কোনো সক্রিয় ষড়যন্ত্র বা রাজনৈতিক চক্রান্ত (Active Conspiracy) পরিচালনা করত না, কিন্তু তাদের আদর্শিক অবস্থান ছিল চরম অনিশ্চিত ও দ্বিধাগ্রস্ত। এই শ্রেণির মানুষগুলোকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় 'কনফিউজড সিটিজেনস' বা বিভ্রান্ত নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এরা মূলত সুবিধাবাদী (Opportunistic), যারা পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে দ্বিধা বোধ করে না। তারা ইসলামের মূল আদর্শের প্রতি অবিচল নয়, বরং ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সামাজিক নিরাপত্তার সন্ধানে সর্বদা অস্থির থাকে।
এই বিভ্রান্ত নাগরিকরা মুনাফিকদের মতো সুপরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল না, কিন্তু তাদের এই 'নিষ্ক্রিয়তা' বা 'দ্বিধাগ্রস্ততা' রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সামাজিক সংহতির জন্য একটি নীরব হুমকি হিসেবে কাজ করত। তারা মূলত এমন এক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থায় ছিল যেখানে তারা সত্যকে চেনে, কিন্তু সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস বা দায়বদ্ধতা তাদের নেই। তাদের এই আচরণ মূলত একটি রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা তৈরি করেছিল, যা পরবর্তীতে উম্মাহর আদর্শিক সুরক্ষা (تحصين الأمة) নিশ্চিত করার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল [1] ।
'আল-দাহমা' (الدهماء) এবং জনস্রোতের অস্থিরতা ও আদর্শিক শূন্যতা
মদিনার জনসমষ্টির মধ্যে একটি বিশাল অংশ ছিল যারা কোনো সুনির্দিষ্ট আদর্শ বা রাজনৈতিক দর্শনে আবদ্ধ ছিল না। ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক পরিভাষায় এই অসংগঠিত ও লক্ষ্যহীন জনস্রোতকে বলা হয় 'আল-দাহমা' (الدهماء)। এই শ্রেণির মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাদের মধ্যে কোনো সুদৃঢ় আদর্শিক ভিত্তি বা 'ইমানি' দৃঢ়তা নেই, যার ফলে তারা যেকোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঢেউয়ে গা ভাসিয়ে দিতে পছন্দ করে।
الدهماء: جماعة الناس. [2] এই 'আল-দাহমা' বা সাধারণ জনস্রোতের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা মূলত 'ম্যাস সাইকোলজি' বা জনস্রোতের মনস্তত্ত্ব দ্বারা চালিত হয়। তারা কোনো নির্দিষ্ট নেতা বা আদর্শের অনুসারী হওয়ার চেয়ে পরিস্থিতির সুবিধা গ্রহণকারী হিসেবে বেশি পরিচিত ছিল। যখন ইসলামের বিজয় নিশ্চিত হচ্ছিল, তখন তারা মুমিনদের কাতারে শামিল হওয়ার চেষ্টা করত, আবার যখন মক্কার কুরাইশদের চাপ বৃদ্ধি পেত, তখন তারা এক প্রকারের নীরবতা বা নিষ্ক্রিয়তা অবলম্বন করত। এই শ্রেণির মানুষের এই অস্থিরতা রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি (Geopolitical Risk) তৈরি করত, কারণ যুদ্ধের ময়দানে বা সংকটের মুহূর্তে এই বিশাল জনতা কোনো সুনির্দিষ্ট রণকৌশল বা সংহতি প্রদর্শন করতে পারত না।
তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই 'আল-দাহমা' শ্রেণির উপস্থিতি উম্মাহর আদর্শিক সুরক্ষা বা 'تحصين الأمة' (Fortification of the Ummah)-এর প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছিল। কারণ, একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয় যখন তার নাগরিকরা আদর্শিক ও নৈতিকভাবে সুসংহত থাকে। কিন্তু এই বিভ্রান্ত নাগরিকরা যখন কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের পরিবর্তে কেবল পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিত, তখন তারা অজান্তেই উম্মাহর ভেতরে একটি আদর্শিক দুর্বলতা বা 'আদর্শিক ছিদ্রতা' তৈরি করত, যা ধ্বংসাত্মক চিন্তাধারা (الأفكار الهدامة) প্রবেশের পথ প্রশস্ত করে দিত [3] ।
'আশআব আত-তামি' (Ash'ab al-Tami') এবং সুবিধাবাদের মনস্তাত্ত্বিক স্বরূপ
কনফিউজড সিটিজেনস বা বিভ্রান্ত নাগরিকদের একটি বড় অংশ ছিল চরম সুবিধাবাদী। এই শ্রেণির মানুষের মনস্তাত্ত্বিক চালিকাশক্তি ছিল ব্যক্তিগত লাভ ও জাগতিক নিরাপত্তা। ঐতিহাসিক বর্ণনায় এই ধরনের সুবিধাবাদী ও লোভী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে 'আশআব আত-তামি' (أشعب الطامع) বা 'লোভী আশআব'-এর বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে। যদিও আশআব একটি নির্দিষ্ট নাম হিসেবে পরিচিত, কিন্তু এটি একটি বৃহত্তর মনস্তাত্ত্বিক প্রতিচ্ছবি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা এমন এক ব্যক্তিকে নির্দেশ করে যে কেবল নিজের স্বার্থ ও লোভ (Greed) চরিতার্থ করতে চায়।
وفيهَا: مَاتَ أشعب الطامع. [4] এই 'তামি' বা লোভী মানসিকতা নাগরিকদের মধ্যে একটি বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিচ্যুতি ঘটায়। তারা ইসলামের দাওয়াত বা সামাজিক ন্যায়বিচারের চেয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিত। তারা মুনাফিকদের মতো সক্রিয়ভাবে ইসলামের বিরুদ্ধে কোনো তলোয়ার তুলত না, কিন্তু যখনই ইসলামের কোনো নীতি তাদের ব্যক্তিগত লাভের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াত, তখনই তারা কৌশলে সেই নীতি থেকে বিচ্যুত হতো অথবা নীরবতা পালন করত। এই ধরনের 'সুবিধাবাদী নিষ্ক্রিয়তা' (Opportunistic Passivity) রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংহতিকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে ফেলে।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই শ্রেণির মানুষের মধ্যে 'নৈতিক দ্বিধা' (Moral Ambiguity) প্রবল ছিল। তারা সত্যকে অস্বীকার করত না, কিন্তু সত্যের জন্য ত্যাগ স্বীকার করার মানসিকতা তাদের ছিল না। তাদের এই 'লোভী মনস্তত্ত্ব' বা 'তামা' (الطمع) নাগরিকদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতামূলক ও আত্মকেন্দ্রিক পরিবেশ তৈরি করত, যা সামাজিক সংহতি বা 'Collective Security'-র ধারণার পরিপন্থী। ফলে, মদিনার সামাজিক কাঠামোয় এই শ্রেণির উপস্থিতি একটি অদৃশ্য বিভাজন রেখা তৈরি করেছিল, যা মুমিনদের ত্যাগ ও ত্যাগের আদর্শের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল।
'হুমাাতুল আদবার' (Humat al-Adbar) এবং রাজনৈতিক ও সামরিক নিষ্ক্রিয়তা
কনফিউজড সিটিজেনস বা বিভ্রান্ত নাগরিকদের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপটি প্রকাশ পেত তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক আচরণের মাধ্যমে। এই শ্রেণির মানুষরা যুদ্ধের ময়দানে বা সংকটের মুহূর্তে সম্মুখভাগে লড়াই করার পরিবর্তে পশ্চাদপসরণ বা পলায়নের পথ বেছে নিত। এই ধরনের আচরণকারী বা যারা কেবল পলায়নের পথ বা পশ্চাদভাগ রক্ষা করতে ব্যস্ত থাকে, তাদের ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক পরিভাষায় বলা হয় 'হুমাাতুল আদবার' (حماة الأدبار)।
حماة الأدبار: الذين يحمون أعقاب الناس. [5] এই 'হুমাাতুল আদবার' বা 'পশ্চাদভাগ রক্ষাকারী'দের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এরা মূলত সেইসব নাগরিক যারা রাষ্ট্রের সংকটের মুহূর্তে কোনো দায়িত্ব গ্রহণ না করে বরং নিজেদের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় পলায়নপর বা 'Retreatist' হিসেবে কাজ করে। তারা সক্রিয়ভাবে শত্রুর সাথে হাত মেলায় না, কিন্তু তাদের এই পলায়নপর মানসিকতা বা 'Cowardly Neutrality' যুদ্ধের ময়দানে মুমিনদের জন্য একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি করে। যখন মুমিনরা সম্মুখভাগে লড়াই করছিল, তখন এই শ্রেণির মানুষের এই নিষ্ক্রিয়তা বা পশ্চাদপসরণ করার প্রবণতা যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ও কৌশলগত ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করত।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানের ভাষায়, এই শ্রেণির আচরণকে 'Passive Sabotage' বা 'নিষ্ক্রিয় অন্তর্ঘাত' হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে। তারা সরাসরি কোনো আক্রমণ না করলেও, তাদের এই পলায়নপরতা বা দায়িত্বহীনতা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিত। এই 'হুমাাতুল আদবার' শ্রেণির উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কেবল সম্মুখভাগের যোদ্ধাদের ওপর নির্ভর করে না, বরং নাগরিকদের নৈতিক দৃঢ়তা ও দায়িত্ববোধের ওপরও নির্ভর করে। এই শ্রেণির মানুষের lack of commitment বা অঙ্গীকারহীনতা মদিনার সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছিল।
পরিশেষে, এই বিভ্রান্ত নাগরিক বা কনফিউজড সিটিজেনসদের বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তারা কোনো সক্রিয় শত্রু না হয়েও রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি হিসেবে কাজ করত। তাদের 'আল-দাহমা' বা জনস্রোতের অস্থিরতা, 'আশআব আত-তামি' বা সুবিধাবাদী লোভ এবং 'হুমাাতুল আদবার' বা পলায়নপর মানসিকতা—এই তিনটি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত একটি মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো উম্মাহর আদর্শিক ও রাজনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল। এই শ্রেণির মানুষের অস্তিত্বই প্রমাণ করে যে, একটি আদর্শিক রাষ্ট্র গঠনের পথে কেবল বাহ্যিক শত্রু নয়, বরং অভ্যন্তরীণ আদর্শিক শূন্যতা ও সুবিধাবাদও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করে।