খণ্ড 78
ফন্ট:100%
থিম:

২.১ সপ্তম শতাব্দীর বাইপোলার ওয়ার্ল্ড (Bipolar World): বাইজেন্টাইন (রোমান) এবং সাসানীয় (পারস্য) সাম্রাজ্যের আধিপত্য

সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভিক ও মধ্যভাগের বিশ্বব্যবস্থা ছিল এক চরম ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের উদাহরণ। তৎকালীন বিশ্ব কোনো একক শক্তির অধীনে পরিচালিত হচ্ছিল না, বরং এটি ছিল দুটি সুউচ্চ ও সুসংহত সাম্রাজ্যের দ্বৈরথ—পূর্ব রোমান বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এবং সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্য। এই দুই মহাশক্তির আধিপত্যের ফলে বিশ্বব্যবস্থা একটি 'বাইপোলার' বা দ্বি-মেরু কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। একদিকে ছিল ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণকারী বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য, আর অন্যদিকে ছিল প্রাচ্যের বিশাল ভূখণ্ড ও প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক সাসানীয় সাম্রাজ্য। এই দুই শক্তির অস্তিত্ব কেবল ভৌগোলিক সীমানার লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল দুটি ভিন্নধর্মী সভ্যতা, ধর্মতাত্ত্বিক দর্শন এবং রাজনৈতিক আদর্শের মধ্যকার এক নিরন্তর সংঘাতের প্রেক্ষাপট।

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো: ঐশ্বরিক ম্যান্ডেটের শাসন

বাইজেন্টাইন বা পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য সপ্তম শতাব্দীতে একটি অত্যন্ত জটিল ও সংকর রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছিল। এই সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে ধর্মতাত্ত্বিক বৈধতার এক অবিচ্ছেদ্য সমন্বয়। রোমান সাম্রাজ্যের প্রাচীন ঐতিহ্য ও খ্রিস্টধর্মের আধিপত্যের সংমিশ্রণে সম্রাট বা ইম্পেরার অবস্থান ছিল অত্যন্ত উচ্চ ও পবিত্র। সম্রাট কেবল একজন রাজনৈতিক শাসক ছিলেন না, বরং তাকে জনগণের কাছে 'ঈশ্বরের মনোনীত প্রতিনিধি' হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। এই ধারণাটি সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থাকে একটি অটোরিটারিয়ান বা স্বৈরাচারী রূপ প্রদান করেছিল, যেখানে সম্রাটের আদেশকে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে গণ্য করা হতো।

ঐতিহাসিক তথ্যমতে, সম্রাটদের এই আধিপত্য কেবল প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত ছিল না, বরং এটি ছিল একটি ধর্মীয় ম্যান্ডেট। সম্রাটকে দেখা হতো

صفي الإله وخليله
(ঈশ্বরের মনোনীত ও প্রিয়পাত্র) হিসেবে [1] । এই ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি সম্রাটকে জনগণের কাছে এমন এক অবস্থানে বসিয়েছিল যে, তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা ছিল একটি ধর্মীয় কর্তব্য। ফলে সম্রাট যদি কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তবে তা কেবল রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং ঐশ্বরিক বিধান হিসেবেও বিবেচিত হতো। এই প্রবণতাটি বিশেষ করে পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে আরও প্রকট হয়ে ওঠে, যখন সম্রাটরা নিজেদের শাসনকে সুসংহত করার জন্য ধর্মের ওপর অধিকতর নির্ভর করতে শুরু করেন।

এই ধারার অন্যতম উল্লেখযোগ্য সম্রাট ছিলেন জাস্টিনিয়ান (Justinian), যাঁর শাসনামলে (৫১৮-৫৬৫ খ্রিষ্টাব্দ) সাম্রাজ্যের আইনি ও ধর্মীয় কাঠামো এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল [2] । জাস্টিনিয়ানের শাসনামলে রোমান আইনের একটি সুসংহত সংকলন বা 'কর্পাস জুরিস সিভিলেস' (Corpus Juris Civilis) প্রণীত হয়েছিল, যা পরবর্তীকালে মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় আইন ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে [3] । তবে এই আইনি স্থিতিশীলতার বিপরীতে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ছিল অত্যন্ত অস্থির ও জটিল। সম্রাটদের ক্ষমতা লাভের প্রক্রিয়াটি অনেক সময় নির্বাচনের মাধ্যমে হলেও, পরবর্তীতে তা বংশানুক্রমিক ও ঐশ্বরিক নির্বাচনের দোহাই দিয়ে একচ্ছত্র অধিকারে রূপান্তরিত হয়।

বাইজেন্টাইন সমাজ ও প্রশাসনিক অস্থিরতা: ষড়যন্ত্র ও নৃশংসতার প্রেক্ষাপট

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বাহ্যিক চাকচিক্য ও ধর্মীয় মহিমা থাকলেও, এর অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর ও কলুষিত। সাম্রাজ্যের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষমতার লালসা ও ষড়যন্ত্রের সংস্কৃতি ছিল অত্যন্ত প্রবল। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, বাইজেন্টাইন শাসকরা ও অভিজাত শ্রেণি প্রায়শই প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং চরম নৃশংসতার আশ্রয় নিত [4] । বিশেষ করে কনস্টান্টিনোপল শহরের রাজনৈতিক অঙ্গনে পুরোহিত, রাজদরবারের ভৃত্য (eunuchs) এবং প্রভাবশালী নারীদের ষড়যন্ত্রের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। বিষপ্রয়োগ, রাজনৈতিক চক্রান্ত এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ভাই কর্তৃক ভাই হত্যা ছিল তৎকালীন সমাজের একটি নিয়মিত ঘটনা।

সাম্রাজ্যের এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা কেবল উচ্চপর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। সম্রাটদের শাসনব্যবস্থা ছিল চরম অটোরিটারিয়ান, যেখানে জনগণের অধিকারের চেয়ে সম্রাটের ইচ্ছা ও ধর্মীয় সংহতি রক্ষা করা ছিল অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। সম্রাটদের এই কঠোরতা ও দমনমূলক আচরণের উদাহরণ হিসেবে ৫৩২ খ্রিষ্টাব্দে জাস্টিনিয়ানের শাসনামলে সংঘটিত বিদ্রোহের কথা উল্লেখ করা যায়। জাস্টিনিয়ানের শাসনকালে যখন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কারণে বিদ্রোহীরা (যাঁদের 'জর্ক' এবং 'খাদর' গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়) বিক্ষোভ প্রদর্শন করে, তখন সম্রাট অত্যন্ত নির্মমভাবে তা দমন করেন। মাত্র ছয় দিনের ব্যবধানে প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার মানুষ এই দমনে প্রাণ হারায় [5]

সাম্রাজ্যের এই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নৈতিক অবক্ষয় মূলত এর প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। একদিকে যেমন সম্রাটরা নিজেদের 'ঈশ্বরের প্রতিনিধি' হিসেবে দাবি করতেন, অন্যদিকে তাঁদের শাসনব্যবস্থা ছিল রক্তক্ষয়ী ও দমনমূলক। এই বৈপরীত্য বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সামাজিক স্থিতিশীলতাকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ফেলত। সাম্রাজ্যের এই অভ্যন্তরীণ ক্ষত ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সপ্তম শতাব্দীতে যখন বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটার উপক্রম হলো, তখন এটি একটি বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক দুর্বলতা হিসেবে আবির্ভূত হয়।

সাসানীয় পারস্য: প্রাচ্যের মহাশক্তি ও বাইজেন্টাইন প্রতিদ্বন্দ্বী

পশ্চিমের বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিপরীতে প্রাচ্যের ভূখণ্ডে অবস্থান করছিল সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্য। এটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধান মেরু। সাসানীয় সাম্রাজ্য কেবল একটি রাজনৈতিক শক্তি ছিল না, বরং এটি ছিল একটি প্রাচীন ও সুসংহত সভ্যতা, যা পারস্যের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে চলত। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে সাসানীয়দের সম্পর্ক ছিল মূলত একটি 'জিরো-সাম গেম' (Zero-sum game) বা প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্কের, যেখানে একজনের বিজয় মানেই অন্যজনের পরাজয়।

সাসানীয় ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের মধ্যকার এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল সীমান্ত বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের এক নিরন্তর প্রচেষ্টা। বিশেষ করে আর্মেনিয়া, মিশর এবং সিরিয়ার মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো ছিল এই দুই মহাশক্তির লড়াইয়ের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু [6] । এই অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণাধিকার লাভ করা মানে ছিল মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যপথ এবং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করা। সাসানীয়রা তাদের সামরিক শক্তি ও প্রশাসনিক দক্ষতার মাধ্যমে বাইজেন্টাইনদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আসছিল, যা বিশ্বব্যবস্থাকে একটি চরম অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছিল।

সাসানীয় সাম্রাজ্যের প্রভাব ও বাইজেন্টাইনদের সাথে তাদের সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছিল। এই দুই শক্তির মধ্যকার লড়াই কেবল সামরিক নয়, বরং এটি ছিল সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই। একদিকে রোমান-খ্রিস্টান ঐতিহ্য, অন্যদিকে পারস্যের প্রাচীন ও ভিন্নধর্মী সভ্যতা—এই দুই মেরুর সংঘাত সপ্তম শতাব্দীর বিশ্বব্যবস্থাকে এক অনন্য ও জটিল রূপ দান করেছিল।

একটি দ্বি-মেরু বিশ্ব ও ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য

সপ্তম শতাব্দীর এই বাইপোলার বিশ্বব্যবস্থা ছিল এক অদ্ভুত ভারসাম্যহীনতার প্রতীক। একদিকে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের আইনি ও ধর্মীয় কাঠামোর সুসংহত রূপ, অন্যদিকে সাসানীয় পারস্যের সামরিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব—এই দুই শক্তি একে অপরের পরিপূরক না হয়ে বরং একে অপরের প্রধান শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। এই দ্বিমুখী আধিপত্যের ফলে বিশ্বব্যবস্থায় একটি 'পাওয়ার ভ্যাকিউম' বা ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, যা মূলত এই দুই শক্তির দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে সৃষ্ট ক্লান্তি ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে ঘটেছিল।

সাম্রাজ্য দুটির মধ্যকার এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল তাদের নিজেদের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি ও জনমিতিকে প্রভাবিত করছিল। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, ষড়যন্ত্র এবং দমনমূলক শাসন [7] এবং সাসানীয়দের সাথে তাদের নিরন্তর যুদ্ধ সাম্রাজ্যটিকে ভেতর থেকে ক্ষয় করতে শুরু করেছিল। এই অবস্থায় বিশ্বব্যবস্থা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিল, যেখানে দুটি মহাশক্তিই তাদের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চাপে তারা ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল।

পরিশেষে বলা যায়, সপ্তম শতাব্দীর এই বাইপোলার বিশ্বব্যবস্থা ছিল এক বিশাল ও জটিল রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চ। বাইজেন্টাইন ও সাসানীয় সাম্রাজ্যের এই আধিপত্য কেবল তৎকালীন সময়ের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রই নির্ধারণ করেনি, বরং এটি এমন এক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল যা পরবর্তীকালে বিশ্ব ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। এই দুই মহাশক্তির ক্ষয় ও তাদের মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা একটি নতুন শক্তির উত্থানের জন্য প্রয়োজনীয় ভূ-রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করতে শুরু করেছিল।

""
২.১ সপ্তম শতাব্দীর বাইপোলার ওয়ার্ল্ড (Bipolar World): বাইজেন্টাইন (রোমান) এবং সাসানীয় (পারস্য) সাম্রাজ্যের আধিপত্য
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

২.১ সপ্তম শতাব্দীর বাইপোলার ওয়ার্ল্ড (Bipolar World): বাইজেন্টাইন (রোমান) এবং সাসানীয় (পারস্য) সাম্রাজ্যের আধিপত্য কুইজ

1 / 5

সপ্তম শতাব্দীতে বিশ্বব্যবস্থা মূলত কয়টি পরাশক্তির আধিপত্যে নিয়ন্ত্রিত ছিল?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...