৯.৩ যুদ্ধ ও শান্তির বিধান: প্যাসিফিজম (Pacifism) থেকে ডিফেন্সিভ রিয়েলিজম (Defensive Realism)-এ উত্তরণ
ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ ও শান্তির বিধান কেবল ধর্মীয় আদেশের প্রতিফলন নয়, বরং এটি ছিল একটি উদীয়মান রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষা এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার এক সুনিপুণ ভূ-রাজনৈতিক কৌশল। নবি মুহাম্মাদ সা.-এর জীবনচরিত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁর রণকৌশল ও শান্তিপ্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিবর্তন ঘটেছে। এই বিবর্তনটি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় 'প্যাসিফিজম' বা চরম অহিংসাবাদ থেকে 'ডিফেন্সিভ রিয়েলিজম' বা প্রতিরক্ষামূলক বাস্তববাদের দিকে উত্তরণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। প্যাসিফিজম যেখানে যুদ্ধের সম্পূর্ণ বর্জন এবং চরম শান্তির কথা বলে, সেখানে ডিফেন্সিভ রিয়েলিজম নির্দেশ করে যে, একটি রাষ্ট্র তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য সামরিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, তবে তা কখনোই আগ্রাসনের উদ্দেশ্যে নয়।
শান্তির অগ্রাধিকার ও প্যাসিফিজমের আদর্শিক ভিত্তি
ইসলামের মূল দর্শন শান্তি এবং সহাবস্থানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। নবি মুহাম্মাদ সা.-এর সামগ্রিক জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি ছিল শান্তি স্থাপন। তিনি সর্বদা শান্তি স্থাপনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন, এমনকি যখন তাঁর চারপাশের পরিবেশ চরম প্রতিকূল ছিল এবং তাঁর অনেক সাহাবি রা. সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য উদগ্রীব ছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি প্যাসিফিজমের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে যুদ্ধের চেয়ে শান্তিকে অধিকতর শ্রেয় মনে করা হয়। রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই শান্তিপ্রীতি কেবল আবেগীয় সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত সিদ্ধান্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, যুদ্ধের চেয়ে শান্তির পরিবেশেই ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য এবং সত্য মানুষের কাছে অধিকতর স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়।
শান্তির এই অগ্রাধিকারের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হলো হুদায়বিয়ার সন্ধি। এই সন্ধির শর্তাবলি আপাতদৃষ্টিতে মুসলিমদের জন্য প্রতিকূল মনে হলেও, নবি মুহাম্মাদ সা. অত্যন্ত ধৈর্য ও দূরদর্শিতার সাথে তা গ্রহণ করেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, শান্তি কেবল সংঘাতের অনুপস্থিতি নয়, বরং এটি একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে যা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রসারে সহায়তা করে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, হুদায়বিয়ার সন্ধির পরবর্তী শান্তি যুগে ইসলামের প্রসার যুদ্ধের যুগের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। [1] কুরআনের নির্দেশনাবলিও এই শান্তির দর্শনের প্রতি ইঙ্গিত করে। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন যে, যদি শত্রু পক্ষ শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে মুসলিমদেরও শান্তির পথ অবলম্বন করতে হবে। পবিত্র কুরআনের এই নির্দেশনাটি হলো:
وَإِنْ جَنَحُوا لِلسَّلْمِ فَاجْنَحْ لَها [2] । এই ইবারতটি প্রমাণ করে যে, ইসলামে শান্তি স্থাপন করা কেবল একটি রাজনৈতিক পছন্দ নয়, বরং এটি একটি ধর্মীয় ইবাদত এবং ঐশ্বরিক নির্দেশ। রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর শত্রুদের পক্ষ থেকে আসা প্রতিটি শান্তি প্রস্তাবকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতেন এবং উৎসাহিত করতেন, যা তাঁর প্যাসিফিস্টিক প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ।
ডিফেন্সিভ রিয়েলিজমে উত্তরণ: অস্তিত্ব রক্ষার কৌশল
প্যাসিফিজম বা অহিংসাবাদ আদর্শিক দিক থেকে মহৎ হলেও, একটি বাস্তব রাষ্ট্রব্যবস্থায় যেখানে বহিঃশত্রুরা প্রতিনিয়ত আক্রমণ করার ষড়যন্ত্র করে, সেখানে কেবল অহিংসতা দিয়ে রাষ্ট্র রক্ষা করা অসম্ভব। মদিনার রাষ্ট্রব্যবস্থা যখন প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন নবি মুহাম্মাদ সা. উপলব্ধি করলেন যে, মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অপরিহার্য। এখানেই তাঁর কৌশলের পরিবর্তন ঘটে এবং তিনি 'ডিফেন্সিভ রিয়েলিজম' বা প্রতিরক্ষামূলক বাস্তববাদের নীতি গ্রহণ করেন। ডিফেন্সিভ রিয়েলিজমের মূল কথা হলো—রাষ্ট্র তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে, কিন্তু তা হবে কেবল আত্মরক্ষার জন্য, সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য নয়।
ইসলামে শান্তির অর্থ কখনোই আত্মসমর্পণ নয়। রাসুলুল্লাহ সা.-এর রণকৌশল ছিল অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ; তিনি তাদের সাথে শান্তি স্থাপন করতেন যারা শান্তির প্রস্তাব দিত, কিন্তু যারা আক্রমণ করত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলতেন। এই দর্শনের মূল কথাটি হলো:
يسالم من يسالمه ويعادي من يعاديه، ولكنه لا يعتدي على أحد ولا يظلم أحدا، ولا يرتضي للمسلمين الظلم والعدوان [3] । অর্থাৎ, তিনি তাঁর সাথে শান্তি স্থাপনকারীর সাথে শান্তি বজায় রাখতেন এবং শত্রুর সাথে শত্রুতা করতেন, তবে তিনি কখনোই কারো ওপর অন্যায়ভাবে আক্রমণ করেননি এবং মুসলিমদের ওপর অন্যায় ও আগ্রাসন মেনে নেননি।
এই উত্তরণটি ছিল অত্যন্ত যৌক্তিক এবং বাস্তবসম্মত। একটি রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। তাই নবি মুহাম্মাদ সা. যুদ্ধের বিধানকে একটি 'ব্যতিক্রম' হিসেবে গণ্য করেছেন, যেখানে শান্তি হলো 'মূল নিয়ম' বা বেসলাইন। যুদ্ধের এই সীমিত প্রয়োগ প্রমাণ করে যে, ইসলাম যুদ্ধের মাধ্যমে জয়লাভের চেয়ে শান্তির মাধ্যমে হৃদয় জয় করার বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। তবে যখন অস্তিত্বের সংকট তৈরি হয়, তখন ডিফেন্সিভ রিয়েলিজমের আলোকে সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা কেবল অধিকার নয়, বরং দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধের নৈতিক ও মানবিক মানদণ্ড
নবি মুহাম্মাদ সা. যখন ডিফেন্সিভ রিয়েলিজমের নীতিতে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন, তখন তিনি যুদ্ধের জন্য এমন কিছু কঠোর নৈতিক নীতিমালা প্রণয়ন করেছিলেন যা আধুনিক আন্তর্জাতিক মানবিক আইন (International Humanitarian Law) এর সাথে আশ্চর্যজনকভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। তাঁর লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের ভয়াবহতাকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং যুদ্ধের মধ্যেও মানবিকতা বজায় রাখা। তিনি স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, যুদ্ধে কেবল সেই ব্যক্তিরাই লক্ষ্য হবে যারা সরাসরি লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছে। সাধারণ বেসামরিক নাগরিক, নারী, শিশু এবং বৃদ্ধদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল তাঁর যুদ্ধের অন্যতম প্রধান শর্ত।
মুতা যুদ্ধে যাওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর সেনাপতিদের যে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তা ইসলামের যুদ্ধনীতির মানবিক দিকটি ফুটিয়ে তোলে। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন নারী, শিশু এবং অন্ধ ব্যক্তিদের হত্যা না করা হয়, ঘরবাড়ি ধ্বংস না করা হয় এবং এমনকি গাছপালাও কাটা না হয়। [4] । এই নির্দেশনাটি প্রমাণ করে যে, ইসলাম যুদ্ধের সময়ও পরিবেশ এবং অসামরিক জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। পবিত্র কুরআনের এই মূলনীতি এখানে কার্যকর হয়:
وَلا تَزِرُ وازِرَةٌ وِزْرُ أُخْرى [5] । অর্থাৎ, কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি অন্য কারো অপরাধের জন্য দণ্ডিত হবে না।
যুদ্ধের ময়দানে বন্দিদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রেও নবি মুহাম্মাদ সা. এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বদর যুদ্ধে যখন সত্তর জন কুরাইশ বন্দি করা হয়, তখন তিনি তাঁদের সাথে অত্যন্ত সদয় আচরণ করার নির্দেশ দিয়ে বলেন:
استوصوا بالأسارى خيرا [6] । তিনি বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার জন্য অর্থ গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু যারা দরিদ্র ছিল তাদের নিঃশর্ত মুক্তি দিয়েছিলেন। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, যারা শিক্ষিত ছিল তাদের জন্য শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে, তারা যদি মুসলিম শিশুদের পড়তে ও লিখতে শেখায়, তবে তারা মুক্তি পাবে। এটি ছিল যুদ্ধের ময়দানে শিক্ষার জয় এবং শত্রুর প্রতি চরম সহমর্মিতার বহিঃপ্রকাশ।
যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার
ডিফেন্সিভ রিয়েলিজমের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা, যাতে ভবিষ্যতে কেউ অনুরূপ অপরাধ করার সাহস না পায়। রাসুলুল্লাহ সা. বন্দিদের সাথে সদয় আচরণ করলেও, যারা চরম যুদ্ধাপরাধী ছিল তাদের ক্ষেত্রে তিনি কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। বদর যুদ্ধের বন্দিদের মধ্যে দুজন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, কারণ তারা মুসলিমদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিল এবং ইসলামের চরম অবমাননা করেছিল। আধুনিক সামরিক পরিভাষায় এদের 'ওয়ার ক্রিমিনাল' বা যুদ্ধাপরাধী বলা হয়। তাদের শাস্তি ছিল তাদের ব্যক্তিগত অপরাধের ফল, বন্দি হওয়ার কারণে নয়। [7] ।
এছাড়া, যুদ্ধের ময়দানে আহত শত্রুদের প্রতিও রাসুলুল্লাহ সা.-এর করুণা ছিল অতুলনীয়। বদর যুদ্ধে আহত মুশরিকদের চিকিৎসার জন্য মুসলিমরা সমানভাবে যত্নবান ছিল। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামে চিকিৎসা এবং জীবন রক্ষা করা একটি মানবিক দায়িত্ব, যা শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবার জন্য প্রযোজ্য। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি যুদ্ধের ভয়াবহতাকে প্রশমিত করে এবং শত্রুপক্ষের মনেও ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তৈরি করে। [8] ।
নবি মুহাম্মাদ সা.-এর এই সামগ্রিক রণকৌশল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি প্যাসিফিজমের আদর্শিক উচ্চতা এবং ডিফেন্সিভ রিয়েলিজমের বাস্তব প্রয়োজনীয়তার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। তিনি শান্তিকে সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন, কিন্তু সেই শান্তি অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অবহেলা করেননি। তাঁর এই ভারসাম্যপূর্ণ নীতি কেবল একটি রাষ্ট্র গঠন করেনি, বরং যুদ্ধের ময়দানেও নৈতিকতা এবং মানবিকতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল, যা আজও বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি আদর্শ মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।