খণ্ড 91
ফন্ট:100%
থিম:

৪.৪ জেসাস সেমিনার (Jesus Seminar) এবং হিস্টোরিক্যাল জেসাস (Historical Jesus) মুভমেন্ট: পলিন খ্রিস্টানিটি (Pauline Christianity) কর্তৃক মূল শিক্ষার রূপান্তর

ঐতিহাসিক যীশু অনুসন্ধান (Historical Jesus Quest) এবং জেসাস সেমিনারের তাত্ত্বিক ভিত্তি


আধুনিক বাইবেলীয় সমালোচনা ও ঐতিহাসিক গবেষণার ইতিহাসে "হিস্টোরিক্যাল জেসাস" বা ঐতিহাসিক যীশু অনুসন্ধান একটি অত্যন্ত বৈপ্লবিক ও বিতর্কিত অধ্যায়। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত একদল পশ্চিমা গবেষক ও ধর্মতাত্ত্বিক প্রচলিত চার্চের বিশ্বাসের বাইরে গিয়ে ঐতিহাসিক সত্যের আলোতে নাসরতের ঈসা (আ.)-এর প্রকৃত অবয়ব ও তাঁর আদি বাণীসমূহ উন্মোচনের প্রয়াস পান। এই আন্দোলনের অন্যতম প্রভাবশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছিল ১৯৮৫ সালে রবার্ট ফাঙ্ক (Robert Funk) এবং জন ডমিনিক ক্রসান (John Dominic Crossan) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত "জেসাস সেমিনার" (Jesus Seminar)। প্রায় দুই শতাধিক বিশিষ্ট বাইবেলীয় পণ্ডিত ও গবেষকের সমন্বয়ে গঠিত এই সেমিনার ঐতিহাসিক-সমালোচনামূলক পদ্ধতি (Historical-Critical Method) প্রয়োগ করে ক্যানোনিকাল গসপেলসমূহে বর্ণিত যীশুর বাণী ও অলৌকিক ঘটনাবলির ঐতিহাসিক সত্যতা নিরূপণের উদ্যোগ নেয়। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল চার্চের ধর্মতাত্ত্বিক প্রলেপ বা "বিশ্বাসের খ্রিস্ট" (Christ of Faith) থেকে প্রকৃত "ঐতিহাসিক যীশু" (Historical Jesus)-কে পৃথক করা [1]

জেসাস সেমিনারের গবেষকগণ লাল, গোলাপী, ধূসর ও কালো রঙের পুঁতি ব্যবহার করে ভোটের মাধ্যমে গসপেলের প্রতিটি বাক্য ও ঘটনার ঐতিহাসিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করতেন। দীর্ঘ গবেষণার পর তাঁরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, প্রচলিত চার্চের চার গসপেলে যীশুর নামে আরোপিত বাণীসমূহের মাত্র ১৮ থেকে ২০ শতাংশ ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে সত্য বা তাঁর নিজস্ব বাণী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাকি অংশ পরবর্তীকালের চার্চের ধর্মতাত্ত্বিক বিবর্তন, বিশেষ করে পলিন খ্রিস্টানিটির (Pauline Christianity) প্রভাব এবং গ্রেকো-রোমান সংস্কৃতির সাথে আপসের ফল। এই আধুনিক গবেষণা প্রমাণ করে যে, ঈসা (আ.)-এর মূল শিক্ষা ছিল কঠোরভাবে তাওহীদ বা একত্ববাদভিত্তিক এবং তিনি নিজেকে কখনোই ঈশ্বর বা ঈশ্বরের পুত্র হিসেবে দাবি করেননি, যা ধ্রুপদী ইসলামি ঐতিহাসিক ও ধর্মতাত্ত্বিকদের দাবির সাথে হুবহু মিলে যায় [2]

ঐতিহাসিক যীশু আন্দোলনের গবেষকগণ দেখিয়েছেন যে, ঈসা (আ.) মূলত বনী ইসরাঈলের একজন সংস্কারক ও নবি ছিলেন, যিনি তাওরাতের বিধান বা শরীয়তকে পুনরুজ্জীবিত করতে এসেছিলেন। তিনি কোনো নতুন ধর্ম প্রবর্তন করতে চাননি, বরং তৎকালীন ইহুদি যাজকতন্ত্রের দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক নৈতিক বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। জেসাস সেমিনারের এই ঐতিহাসিক অনুসন্ধান খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের ভিত্তিমূলে আঘাত হানে, কারণ এটি প্রমাণ করে যে, বর্তমান খ্রিস্টধর্মের মূল স্তম্ভসমূহ—যেমন যীশুর ঈশ্বরত্ব, আদি পাপের তত্ত্ব (Original Sin), এবং ক্রুশবিদ্ধকরণের মাধ্যমে প্রায়শ্চিত্তের ধারণা—ঈসা (আ.)-এর নিজের শিক্ষা ছিল না, বরং তা পরবর্তীকালের সংযোজন [3]

পলিন খ্রিস্টানিটি (Pauline Christianity): তারসুসের শৌল (Saul of Tarsus) এবং গ্রেকো-রোমান রহস্যবাদী ধর্মের প্রভাব


ঐতিহাসিক যীশুর সরল তাওহীদি শিক্ষাকে একটি জটিল রহস্যবাদী ও পৌত্তলিক ভাবাপন্ন ধর্মে রূপান্তর করার পেছনে প্রধান কারিগর ছিলেন তারসুসের শৌল, যিনি পরবর্তীতে সেন্ট পল (Paul) নামে পরিচিত হন। পলের জন্ম হয়েছিল সিলিসিয়ার তারসুস (Tarsus) নামক একটি গ্রীকপ্রভাবিত নগরে, যা ছিল তৎকালীন স্টোইক দর্শন (Stoicism) এবং গ্রেকো-রোমান রহস্যবাদী ধর্মসমূহের (Mystery Religions) অন্যতম প্রধান কেন্দ্র [4] । উইল ডুরান্ট তাঁর বিখ্যাত 'দ্য স্টোরি অব সিভিলাইজেশন' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, তারসুসে অর্ফিজম (Orphism) এবং অন্যান্য রহস্যবাদী বিশ্বাসের ব্যাপক প্রচলন ছিল, যেখানে বিশ্বাস করা হতো যে তাদের উপাস্য দেবতা মানুষের মুক্তির জন্য মৃত্যুবরণ করেছেন এবং পুনরায় কবর থেকে জীবিত হয়ে উঠেছেন:

"وكان طرسوس كما كان في معظم المُدن اليونانية أتباع للأرفية. وغيرها من العقائد الخفية، يعتقدون أن الله الذي يعبدونه قد قام من أجلهم، ثم قام من قبره..."

[5]

পল ঈসা (আ.)-এর জীবদ্দশায় তাঁর সাহচর্য লাভ করেননি, বরং তিনি ছিলেন প্রথমদিকের খ্রিস্টানদের একজন উগ্র নির্যাতনকারী [6] । পরবর্তীতে দামেস্কের পথে তথাকথিত অলৌকিক দর্শনের মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রেরিত পুরুষ বা 'রাসুল' হিসেবে দাবি করেন এবং ঈসা (আ.)-এর মূল অনুসারী তথা জেরুজালেমের আদি চার্চের প্রধান হযরত পিতর (Peter) ও বার্নাবাসের সাথে তীব্র বিরোধে লিপ্ত হন। পল বনী ইসরাঈলের বাইরে অ-ইহুদি বা জেন্টাইলদের (Gentiles) মধ্যে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে তাওরাতের বিধান বা শরীয়তকে সম্পূর্ণ রহিত ঘোষণা করেন। তিনি ঈসা (আ.)-এর প্রচারিত তাওহীদি শিক্ষাকে গ্রেকো-রোমান পৌত্তলিকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে তাদের পরিচিত 'ত্রাণকর্তা দেবতা' (Savior God)-এর ছাঁচে ঢেলে সাজান [7]

কাজী আবদুল জব্বার তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ 'তাথবিত দালাইল আন-নুবুওয়াহ'-এ পলের এই রূপান্তর প্রক্রিয়া এবং খ্রিস্টানদের ওপর তার ক্ষতিকর প্রভাব অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, পল খ্রিস্টানদের কাছে নবিদের চেয়েও উচ্চ মর্যাদা লাভ করেন এবং তিনি ইহুদিদের খুশি করতে ও রোমান সাম্রাজ্যে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে ঈসা (আ.)-এর প্রকৃত শিক্ষাকে বিকৃত করেছিলেন [8] । পলের এই ধর্মতাত্ত্বিক সংশ্লেষণবাদ (Syncretism) ঈসা (আ.)-এর ঐতিহাসিক সত্তাকে আড়াল করে এক নতুন "পলিন খ্রিস্টানিটি"র জন্ম দেয়, যা ছিল মূলত গ্রীক দর্শন ও রোমান পৌত্তলিকতার এক মিশ্র রূপ [9]

তাওহীদি আকীদার বিচ্যুতি: পলিন থিওলজি বনাম ঈসা (আ.)-এর মূল শিক্ষা


ঈসা (আ.)-এর মূল শিক্ষা এবং পলিন থিওলজির মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘাতের জায়গাটি ছিল তাওহীদ বা ঈশ্বরের একত্ববাদ। গসপেলসমূহের প্রাচীনতম স্তর এবং ঐতিহাসিক যীশু আন্দোলনের গবেষণায় স্পষ্ট যে, ঈসা (আ.) নিজেকে ঈশ্বরের দাস ও প্রেরিত পুরুষ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। কাজী আবদুল জব্বার যোহনের গসপেল (Gospel of John) থেকে ঈসা (আ.)-এর মূল তাওহীদি বাণীর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন যে, ঈসা (আ.) তাঁর প্রার্থনায় স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে একমাত্র ঈশ্বরই সত্য এবং তিনি তাঁর প্রেরিত রাসুল মাত্র:

"ان الحياة الدائمة انما تجب للناس بأن يشهدوا انك انت الله الواحد الحق، وانك ارسلت يسوع المسيح"

অর্থাৎ: "আর অনন্ত জীবন এই, যেন তারা তোমাকে, একমাত্র সত্য ঈশ্বরকে, এবং যাকে তুমি পাঠিয়েছ, সেই যীশু খ্রিস্টকে জানতে পারে।" [10]

ঈসা (আ.) আরও ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি নিজের ইচ্ছায় কিছুই করেন না, বরং ঈশ্বরের ইচ্ছাই তাঁর একমাত্র চালিকাশক্তি:

"اني لم اجىء لأعمل بمشيئة نفسي ولكن بمشيئة من ارسلني"

অর্থাৎ: "কারণ আমি নিজের ইচ্ছা নয়, বরং যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, তাঁর ইচ্ছা পূরণ করতেই স্বর্গ থেকে নেমে এসেছি।" [11]

বিপরীতপক্ষে, পলিন থিওলজি ঈসা (আ.)-এর এই দাসত্ব ও মানবতার ধারণাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। পল যীশুকে "মহিমার প্রভু" (رب المجد) এবং ঈশ্বরের আদিম সত্তা হিসেবে চিত্রিত করেন, যিনি সৃষ্টির পূর্বেই বিদ্যমান ছিলেন [12] । পল প্রচার করেন যে, তাওরাতের আইন বা শরীয়ত মানুষকে মুক্তি দিতে পারে না, বরং ক্রুশবিদ্ধ যীশুর রক্তে বিশ্বাস স্থাপনই মুক্তির একমাত্র পথ। এর মাধ্যমে পল ঈসা (আ.)-এর নৈতিক ও আমলকেন্দ্রিক ধর্মকে একটি বিশ্বাসকেন্দ্রিক রহস্যবাদী ধর্মে রূপান্তরিত করেন। ঐতিহাসিক যীশু আন্দোলনের গবেষকগণ, বিশেষ করে জেসাস সেমিনারের পণ্ডিতগণ দেখিয়েছেন যে, পলের এই "ক্রুশ ও পুনরুত্থানের ধর্মতত্ত্ব" (Theology of the Cross and Resurrection) ঈসা (আ.)-এর ঐতিহাসিক শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল, যা মূলত গ্রীক দর্শনের লোগোস (Logos) তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল [13]

ত্রিত্ববাদের উত্থান এবং নিকিয়া কাউন্সিলের ভূ-রাজনৈতিক রূপান্তর


পলিন খ্রিস্টানিটির এই বিবর্তন কেবল ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা রোমান সাম্রাজ্যের ভূ-রাজনীতির সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। চতুর্থ শতাব্দীর শুরুতে সম্রাট কনস্টানটাইন (Constantine the Great) রোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ঐক্য বজায় রাখার জন্য খ্রিস্টধর্মকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন [14] । তৎকালীন সময়ে খ্রিস্টানদের মধ্যে ঈসা (আ.)-এর প্রকৃতি নিয়ে তীব্র মতবিরোধ ছিল। একদিকে ছিলেন আলেকজান্দ্রিয়ার ধর্মযাজক আরিয়ুস (Arius), যিনি ঈসা (আ.)-এর কঠোর তাওহীদি সত্তায় বিশ্বাস করতেন এবং তাঁকে ঈশ্বরের সৃষ্টি ও মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কিন্তু ঈশ্বরের সমকক্ষ নন বলে মনে করতেন [15] । অন্যদিকে ছিলেন অ্যাথানাসিয়াস (Athanasius), যিনি পলিন থিওলজির অনুসরণে যীশুকে ঈশ্বরের সমকক্ষ ও একই সারবত্তার (Homoousios) অংশ বলে দাবি করতেন।

এই ধর্মতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সংকট নিরসনের জন্য সম্রাট কনস্টানটাইন ৩২৫ খ্রিস্টাব্দে নিকিয়া কাউন্সিল (Council of Nicaea) আহ্বান করেন [16] । কাজী আবদুল জব্বার তাঁর গ্রন্থে এই কাউন্সিলের বিবরণ দিয়ে লিখেছেন যে, সেখানে প্রায় দুই হাজার ধর্মযাজক সমবেত হয়েছিলেন, কিন্তু সম্রাট কনস্টানটাইন তাঁর রাজনৈতিক স্বার্থে পলিন মতবাদের অনুসারী ৩১৮ জন যাজকের সিদ্ধান্তকে রাষ্ট্রীয়ভাবে চাপিয়ে দেন এবং আরিয়ুসের তাওহীদি অনুসারীদের কঠোরভাবে দমন করেন [17] । নিকিয়া কাউন্সিলে যে বিশ্বাসনামা বা 'সনেহোদস' (Nicene Creed) প্রণয়ন করা হয়, তা ছিল নিম্নরূপ:

«نؤمن بالله الأب الواحد، خالق ما يرى وما لا يرى، وبالرب الواحد يسوع المسيح بن الله بكر أبيه وليس بمصنوع، إله حق من إله حق، من جوهر أبيه...»

অর্থাৎ: "আমরা বিশ্বাস করি এক ঈশ্বরে, যিনি পিতা ও সর্বশক্তিমান... এবং এক প্রভু যীশু খ্রিস্টে, যিনি ঈশ্বরের পুত্র, পিতার একমাত্র জাত, ঈশ্বরের ঈশ্বর, আলোর আলো, সত্য ঈশ্বরের সত্য ঈশ্বর, যিনি সৃষ্ট নন বরং পিতার সমসারবান..." [18]

এই নিকিয়া কাউন্সিলের মাধ্যমেই পলিন খ্রিস্টানিটি রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় ধর্মে পরিণত হয় এবং ঈসা (আ.)-এর আদি তাওহীদি অনুসারীদের "ধর্মদ্রোহী" (Heretics) হিসেবে ঘোষণা করে তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয় [19] । এর ফলে ঐতিহাসিক যীশুর প্রকৃত শিক্ষা ইতিহাসের পাতা থেকে প্রায় মুছে যায় এবং তার স্থলাভিষিক্ত হয় রোমান সাম্রাজ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে তৈরি হওয়া ত্রিত্ববাদী খ্রিস্টধর্ম।

আধুনিক ঐতিহাসিক সমালোচনা ও ইসলামি ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গির সমান্তরাল বিশ্লেষণ


জেসাস সেমিনার এবং হিস্টোরিক্যাল জেসাস মুভমেন্টের আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক গবেষণার ফলাফলগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তা চৌদ্দশত বছর পূর্বে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত এবং পরবর্তীতে মুসলিম ঐতিহাসিকদের দ্বারা উপস্থাপিত সত্যেরই আধুনিক সংস্করণ। আধুনিক গবেষকগণ দীর্ঘ ঐতিহাসিক অনুসন্ধান শেষে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, যীশু নিজেকে ঈশ্বর দাবি করেননি এবং তিনি তাওরাতের বিধান বাতিল করতে আসেননি, তা হুবহু ইসলামি আকীদার অনুরূপ। কাজী আবদুল জব্বার তাঁর গ্রন্থে অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রমাণ করেছেন যে, খ্রিস্টানরা ঈসা (আ.)-এর মূল শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়ে পৌত্তলিকদের মতো বহুত্ববাদে লিপ্ত হয়েছে:

"من تأمل الامر وجدهم اشد الناس خلافا عليه واطّراحا لوصاياه في الاصول والفروع جميعا"

অর্থাৎ: "যে ব্যক্তি বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে, সে দেখতে পাবে যে খ্রিস্টানরাই ঈসা (আ.)-এর সবচেয়ে বড় বিরোধী এবং তারা বিশ্বাস ও কর্ম উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর অসিয়তসমূহকে সম্পূর্ণ বর্জন করেছে।" [20]

ইসলামি ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, মহানবি হযরত মুহাম্মাদ সা. প্রেরিত হয়েছিলেন ঈসা (আ.)-এর সেই আদি ও অকৃত্রিম তাওহীদি শিক্ষাকে পুনরুজ্জীবিত করতে, যা পলিন খ্রিস্টানিটি এবং রোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক কূটকৌশলের কারণে বিকৃত হয়ে পড়েছিল [21] । আধুনিক ঐতিহাসিক সমালোচনা পদ্ধতি যেখানে চার্চের ঐতিহ্যবাহী বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ঐতিহাসিক যীশুর সন্ধান করছে, সেখানে তারা মূলত ইসলামের ঐতিহাসিক দাবিরই সত্যতা স্বীকার করে নিচ্ছে। পলিন খ্রিস্টানিটি কর্তৃক মূল শিক্ষার এই রূপান্তর কেবল একটি ধর্মীয় বিচ্যুতি ছিল না, বরং তা ছিল প্রাচীন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি তাওহীদি আন্দোলনকে গ্রেকো-রোমান সাম্রাজ্যবাদী কাঠামোর সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এক ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি, যার স্বরূপ আজ আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ গবেষণায় এবং জেসাস সেমিনারের মতো পণ্ডিতদের চুলচেরা বিশ্লেষণে বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হচ্ছে [22]

""
৪.৪ জেসাস সেমিনার (Jesus Seminar) এবং হিস্টোরিক্যাল জেসাস (Historical Jesus) মুভমেন্ট: পলিন খ্রিস্টানিটি (Pauline Christianity) কর্তৃক মূল শিক্ষার রূপান্তর
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

৪.৪ জেসাস সেমিনার (Jesus Seminar) এবং হিস্টোরিক্যাল জেসাস (Historical Jesus) মুভমেন্ট: পলিন খ্রিস্টানিটি (Pauline Christianity) কর্তৃক মূল শিক্ষার রূপান্তর কুইজ

1 / 5

১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত 'জেসাস সেমিনার' (Jesus Seminar)-এর মূল লক্ষ্য কী ছিল?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...