একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে 'ওয়ার অন টেরর' বা 'সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধ' নামক যে বয়ানটি প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল, তা কেবল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের কোনো প্রচেষ্টা ছিল না, বরং তা ছিল একটি সুপরিকল্পিত ভূ-রাজনৈতিক কৌশল। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য ছিল মুসলিম বিশ্বের সার্বভৌমত্ব খর্ব করা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে পশ্চিমা আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এই যুদ্ধের আড়ালে যে জিওপলিটিক্যাল ক্যাজুয়ালিটি বা ভূ-রাজনৈতিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, তা কেবল প্রাণহানির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা রাষ্ট্রকাঠামোর পতন, সীমান্ত পুনর্নির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতার এক করুণ উপাখ্যান।
ভূ-রাজনৈতিক ক্যাজুয়ালিটি এবং কৌশলগত অস্থিতিশীলতা
সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে পরিচালিত এই যুদ্ধ মূলত একটি 'গ্লোবাল হেজিমনি' বা বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যে সামরিক হস্তক্ষেপ চালানো হয়েছে, তার ফলে অনেক রাষ্ট্র তাদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে এবং 'ফেইলড স্টেট' বা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে, যা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের 'কালেক্টিভ সিকিউরিটি' বা যৌথ নিরাপত্তা ধারণার চরম পরিপন্থী।
এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের গভীরতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল মুসলিম উম্মাহর সামগ্রিক শক্তির বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত আক্রমণ। এই বিষয়ে গবেষণাধর্মী সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মুসলিম উম্মাহ বর্তমানে এক তীব্র সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা বৈশ্বিক অহংকারী শক্তিগুলোর দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এই শক্তির লক্ষ্য হলো মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তকে বিভিন্ন স্তরে লক্ষ্যবস্তু করা এবং এর জন্য তারা সম্ভাব্য সকল পথ ও মাধ্যম ব্যবহার করছে। আরবিতে এই পরিস্থিতিকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে:
تعيش الأمة الإسلامية صراعاً محموماً, وحرباً ضروساً, تقودها قوى الاستكبار العالمي, تستهدف جميع أصقاع الأمة الإسلامية على مختلف الصعد, وتستخدم جميع الوسائل والطرق
[1] এই 'استكبار العالمي' বা বৈশ্বিক অহংকারের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সেইসব সামরিক অভিযানে, যেখানে সন্ত্রাসবাদ দমনের অজুহাতে পুরো একটি অঞ্চলের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলে যে ভূ-রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা স্থানীয় চরমপন্থাকে আরও উসকে দিয়েছে, যা পরোক্ষভাবে পশ্চিমা শক্তির জন্য পুনরায় হস্তক্ষেপ করার সুযোগ করে দিয়েছে। এই চক্রাকার প্রক্রিয়াটি মুসলিম বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে।
তদুপরি, এই যুদ্ধের একটি বিশেষ দিক ছিল এর বাধ্যতামূলক প্রকৃতি। বিশ্বজুড়ে এই যুদ্ধের বয়ানটি এমনভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, যে রাষ্ট্র বা শক্তি এর সাথে একমত হয়নি, তাকেই পরোক্ষভাবে সন্ত্রাসবাদের মদতদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের ফলে অনেক মুসলিম রাষ্ট্র তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে পশ্চিমা এজেন্ডার অনুসারী হতে বাধ্য হয়েছে। এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, আমেরিকার এই সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধে হাজার হাজার নিরপরাধ প্রাণ ঝরে পড়েছে এবং সবচেয়ে হাস্যকর বিষয় হলো, এই যুদ্ধটি সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং সবাইকে এতে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। আরবিতে এর বর্ণনা নিম্নরূপ:
وفي الحرب التي شنتها أمريكا على الإرهاب أُزهقت فيها ألوف مؤلفة من الأرواح البريئة، ومن المهازل أن هذه الحرب القائمة فرض على الجميع القيام بها، وطولبوا
[2] সিস্টেমেটিক লেবেলিং এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ
জিওপলিটিক্যাল ক্যাজুয়ালিটির পাশাপাশি এই যুদ্ধের একটি বড় অংশ ছিল 'সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার' বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। এখানে 'সন্ত্রাসবাদ' শব্দটিকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে যা সরাসরি মুসলিম পরিচয় এবং ইসলামি বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এই লেবেলিংয়ের উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বজনীনভাবে মুসলিমদের প্রতি একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা, যাতে তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক ও রাজনৈতিক দমনপীড়নকে বৈধতা দেওয়া যায়।
সেপ্টেম্বর ১১-এর পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে যে বয়ান তৈরি করা হয়েছিল, তাতে প্রমাণ ছাড়াই মুসলিমদের প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল, কারণ এটি সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মনে এক ধরণের হীনম্মন্যতা এবং বৈশ্বিক নাগরিক সমাজের চোখে তাদের প্রতি ঘৃণা ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। এই মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণের ফলে মুসলিমরা কেবল রাজনৈতিকভাবে নয়, বরং সামাজিকভাবেও প্রান্তিক হয়ে পড়েছে। এই বিষয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যে, সেপ্টেম্বর পরবর্তী পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় অনুপস্থিতি হলো 'ইসলামি সন্ত্রাসবাদ' নামক একটি কাল্পনিক ধারণা, যা প্রমাণ ছাড়াই মুসলিমদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা ইউরোপ এবং আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে মুসলিম অভিবাসীদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে এবং তাদের প্রতি বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে তুরস্কের মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধের ফলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমের প্রসারের ফলে ইউরোপে মুসলিম অভিবাসনের বিষয়ে এক ধরণের আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছে, যা মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। এই পরিস্থিতি মুসলিমদের জন্য এক নতুন ধরণের অস্তিত্ব সংকটের জন্ম দিয়েছে।
এই লেবেলিংয়ের সবচেয়ে করুণ দিক হলো, যখন প্রকৃত সন্ত্রাসবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন যখন হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করছে, তখন ইসলামের শান্তির বাণীকে উপেক্ষা করে একে 'সন্ত্রাসবাদের ধর্ম' হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। অথচ ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, বিশ্বযুদ্ধগুলোতে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে এবং যে গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, তার তুলনায় ইসলামি শরীয়াহর যুদ্ধনীতি ছিল অত্যন্ত মানবিক এবং নিয়ন্ত্রিত। এই বৈপরীত্যটিই প্রমাণ করে যে, 'ওয়ার অন টেরর' মূলত একটি রাজনৈতিক মুখোশ ছিল, যার অন্তরালে ছিল মুসলিম বিশ্বের মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় নিশ্চিত করার পরিকল্পনা।
ইকোনোমিক ধ্বংসযজ্ঞ এবং সম্পদ লুণ্ঠনের কৌশল
ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সাথে সাথে 'ওয়ার অন টেরর'-এর সবচেয়ে বিধ্বংসী প্রভাব পড়েছে মুসলিম বিশ্বের অর্থনীতিতে। এই যুদ্ধের নামে যে সামরিক অভিযানগুলো চালানো হয়েছে, তা কেবল অবকাঠামো ধ্বংস করেনি, বরং পরিকল্পিতভাবে মুসলিম দেশগুলোর অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। একে বলা যেতে পারে 'ইকোনোমিক ক্যাজুয়ালিটি', যেখানে যুদ্ধের খরচ এবং ধ্বংসের দায়ভার চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে আক্রান্ত দেশগুলোর ওপর।
প্রথমত, এই যুদ্ধের ফলে যে বিশাল পরিমাণ অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা সেই দেশগুলোর জিডিপি-র বড় অংশকে গ্রাস করেছে। রাস্তাঘাট, সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার মাধ্যমে এই দেশগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা যেখানে এই দেশগুলো পুনর্গঠনের জন্য পশ্চিমা ঋণ এবং শর্তসাপেক্ষ সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এই অর্থনৈতিক নির্ভরতা মূলত একটি নতুন ধরণের উপনিবেশবাদ, যা সামরিক দখলের চেয়েও বেশি কার্যকর। এই সামগ্রিক সংঘাতের লক্ষ্য ছিল মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি স্তরে আঘাত করা, যার মধ্যে অর্থনৈতিক স্তরটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আরবিতে এই কৌশলগত আক্রমণের কথা বলা হয়েছে:
تستهدف جميع أصقاع الأمة الإسلامية على مختلف الصعد, وتستخدم جميع الوسائل والطرق
[3] দ্বিতীয়ত, এই যুদ্ধের আড়ালে মুসলিম বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে খনিজ তেল এবং গ্যাসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার এক গোপন এজেন্ডা কার্যকর করা হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখা গেছে যে, যেসব দেশে সম্পদের প্রাচুর্য ছিল, সেখানেই 'সন্ত্রাসবাদ দমনের' নামে দীর্ঘমেয়াদী সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। এই উপস্থিতির ফলে সম্পদের ন্যায্য বণ্টন বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে সম্পদের লুণ্ঠন সহজতর হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় 'ওয়ার অন টেরর' একটি বৈধ আবরণ হিসেবে কাজ করেছে, যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক লুণ্ঠনকে 'নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ' হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতিকে 'আমেরিকা এবং সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধের দ্বান্দ্বিকতা' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা মূলত অর্থনৈতিক আধিপত্যের একটি অংশ।
أمريكا وجدلية الحرب على الإرهاب
[4] তৃতীয়ত, এই যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে পুঁজি flight বা মূলধন বহির্গমন ঘটেছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। এই অর্থনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক দেশ তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের সক্ষমতা হারিয়েছে। অথচ ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আধুনিক যুদ্ধের এই ধ্বংসাত্মক রূপ এবং গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ব্যবহার মুসলিম বিশ্বের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর বিপরীতে ইসলামকে সন্ত্রাসবাদের ধর্ম বলে অপবাদ দেওয়া হয়েছে। এই বৈপরীত্যটিই প্রমাণ করে যে, অর্থনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞটি ছিল একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক অস্ত্র।
وما هو معلوم من العدوان الآثم الذي استخدمت فيه أسلحة الدمار الشامل في كثير من الحروب الطاحنة هنا وهناك، والتي ما زالت شعوب كثيرة تعاني منها، والعالم الإِسلامي كذلك! ومع هذا الواقع الأليم يفتري بعض الجاهلين الضالّين المعاصرين بأن الإِسلام دين الإرهاب!
[5] শান্তির বয়ান বনাম যুদ্ধের বাস্তবতা: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ
সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধের এই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ এবং বর্তমান বৈশ্বিক বয়ানের মধ্যকার বিশাল ব্যবধান। একদিকে যখন পশ্চিমা শক্তিগুলো শান্তির কথা বলে মুসলিম বিশ্বে রক্তপাত ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা হলো শান্তি এবং নিরাপত্তা। পবিত্র কুরআনের নির্দেশিত 'সিলম' বা শান্তির পথে আহ্বান জানানোই ছিল ইসলামের মূল লক্ষ্য।
ইসলামি শরীয়াহর দৃষ্টিতে যুদ্ধ কেবল আত্মরক্ষার জন্য এবং জুলুম দমনের জন্য অনুমোদিত। কিন্তু 'ওয়ার অন টেরর'-এর নামে যে যুদ্ধ চালানো হয়েছে, তা ছিল আক্রমণাত্মক এবং সাম্রাজ্যবাদী। এই যুদ্ধের ফলে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তা ইসলামের সেই আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত, যেখানে মুমিনদের শান্তি ও নিরাপত্তার ছায়াতলে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, মুমিনদের জন্য কেবল দুটি পথ রয়েছে: হয় সম্পূর্ণভাবে শান্তির পথে প্রবেশ করা, অথবা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করা। যারা শান্তির পথ ত্যাগ করে যুদ্ধের পথে হাঁটে, তারা মূলত ধ্বংসের পথ বেছে নেয়।
إمّا الدخول في السلم كافةً! وإمّا اتباع خطوات الشيطان! إمّا إسلام وإমّا جاهليّة! إما هدى وإمّا ضلال!
[6] এই বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, 'ওয়ার অন টেরর' কেবল একটি সামরিক অভিযান ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সামগ্রিক যুদ্ধ—রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক। এর ফলে মুসলিম বিশ্ব যে জিওপলিটিক্যাল ক্যাজুয়ালিটির সম্মুখীন হয়েছে, তা আগামী কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত প্রভাব ফেলবে। সার্বভৌমত্বের ক্ষতি, অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ব এবং সামাজিকভাবে প্রান্তিক হয়ে পড়ার এই প্রক্রিয়াটি প্রমাণ করে যে, বৈশ্বিক রাজনীতিতে 'নিরাপত্তা' শব্দটি অনেক সময় 'দমন' এবং 'লুণ্ঠন'-এর প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
পরিশেষে, এই যুদ্ধের ফলে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, তা কেবল মুসলিম বিশ্বের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য এক সতর্কবার্তা। যখন কোনো শক্তি নিজেকে বিশ্বপুলিশ হিসেবে ঘোষণা করে অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে, তখন সেখানে শান্তির চেয়ে সংঘাতের সম্ভাবনা বেশি থাকে। মুসলিম উম্মাহর জন্য এখন প্রয়োজন এই ভূ-রাজনৈতিক ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসে একটি ঐক্যবদ্ধ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা, যা কেবল বাহ্যিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হবে না, বরং নিজস্ব সম্পদ এবং আদর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।