১.১ আরব উপদ্বীপের উত্তরে ক্ষমতার পালাবদল: বাইজেন্টাইন (রোমান) বনাম সাসানীয় (পারস্য) সাম্রাজ্যের সংঘাতের আফটারম্যাথ
সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভে আরব উপদ্বীপের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রটি ছিল দুটি অতিপ্রবল বিশ্বশক্তির দ্বন্দ্বে বিভক্ত। একদিকে ছিল ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের আধিপত্য বিস্তারকারী বাইজেন্টাইন বা পূর্ব-রোমান সাম্রাজ্য, আর অন্যদিকে ছিল মেসোপটেমিয়া ও ইরানি মালভূমির অধিপতি সাসানীয় পারস্য। এই দুই সাম্রাজ্যের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কেবল সামরিক লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল দুটি ভিন্ন সভ্যতা, ধর্ম এবং রাজনৈতিক দর্শনের সংঘাত। এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট চরম ক্লান্তি, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং প্রশাসনিক শূন্যতা আরব উপদ্বীপের উত্তর সীমান্তে এক অভূতপূর্ব ক্ষমতার পালাবদলের পথ প্রশস্ত করেছিল, যা পরবর্তীতে ইসলামের প্রসারে এক কৌশলগত সুযোগ তৈরি করে দেয়।
সাসানীয় সাম্রাজ্যের উত্থান ও রাজনৈতিক প্রকৃতি
সাসানীয় সাম্রাজ্য ছিল পারস্যের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়, যা আশকানীয়দের পর ক্ষমতায় আসে। এই সাম্রাজ্যের ভিত্তি ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং অভিজাততান্ত্রিক। সাসানীয়দের বংশপরিচয় এবং তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার গভীর সম্পর্ক ছিল। ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, সাসানীয়রা মূলত সাসান নামক এক অভিজাত ব্যক্তির বংশধর, যিনি আশকানীয় শাসনের শেষ সময়ে অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন।
٢ ينتسب الساسانيون إلى ساسان، وهو من عائلة نبيلة عاش في أواخر عهد الدولة الأشكانية، وكان سادنًا على بيت نار اصطخر يقال له: بيت نار أناهيد. [1] সাসানীয়দের এই শাসনব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত এবং ধর্মতাত্ত্বিক। তারা জরাথুস্ট্রবাদকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল এবং 'বেত নার' বা অগ্নি মন্দিরের পুরোহিততন্ত্রের সাথে রাজকীয় ক্ষমতার এক অবিচ্ছেদ্য মেলবন্ধন তৈরি করেছিল। এই ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংহতি তাদের সামরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী করে তোলে, যার ফলে তারা রোমান সাম্রাজ্যের পূর্ব প্রান্তের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাদের প্রশাসনিক কাঠামো ছিল কঠোর এবং স্তরবিন্যাসিত, যা তাদের বিশাল ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করত, তবে এই কাঠামোর ভেতরেই ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং অভিজাত শ্রেণির দ্বন্দ্ব দানা বাঁধছিল [2] ।
পারস্যের এই সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা কেবল ভূখণ্ড দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তারা নিজেদের বিশ্বজনীন সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল। ফলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে তাদের সংঘাত ছিল অনিবার্য। এই সংঘাতের ফলে উভয় সাম্রাজ্যই তাদের সামরিক সক্ষমতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছিল, যা শেষ পর্যন্ত তাদের উভয়ের জন্যই এক আত্মঘাতী পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।
বাইজেন্টাইন-সাসানীয় মহাযুদ্ধ (৬০২-৬২৮ খ্রিষ্টাব্দ) এবং ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয়
সপ্তম শতাব্দীর প্রথম তিন দশক ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সাক্ষী। এই যুদ্ধের তীব্রতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, এক সময় মনে হয়েছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাবে। বিশেষ করে ৬২১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সাসানীয় বাহিনীর আক্রমণ ছিল বিধ্বংসী। পারস্য বাহিনী সিরিয়া, মিশর এবং এশিয়া মাইনরের বিশাল অংশ দখল করে নেয়, যা ছিল রোমান সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড।
ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, পারস্য বাহিনী এতটাই অগ্রসর হয়েছিল যে তারা সরাসরি কনস্টান্টিনোপল বা কুস্তন্তিনিয়াকে হুমকির মুখে ফেলেছিল। এই সময়টি ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। তবে এই চরম সংকটের মুহূর্তে আবির্ভূত হন সম্রাট হারাক্লিয়াস (Heraclius)। তিনি কেবল একজন সামরিক নেতা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী কৌশলবিদ, যিনি সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ থেকে পুনরায় পুনর্গঠনের সংকল্প করেন [3] ।
হারাক্লিয়াসের নেতৃত্বে বাইজেন্টাইন বাহিনী এক অভাবনীয় পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। ৬২৬ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে যখন পারস্য বাহিনী কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করে রেখেছিল, তখন হারাক্লিয়াস তার রণকৌশল পরিবর্তন করে সরাসরি পারস্যের অভ্যন্তরে আক্রমণ চালান। এই যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায় ছিল ৬২৬ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে সংঘটিত 'নিনেভে'র যুদ্ধ, যেখানে রোমান বাহিনী পারস্যের চূড়ান্ত পরাজয় নিশ্চিত করে।
وفي الموقعة الثالثة وإلى هرقل انتصاره السابق فانتصر انتصاراً تاماً في أول ديسمبر سنة 626 م في موقعه نينوى وبذلك انكسرت جيوش الفرس وتشتت شملهم. [4] এই বিজয়ের ফলে সাসানীয় সাম্রাজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে পারস্য সম্রাট খসরু তার নিজের পুত্র শিরুয়েহ-এর হাতে নিহত হন এবং সিংহাসন দখল করেন। এর ফলে দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার শর্ত ছিল সীমানা পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া। তবে এই শান্তি ছিল কেবল কাগজে-কলমে; বাস্তবে উভয় সাম্রাজ্যই ছিল সম্পূর্ণ নিঃস্ব এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
হারাক্লিয়াসের প্রশাসনিক সংস্কার এবং 'আজনাদ' (Themata) ব্যবস্থা
যুদ্ধের পর হারাক্লিয়াস যখন ক্ষমতায় বসলেন, তিনি দেখলেন সাম্রাজ্যটি অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া এবং প্রশাসনিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সামরিক খাতে ব্যবহৃত ভাড়াটে সৈন্য বা মার্সেনারিদের ওপর নির্ভরশীলতা সাম্রাজ্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছিল, কারণ রাজকোষে তাদের বেতন দেওয়ার মতো অর্থ অবশিষ্ট ছিল না। এই সংকট উত্তরণে তিনি এক বৈপ্লবিক প্রশাসনিক ও সামরিক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেন, যা ইতিহাসে 'আজনাদ' বা 'থিম্যাটাস' (Themata) ব্যবস্থা নামে পরিচিত।
হারাক্লিয়াস পূর্ববর্তী সম্রাট ডায়োক্লেটিয়ান এবং কনস্টানটাইনের পুরনো প্রশাসনিক কাঠামো বাতিল করে সাম্রাজ্যকে কয়েকটি বড় সামরিক জেলায় বিভক্ত করেন, যাদের বলা হতো 'আজনাদ'। এই ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের একীকরণ। প্রতিটি জেলার নেতৃত্বে একজন সামরিক কমান্ডার থাকতেন, যিনি প্রশাসনিক ও সামরিক উভয় দায়িত্ব পালন করতেন [5] ।
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল 'সামরিক ইকতা' বা ভূমিদান। রাজকোষের অর্থ সংকটের কারণে সম্রাট সৈন্যদের নগদ বেতনের পরিবর্তে নির্দিষ্ট ভূখণ্ড দান করেন। শর্ত ছিল যে, ওই ভূমির মালিক এবং তার বংশধরেরা বংশপরম্পরায় সামরিক সেবা প্রদান করবে। এর ফলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য একটি শক্তিশালী 'জাতীয় সেনাবাহিনী'র অধিকারী হয়, যারা কেবল বেতনভুক্ত ভাড়াটে ছিল না, বরং নিজেদের ভূমির রক্ষক হিসেবে যুদ্ধ করত। এশিয়া মাইনরে হারাক্লিয়াস চারটি প্রধান আজনাদ প্রতিষ্ঠা করেন: আরমেনিয়াক (উত্তর-পূর্ব), অপসিকিয়ন (পশ্চিম উপকূল), কারাবিসিন (দক্ষিণ উপকূল) এবং আনাতোলিক (পূর্ব অঞ্চল) [6] ।
যদিও এই সংস্কার সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনেছিল, কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করতে পারেনি। বিশেষ করে আরব উপদ্বীপের উত্তর সীমান্তে যে বাফার জোন বা মধ্যবর্তী অঞ্চল ছিল, সেখানে রোমানদের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
উত্তর আরব উপদ্বীপের কৌশলগত শূন্যতা এবং বাফার জোনের পতন
বাইজেন্টাইন এবং সাসানীয় সাম্রাজ্য উভয়েই আরব উপদ্বীপের অভ্যন্তরে সরাসরি শাসন করার পরিবর্তে স্থানীয় আরব উপজাতিদের মাধ্যমে তাদের প্রভাব বজায় রাখত। বাইজেন্টাইনরা বিশেষ করে 'ঘাসসানিদ' (Ghassanids) আরবদের ব্যবহার করত, যাদের তারা 'রুম আল-আরব' বা 'আরব-রোমান' বলে অভিহিত করত। এই উপজাতিরা রোমানদের হয়ে সীমান্ত রক্ষা করত এবং পারস্যপন্থী আরবদের প্রতিহত করত [7] ।
তবে দীর্ঘস্থায়ী মহাযুদ্ধের ফলে এই বাফার জোন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। যুদ্ধের খরচ মেটাতে বাইজেন্টাইনরা ঘাসসানিদদের আর্থিক সহায়তা কমিয়ে দেয় এবং তাদের রাজনৈতিক গুরুত্ব হ্রাস করে। এর ফলে উত্তর আরবের উপজাতিদের মধ্যে রোমানদের প্রতি চরম অসন্তোষ তৈরি হয়। অন্যদিকে, সাসানীয় সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ এবং খসরুর পতনের পর তাদের প্রক্সি ফোর্স হিসেবে ব্যবহৃত আরব উপজাতিরাও দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতি তৈরি করেছিল এক বিশাল 'পাওয়ার ভ্যাকুয়াম' বা ক্ষমতার শূন্যতা। উত্তর আরবের উপজাতিরা এখন আর কোনো নির্দিষ্ট সাম্রাজ্যের প্রতি অনুগত ছিল না। তারা একদিকে রোমানদের প্রশাসনিক অবহেলায় ক্ষুব্ধ, অন্যদিকে পারস্যের পতনে আশাহত। ঠিক এই সন্ধিক্ষণে মদিনায় একটি নতুন রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি হিসেবে ইসলামি রাষ্ট্রের উত্থান ঘটে। হারাক্লিয়াস যখন জেরুজালেমে তার বিজয় মিছিল নিয়ে প্রবেশ করেন এবং পারস্যের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনা 'পবিত্র ক্রুশ' (True Cross) স্থাপন করেন, তখন তিনি হয়তো উপলব্ধি করতে পারেননি যে, তার এই বিজয় আসলে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে, যেখানে পুরনো সাম্রাজ্যগুলোর আধিপত্যের দিন শেষ হয়ে এসেছে [8] ।
সাম্রাজ্য দুটির এই পারস্পরিক ক্ষয় এবং উত্তর আরবের কৌশলগত অস্থিতিশীলতা ইসলামি দাওয়াত এবং পরবর্তী সামরিক অভিযানের জন্য এক অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। রোমানদের প্রশাসনিক সংস্কার এবং সামরিক পুনর্গঠন সত্ত্বেও, তাদের মানসিক ক্লান্তি এবং স্থানীয় আরবদের সাথে সম্পর্কের অবনতি তাদের জন্য এক মারাত্মক দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়, যা পরবর্তীতে ইসলামের প্রসারে এক অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।