খণ্ড 83
ফন্ট:100%
থিম:

১১.৩ ওয়ার্কিং মাদার (Working Mother) এবং চাইল্ড রিয়ারিং (Child Rearing): নববী সমাজে মায়েদের সোশ্যাল সাপোর্ট

নববী সমাজব্যবস্থায় 'ওয়ার্কিং মাদার' বা কর্মজীবী মাতার ধারণাটি আধুনিক পুঁজিবাদী কাঠামোর মতো কেবল অর্থনৈতিক উপার্জনের সাথে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল সামাজিক দায়বদ্ধতা, অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন এবং পারিবারিক স্থিতিশীলতার এক অনন্য সমন্বয়। সপ্তম শতাব্দীর আরবে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রচলন থাকলেও, রাসুল সা. এর আগমনে সেই কর্মকাণ্ডে একটি নৈতিক ও আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। নববী সমাজে একজন মা যখন অর্থনৈতিক বা সামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতেন, তখন তাকে কেবল একজন 'শ্রমিক' হিসেবে নয়, বরং সমাজের এক অপরিহার্য অংশ হিসেবে গণ্য করা হতো। এই ব্যবস্থায় সন্তান লালন-পালন বা চাইল্ড রিয়ারিং-এর দায়িত্বটি কেবল মায়ের একক বোঝা ছিল না, বরং তা ছিল একটি সামগ্রিক সামাজিক প্রক্রিয়ার অংশ [1]

রাসুল সা. এর জীবনদর্শনে দেখা যায়, তিনি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রদান করেছেন, যা পরোক্ষভাবে তাদের মাতৃত্বের গুণাবলিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। খাদিজা রা. এর ব্যবসায়িক নেতৃত্ব থেকে শুরু করে জয়নব বিনতে জাহশ রা. এর হস্তশিল্পের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ দান করার প্রবণতা প্রমাণ করে যে, নববী সমাজে মাতৃত্ব এবং পেশাগত সক্রিয়তা একে অপরের পরিপূরক ছিল, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। এই ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য রাসুল সা. একটি শক্তিশালী সোশ্যাল সাপোর্ট সিস্টেম বা সামাজিক সহায়তা কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে পরিবারের পুরুষ সদস্য এবং সামগ্রিক সমাজ মায়েদের মানসিক ও শারীরিক চাপ লাঘবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করত [2]

এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে কর্মজীবী মায়েদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা কেবল অর্থনৈতিক সংস্থানই করেননি, বরং সন্তানদের মধ্যে আত্মনির্ভরশীলতা এবং সামাজিক সংহতির শিক্ষা প্রদান করেছেন। নববী সমাজের এই মডেলটি আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের 'কলেক্টিভ কেয়ার' (Collective Care) ধারণার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, যেখানে সন্তানের লালন-পালন কেবল রক্ত সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি সম্প্রদায়ভিত্তিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য হতো। এই কাঠামোর ফলে মায়েদের ওপর মানসিক চাপ হ্রাস পেত এবং তারা একই সাথে রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিক ক্ষেত্রে কার্যকর অবদান রাখতে সক্ষম হতেন [3]

অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন এবং মাতৃত্বের ভারসাম্য: একটি বিশ্লেষণ

নববী সমাজে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের স্বায়ত্তশাসন। ইসলামি শরীয়াহর মাধ্যমে নারীদের নিজস্ব সম্পদের মালিকানা এবং তা ব্যবহারের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করা হয়, যা তাদের মাতৃত্বের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এক ধরনের মানসিক নিরাপত্তা প্রদান করত। উদাহরণস্বরূপ, জয়নব বিনতে জাহশ রা. এর জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত পরিশ্রমী ছিলেন এবং নিজের হাতের কাজ (যেমন চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ) এর মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করতেন। এই উপার্জিত অর্থ তিনি দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করতেন, যা প্রমাণ করে যে একজন মা একই সাথে অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা এবং উচ্চতর সামাজিক মূল্যবোধের ধারক হতে পারেন [4]

এই অর্থনৈতিক সক্রিয়তা সন্তানদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলার পরিবর্তে তাদের মধ্যে শ্রমের মর্যাদা এবং পরোপকারের মানসিকতা তৈরি করত। রাসুল সা. এর নির্দেশনায় মায়েদের জন্য এমন এক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে তাদের পেশাগত ব্যস্ততা যেন সন্তানের অধিকার ক্ষুণ্ণ না করে। এখানে 'ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স' এর একটি আদি ও আদর্শ রূপ পরিলক্ষিত হয়। যখন একজন মা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতেন, তখন পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা, বিশেষ করে পিতা, সন্তানের দেখাশোনার ক্ষেত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন। এই পারস্পরিক সহযোগিতা নববী সমাজের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল [5]

আরবি ইবারতে এই অর্থনৈতিক স্বাধীনতার গুরুত্ব এভাবে ফুটে ওঠে:


المرأة في الإسلام لها ذمة مالية مستقلة، وهذا الاستقلال يعزز من قدرتها على تربية أبنائها في بيئة من العزة والكرامة

অর্থাৎ, "ইসলামে নারীর স্বতন্ত্র আর্থিক সত্তা রয়েছে, এবং এই স্বাধীনতা তাকে তার সন্তানদের একটি মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে লালন-পালন করার সক্ষমতা প্রদান করে" [6] । এই আর্থিক স্বাধীনতা মায়েদের সন্তানদের জন্য উন্নত শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সহায়তা করত, যা তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

নববী সমাজের সোশ্যাল সাপোর্ট সিস্টেম এবং কমিউনিটি কেয়ার

নববী সমাজে কর্মজীবী মায়েদের জন্য যে সোশ্যাল সাপোর্ট সিস্টেম বিদ্যমান ছিল, তা ছিল মূলত 'তাকাফুল' (Takaful) বা পারস্পরিক নিশ্চয়তার ধারণার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। মদিনার আনসার এবং মুহাজির নারীদের মধ্যে যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি হয়েছিল, তা চাইল্ড রিয়ারিং-এর ক্ষেত্রে এক বিশাল সহায়তায় পরিণত হয়। যখন কোনো মা সামাজিক বা অর্থনৈতিক কাজে ব্যস্ত থাকতেন, তখন প্রতিবেশী বা আত্মীয়স্বজনের নারীরা স্বেচ্ছায় সন্তানদের দেখাশোনার দায়িত্ব নিতেন। এই ব্যবস্থাটি আধুনিক যুগের 'ডে-কেয়ার সেন্টার' এর চেয়ে অনেক বেশি মানবিক এবং আবেগীয়ভাবে সমৃদ্ধ ছিল [7]

রাসুল সা. নিজে মায়েদের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিলেন। তিনি মায়েদের ওপর অতিরিক্ত চাপ চাপানোর পরিবর্তে তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী দায়িত্ব বণ্টন করার নির্দেশ দিতেন। এই সামাজিক সহায়তার ফলে মায়েদের মধ্যে 'মাদার্স গিল্ট' (Mother's Guilt) বা মাতৃত্বের অপরাধবোধ তৈরি হওয়ার সুযোগ ছিল না, কারণ সমাজ তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দিত। এই সমষ্টিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থাটি কেবল পারিবারিক স্তরে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্তরেও কার্যকর ছিল, যেখানে বিধবা এবং অনাথ শিশুদের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছিল [8]

এই সাপোর্ট সিস্টেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া। রাসুল সা. এর সাথে সাহাবিয়াতদের কথোপকথন এবং তাদের সমস্যা সমাধানে তাঁর আন্তরিকতা প্রমাণ করে যে, তিনি নারীর মানসিক প্রশান্তিকে পারিবারিক স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি মনে করতেন। যখন একজন মা মানসিকভাবে প্রশান্ত থাকেন, তখন তার সন্তানের লালন-পালন আরও কার্যকর হয়। এই মনস্তাত্ত্বিক ভারসাম্যই নববী সমাজকে একটি আদর্শ সমাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল [9]

মাতৃত্ব ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, নববী সমাজে মায়েদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ তাদের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি করেছিল, যা পরোক্ষভাবে সন্তানদের আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলেছিল। একজন মা যখন সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকেন, তখন সন্তানরা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের ঊর্ধ্বে উঠে মেধার মূল্যায়ন করতে শেখে। এটি তৎকালীন জাহেলী যুগের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার এক আমূল পরিবর্তন ছিল। রাসুল সা. এর এই দৃষ্টিভঙ্গি নারীদের কেবল গৃহবন্দী না রেখে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও পেশাগত সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ করে দিয়েছিল [10]

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মদিনা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নারীদের এই বহুমুখী ভূমিকা অত্যন্ত কার্যকর ছিল। যুদ্ধের সময় বা রাষ্ট্রীয় সংকটের মুহূর্তে মায়েদের নার্সিং সেবা, খাদ্য সরবরাহ এবং আহতদের সেবা করার দক্ষতা প্রমাণ করে যে, তারা কেবল ঘরকুনো ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন রাষ্ট্রের 'লজিস্টিক সাপোর্ট' এর প্রধান কারিগর। এই দ্বৈত ভূমিকা—একদিকে সন্তানের লালন-পালন এবং অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সেবা—মদিনার সামাজিক সংহতিকে আরও দৃঢ় করেছিল [11]

এই প্রক্রিয়ায় মায়েদের সামাজিক অংশগ্রহণ কেবল ব্যক্তিগত লাভ বা উপার্জনের জন্য ছিল না, বরং তা ছিল 'উম্মাহ'র সামগ্রিক উন্নতির অংশ। যখন একজন মা তার পেশাগত দক্ষতা দিয়ে সমাজের সেবা করতেন, তখন তিনি তার সন্তানের সামনে একটি জীবন্ত আদর্শ স্থাপন করতেন। এই ভূ-রাজনৈতিক কৌশলটি মদিনা রাষ্ট্রকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল, যেখানে নারী ও পুরুষ উভয়েই নিজ নিজ অবস্থান থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কল্যাণে নিয়োজিত ছিলেন [12]

চাইল্ড রিয়ারিং-এ নববী মডেল এবং আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা

নববী সমাজের চাইল্ড রিয়ারিং মডেলটি ছিল অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত এবং আবেগীয়ভাবে ভারসাম্যপূর্ণ। এখানে সন্তানের লালন-পালনকে কেবল খাদ্যের সংস্থান বা শারীরিক সুরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি, বরং তাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কর্মজীবী মায়েদের ক্ষেত্রে এই মডেলটি আরও কার্যকর ছিল, কারণ তারা সন্তানদের বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ এবং পরিশ্রমের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারতেন। রাসুল সা. এর নির্দেশনায় মায়েদের প্রতি সম্মান এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করার ফলে সন্তানরা শৈশব থেকেই শ্রদ্ধাবোধ এবং সহমর্মিতা লাভ করত [13]

এই মডেলের একটি অনন্য দিক ছিল 'পারিবারিক গণতন্ত্র'। রাসুল সা. ঘরে নারীদের মতামত গ্রহণ করতেন এবং তাদের সাথে পরামর্শ করতেন। এই পরিবেশটি সন্তানদের শেখাত যে, মাতৃত্ব কেবল সেবার নাম নয়, বরং এটি নেতৃত্ব এবং প্রজ্ঞারও নাম। যখন একজন মা তার পেশাগত জীবন এবং মাতৃত্বের মধ্যে সমন্বয় করেন, তখন তিনি তার সন্তানদের সময় ব্যবস্থাপনা (Time Management) এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণের (Prioritization) বাস্তব শিক্ষা প্রদান করেন [14]

বর্তমান যুগের জটিল কর্মপরিবেশে নববী সমাজের এই সোশ্যাল সাপোর্ট সিস্টেম অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আধুনিক সমাজ যেখানে মায়েদের পেশাগত জীবন এবং সন্তানের লালন-পালনের দ্বন্দ্বে জর্জরিত, সেখানে নববী সমাজের 'কমিউনিটি কেয়ার' এবং 'পারস্পরিক সহযোগিতা'র মডেলটি একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। রাসুল সা. এর প্রদর্শিত পথে মায়েদের প্রতি সামাজিক সমর্থন বৃদ্ধি এবং পারিবারিক দায়িত্বের যৌথ বণ্টনই পারে একটি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রজন্ম গড়ে তুলতে [15]

""
১১.৩ ওয়ার্কিং মাদার (Working Mother) এবং চাইল্ড রিয়ারিং (Child Rearing): নববী সমাজে মায়েদের সোশ্যাল সাপোর্ট
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১১.৩ ওয়ার্কিং মাদার (Working Mother) এবং চাইল্ড রিয়ারিং (Child Rearing): নববী সমাজে মায়েদের সোশ্যাল সাপোর্ট কুইজ

1 / 5

নববী সমাজে কর্মজীবী মায়েদের কীভাবে মূল্যায়ন করা হতো?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...