খণ্ড 66
ফন্ট:100%
থিম:

১১.১৭ আধুনিক এডুকেশন সিস্টেম বনাম হোম-স্কুলিং (Homeschooling): ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্যারেন্টাল ইনভলভমেন্ট

আর্টিকেলের বিষয়বস্তু

মানবসভ্যতার বিকাশ ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষায় শিক্ষা হচ্ছে প্রধানতম অনুঘটক। ইসলামের প্রথম বাণীই ছিল জ্ঞানার্জন সংক্রান্ত। তবে আধুনিক যুগে এসে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা (Institutional Education System) এবং গৃহ-শিক্ষা বা হোম-স্কুলিং (Homeschooling)-এর মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও সমন্বয় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা তার বৈষয়িক উপযোগিতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সামাজিকীকরণের (Socialization) দাবি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে; অন্যদিকে হোম-স্কুলিং শিশুর নৈতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং ধর্মীয় অনুশাসনের নিবিড় পরিচর্যার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এই দুই ধারার তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং এতে পিতামাতার ভূমিকা (Parental Involvement) ও ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি নিরূপণ করা বর্তমান যুগের মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অপরিহার্য বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব।

ইসলামিক জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology) ও শিক্ষার উদ্দেশ্য

ইসলামে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবল তথ্য সংগ্রহ বা জীবিকা অর্জনের যোগ্যতা অর্জন নয়, বরং এর মূল লক্ষ্য হলো মানুষের আত্মিক ও নৈতিক উৎকর্ষ সাধন (তাজকিয়াহ) এবং স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন। ইসলামিক জ্ঞানতত্ত্বে ওহী-লব্ধ জ্ঞান এবং পর্যবেক্ষণমূলক জাগতিক জ্ঞান—উভয়কেই স্বীকার করা হয়েছে, তবে জাগতিক জ্ঞানকে সর্বদা ওহীর আলোকেই পরিচালিত হতে হয়। রাসুলুল্লাহ সা. জ্ঞানার্জনকে প্রতিটি মুসলিমের জন্য ফরজ বা আবশ্যিক কর্তব্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

«طَلَبُ العِلْمِ فَرِيْضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ»

অর্থ: "জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ।" [1]

ইসলামিক শিক্ষাদর্শনে জ্ঞানার্জন কেবল একটি বৈষয়িক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি ইবাদত। এই জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর পরিচয় লাভ করে এবং তাঁর প্রতি গভীর অনুরাগী ও শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে যে, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাঁকে যথার্থভাবে ভয় করে। এই জ্ঞান কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং তা মানুষের আচরণ ও কর্মে প্রতিফলিত হতে হবে। জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে নিয়ত বা উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি কেউ কেবল পার্থিব স্বার্থ বা অহংকার প্রকাশের জন্য জ্ঞান অর্জন করে, তবে সে পরকালীন কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে। রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন:

«مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللَّهِ، لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلَّا لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضَ الدُّنْيَا، لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»

অর্থ: "যে ব্যক্তি এমন জ্ঞান অর্জন করল যার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়, কিন্তু সে তা কেবল পার্থিব স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে শিখল, সে কিয়ামতের দিন জান্নাতের সুবাসও পাবে না।" [2]

ইসলামে মানুষের ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতাকে আল্লাহর দেওয়া আমানত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং কিয়ামতের দিন এই ক্ষমতাগুলোর ব্যবহার সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, "নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয়—এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে" (সূরা আল-ইসরা: ৩৬)। অতএব, ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গিতে শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো এমন এক ব্যক্তিত্ব গঠন করা, যা ইহলৌকিক ও পরলৌকিক উভয় জগতেই কল্যাণ বয়ে আনে। এই সামগ্রিক শিক্ষাদর্শন কেবল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিস্তৃত। [3]

আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা: সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা

আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা মূলত শিল্প বিপ্লব-উত্তর পশ্চিমা সেক্যুলার দর্শনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই ব্যবস্থার প্রধান সুযোগ হলো এটি সুশৃঙ্খল পাঠ্যক্রম, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বৃহৎ পরিসরে সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ তৈরি করে। ইসলাম জাগতিক বিজ্ঞানের চর্চাকে কখনো নিষিদ্ধ করেনি, বরং মানবকল্যাণে নিয়োজিত সকল উপকারী জ্ঞানার্জনকে উৎসাহিত করেছে। শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, নারীদের জন্যও উপকারী জাগতিক জ্ঞান অর্জন করা সম্পূর্ণ বৈধ এবং ক্ষেত্রবিশেষে তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। [4]

তবে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার কিছু গুরুতর সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা মুসলিম মনস্তত্ত্ব ও ঈমানী চেতনার জন্য হুমকিস্বরূপ। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র, যা জ্ঞানকে ওহী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ফলে শিক্ষার্থীরা জাগতিক বিদ্যায় পারদর্শী হলেও আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দিক থেকে চরম শূন্যতার শিকার হয়। ঔপনিবেশিক শক্তির চাপিয়ে দেওয়া এই শিক্ষাব্যবস্থা মুসলিম শিশুদের তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং বিশুদ্ধ আকীদা থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার একটি সূক্ষ্ম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে দেখা যায়, ফরাসি উপনিবেশবাদীরা "আধুনিক শিক্ষা" (التربية الحديثة)-র নামে মুসলিম শিশুদের ঐতিহ্যগত কুরআন শিক্ষা ও সালাফদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে ব্যবহার করেছিল। [5]

এছাড়া, আধুনিক স্কুলগুলোতে অনিয়ন্ত্রিত সহশিক্ষা, নৈতিক অবক্ষয়, বস্তুবাদী জীবনদর্শন এবং পিয়ার প্রেশার (Peer Pressure) বা সহপাঠীদের নেতিবাচক প্রভাব শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে এবং মুসলিম মেয়েদের জন্য নিরাপদ ও নৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে আধুনিক যুগেও বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে পৃথক বালিকা বিদ্যালয় ও বিশেষায়িত শিক্ষা পরিকল্পনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরেই নৈতিকতা রক্ষার একটি প্রচেষ্টা। [6]

হোম-স্কুলিং (Homeschooling): ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি ও গুরুত্ব

হোম-স্কুলিং বা গৃহ-শিক্ষা কোনো আধুনিক আবিষ্কার নয়, বরং এটি ইসলামের আদি ও মৌলিক শিক্ষাপদ্ধতির একটি পুনরুজ্জীবন। ইসলামে পরিবারই হলো প্রথম বিদ্যাপীঠ এবং পিতামাতাই হলেন শিশুর প্রথম শিক্ষক। শিশুর মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক গঠনে পিতামাতার ভূমিকা অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ সা. প্রতিটি নবজাতকের জন্মগত স্বভাব বা ফিতরাতের কথা উল্লেখ করে পিতামাতার প্রভাবকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন:

«كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ، فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ»

অর্থ: "প্রতিটি নবজাতক ফিতরাতের (ইসলামের) ওপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতামাতা তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজক বানায়।" [7]

এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, শিশুর মনস্তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস গঠনে পিতামাতার দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। হোম-স্কুলিংয়ের মাধ্যমে পিতামাতা সরাসরি শিশুর শিক্ষার মান, পরিবেশ এবং নৈতিকতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ঐতিহ্যগতভাবে মুসলিম পরিবারগুলোতে প্রতিদিন সকালে কুরআন তিলাওয়াত, হাদিসের পাঠ এবং সালাফদের জীবনী আলোচনার একটি চমৎকার পরিবেশ ছিল, যা শিশুদের শৈশবেই ঈমানী মজবুতি দান করত। [8]

ইসলামিক সমাজব্যবস্থায় অভিভাবকত্ব কেবল একটি সামাজিক পদবী নয়, বরং এটি একটি পরকালীন জবাবদিহিতার ক্ষেত্র। রাসুলুল্লাহ সা. এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন:

«أَلَا كُلُّكُمْ رَاعٍ، وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ... وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ، وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُمْ»

অর্থ: "সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই রাখাল (দায়িত্বশীল) এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে... এবং পুরুষ তার পরিবারের সদস্যদের ওপর দায়িত্বশীল, সে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।" [9]

হোম-স্কুলিং এই দায়িত্ব পালনের একটি অত্যন্ত কার্যকর মাধ্যম। এর মাধ্যমে পিতামাতা শিশুকে সেক্যুলার শিক্ষার কুপ্রভাব থেকে রক্ষা করে একত্ববাদ (তাওহীদ) এবং নৈতিকতার মজবুত ভিত্তির ওপর গড়ে তুলতে পারেন। [10]

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: কুতব (Kuttab), মসজিদ ও পারিবারিক শিক্ষা

ইসলামের ইতিহাসে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়ার আগে শিক্ষা মূলত গৃহ, মসজিদ এবং কুতব (Kuttab) বা মক্তব কেন্দ্রিক ছিল। রাসুলুল্লাহ সা.-এর যুগে দারুল আরকাম ছিল গৃহ-ভিত্তিক শিক্ষার এক অনন্য উদাহরণ। পরবর্তীতে যখন ইসলাম বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, তখন মুসলিম দাঈ ও বণিকগণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে শিশুদের জন্য কুতব বা মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে শিশুদের লিখতে, পড়তে এবং কুরআন ও প্রাথমিক ধর্মীয় জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হতো। [11]

আফ্রিকা ও এশিয়ায় ইসলামের প্রসারে এই গৃহ ও মক্তব ভিত্তিক শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। মুসলিম ব্যবসায়ীগণ দিনের বেলা ব্যবসা করতেন এবং রাতের বেলা তাদের দোকান বা বাসস্থানগুলোকে অস্থায়ী নৈশ বিদ্যালয়ে রূপান্তর করতেন। সেখানে স্থানীয় অমুসলিম ও মুসলিম শিশুরা অগ্নিকুণ্ডের আলোতে বসে অত্যন্ত আগ্রহের সাথে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করত।

«وكانوا أثناء الليل يحولون دكاكينهم إلى مكان يتلقى فيه الأطفال مبادئ القراءة والكتابة على ضوء النيران»

অর্থ: "এবং তারা রাতের বেলা তাদের দোকানগুলোকে এমন স্থানে রূপান্তরিত করত যেখানে শিশুরা আগুনের আলোতে পড়া ও লেখার প্রাথমিক নীতিগুলো শিখত।" [12]

ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম সমাজে হজ্জের কাফেলাগুলোও এক একটি ভ্রাম্যমাণ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কাজ করত, যেখানে বিভিন্ন অঞ্চলের আলেম ও শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে জ্ঞান বিনিময় করতেন। এই অনানুষ্ঠানিক ও পারিবারিক শিক্ষাপদ্ধতি মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ডকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সচল রেখেছিল। প্রাতিষ্ঠানিক বড় বড় মাদরাসা বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনেক আগে থেকেই এই পারিবারিক ও কুতব-ভিত্তিক শিক্ষাই ছিল মুসলিম সমাজের মূল চালিকাশক্তি। [13]

তুলনামূলক বিশ্লেষণ: আধুনিক স্কুলিং বনাম হোম-স্কুলিং

আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলিং এবং হোম-স্কুলিংয়ের মধ্যে একটি গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য রয়েছে। আধুনিক স্কুলিং মূলত একটি যান্ত্রিক ও উৎপাদনমুখী মডেল, যা শিশুকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলে। এখানে শিক্ষার মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় পরীক্ষায় ভালো ফল এবং কর্পোরেট জগতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। এই ব্যবস্থার ফলে অনেক সময় শিশুর সৃজনশীলতা ও নৈতিক মূল্যবোধ হারিয়ে যায়। পশ্চিমা বস্তুবাদী সভ্যতা, যা কেবল শারীরিক ও জৈবিক চাহিদার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, তা শিশুদের আধ্যাত্মিক মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে। [14]

অন্যদিকে, হোম-স্কুলিং শিশুকে তার নিজস্ব গতিতে শেখার স্বাধীনতা দেয় এবং তার আধ্যাত্মিক ও নৈতিক বিকাশকে অগ্রাধিকার দেয়। হোম-স্কুলিংয়ের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান শিশুর অন্তরে আল্লাহর ভয় (তাকওয়া) সৃষ্টি করে, যা প্রকৃত জ্ঞানের মূল কথা। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, "নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে" (সূরা ফাতির: ২৮)। [15]

তবে হোম-স্কুলিংয়েরও কিছু বাস্তবসম্মত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন—সামাজিকীকরণের অভাব, আধুনিক গবেষণাগার বা ল্যাবরেটরির সুবিধার অনুপস্থিতি এবং পিতামাতার পর্যাপ্ত শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘাটতি। এছাড়া, ইসলামের প্রাথমিক যুগে শিক্ষা ছিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং রাষ্ট্র বা সমাজ এর ব্যয়ভার বহন করত, যা আধুনিক হোম-স্কুলিংয়ের ক্ষেত্রে পিতামাতাকে ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হয়। খিলাফতে রাশেদার আমলে শিক্ষকদের বেতন ও শিক্ষার খরচ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দেওয়া হতো, যাতে শিক্ষা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। [16]

নিচে আধুনিক স্কুলিং ও হোম-স্কুলিংয়ের একটি তুলনামূলক সারণী দেওয়া হলো:

বৈশিষ্ট্য আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলিং হোম-স্কুলিং (Homeschooling)
জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষ, বস্তুবাদী ও উপযোগিতাবাদী। ওহী ও জাগতিক জ্ঞানের সমন্বিত রূপ।
নৈতিক পরিবেশ সহশিক্ষা ও পিয়ার প্রেশারের কারণে নৈতিক ঝুঁকির আশঙ্কা থাকে। পারিবারিক তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ।
সামাজিকীকরণ বৃহৎ পরিসরে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও বৈচিত্র্যের অভিজ্ঞতা। সীমিত সামাজিকীকরণ, তবে পারিবারিক বন্ধন অত্যন্ত সুদৃঢ় হয়।
শিক্ষাদান পদ্ধতি যান্ত্রিক, মুখস্থনির্ভর ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ। নমনীয়, শিশুর মনস্তাত্ত্বিক চাহিদানুযায়ী ও সৃজনশীল।

একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষাদর্শনের রূপরেখা

ইসলাম কোনো চরমপন্থী বা একপেশে জীবনব্যবস্থা নয়, বরং এটি একটি মধ্যপন্থী ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনদর্শন। আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের এমন একটি সমন্বিত শিক্ষাদর্শন গ্রহণ করতে হবে, যা আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং হোম-স্কুলিংয়ের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সুরক্ষাকে একত্রিত করতে পারে। ইসলামে উপকারী জাগতিক জ্ঞান অর্জন করা কেবল বৈধই নয়, বরং তা উম্মাহর যৌথ দায়িত্ব বা ফরজে কিফায়া। [17]

এই ভারসাম্যপূর্ণ রূপরেখা বাস্তবায়নে পিতামাতাকে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। যদি কোনো পরিবার তাদের সন্তানকে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলেই পাঠাতে চায়, তবে তাদের অবশ্যই "প্যারেন্টাল ইনভলভমেন্ট" বা পারিবারিক সম্পৃক্ততা সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখতে হবে। স্কুল ছুটির পর ঘরের পরিবেশকে একটি ইসলামিক হোম-স্কুল বা মক্তবের রূপ দিতে হবে, যেখানে প্রতিদিন কুরআন, হাদিস ও আখলাকের চর্চা হবে। মানুষের কান, চোখ ও অন্তরের সঠিক ব্যবহারের জন্য পিতামাতাই আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবেন। [18]

আবার যারা পূর্ণাঙ্গ হোম-স্কুলিং বেছে নেবেন, তাদের খেয়াল রাখতে হবে যেন শিশুরা সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ে। তাদের বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা এবং মসজিদভিত্তিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। ইসলামের ইতিহাসে যেভাবে দাঈ ও বণিকগণ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কাঠামোর সমন্বয়ে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, আমাদেরও বর্তমান যুগে সেই মডেল অনুসরণ করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে হোম-স্কুলিংয়ের মানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব, যা একই সাথে শিশুর ঈমান রক্ষা করবে এবং তাকে আধুনিক বিশ্বের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। [19]

""
১১.১৭ আধুনিক এডুকেশন সিস্টেম বনাম হোম-স্কুলিং (Homeschooling): ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্যারেন্টাল ইনভলভমেন্ট
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১১.১৭ আধুনিক এডুকেশন সিস্টেম বনাম হোম-স্কুলিং (Homeschooling): ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্যারেন্টাল ইনভলভমেন্ট কুইজ

1 / 5

ইসলামিক শিক্ষাদর্শনে শিক্ষার মূল লক্ষ্য কী?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...