৯.১.২ কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ বন্ধ হওয়ায় খায়বারের ইহুদিদের দিকে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার সামরিক স্বাধীনতা (Military Freedom) অর্জন
হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে মক্কান কুরাইশদের সাথে যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা কেবল একটি কূটনৈতিক সমঝোতা ছিল না, বরং তা ছিল ইসলামি রাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের এক যুগান্তকারী মোড়। এই সন্ধির ফলে মদিনার উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তের নিরাপত্তা ঝুঁকি হ্রাস পায় এবং মুসলিম বাহিনী প্রথমবারের মতো একটি নির্দিষ্ট শত্রুর বিরুদ্ধে পূর্ণ শক্তি কেন্দ্রীভূত করার সুযোগ লাভ করে। এই কৌশলগত অবস্থাকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় 'স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি' বা 'সামরিক স্বাধীনতা' বলা যেতে পারে। এর ফলে নবি সা. খায়বারের ইহুদিদের বিরুদ্ধে একটি সুপরিকল্পিত এবং নিবিড় সামরিক অভিযান পরিচালনার সুযোগ পান, যা এর আগে কুরাইশদের সাথে চলমান সংঘাতের কারণে অসম্ভব ছিল।
হুদায়বিয়ার সন্ধি এবং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের পরিবর্তন
হুদায়বিয়ার সন্ধিটি ছিল একটি অত্যন্ত দূরদর্শী ভূ-রাজনৈতিক চাল। এই সন্ধির মাধ্যমে কুরাইশরা আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিমদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয় এবং আগামী দশ বছরের জন্য যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এর ফলে মদিনার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর যে প্রচণ্ড চাপ ছিল, তা হঠাৎ করেই প্রশমিত হয়। এর আগে মুসলিমদের সর্বদা এই আশঙ্কায় থাকতে হতো যে, খায়বারের ইহুদিরা যদি মদিনার ওপর আক্রমণ করে, তবে কুরাইশরা সেই সুযোগে মক্কায় থেকে পাল্টা আক্রমণ চালাতে পারে। এই দ্বিমুখী যুদ্ধের ঝুঁকি (Two-front war risk) মুসলিমদের সামরিক গতিশীলতাকে সীমিত করে রেখেছিল।
কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার ফলে নবি সা. মদিনার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে উত্তর দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ পান। এই সামরিক স্বাধীনতার ফলে মুসলিম বাহিনী এখন আর রক্ষণাত্মক অবস্থানে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তারা আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণের সক্ষমতা অর্জন করে। ঐতিহাসিকদের মতে, হুদায়বিয়ার সন্ধি ছিল খায়বার বিজয়ের মূল ভিত্তি, কারণ এটি মুসলিমদের জন্য একটি নিরাপদ 'রিয়ার গার্ড' বা পশ্চাৎদেশ নিশ্চিত করেছিল। এই সন্ধির ফলে মদিনার সামরিক সম্পদ এবং জনশক্তিকে খণ্ড খণ্ডভাবে বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে না দিয়ে একটি একক শক্তিশালী বাহিনীতে রূপান্তর করা সম্ভব হয় [1] ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সন্ধিটি কুরাইশদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করেছিল এবং মুসলিমদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অবকাশ (Strategic Breathing Space) তৈরি করে দিয়েছিল। এই অবকাশটি নবি সা. অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ব্যবহার করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, খায়বারের ইহুদিরা কেবল একটি স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং তারা ছিল আরবের বিভিন্ন গোত্র এবং কুরাইশদের সাথে গোপন আঁতাতের মূল কেন্দ্র। তাই কুরাইশদের সাথে শান্তিচুক্তি হওয়ার পরপরই খায়বারের দিকে অগ্রসর হওয়া ছিল একটি অনিবার্য সামরিক প্রয়োজন [2] ।
খায়বার: ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু এবং সামরিক হুমকির বিশ্লেষণ
খায়বার ছিল তৎকালীন আরবের অন্যতম সমৃদ্ধ এবং সুরক্ষিত দুর্গবেষ্টিত এলাকা। তবে এর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চেয়েও এর রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব ছিল অনেক বেশি বিপজ্জনক। বনু নাযির গোত্র যখন মদিনা থেকে বহিষ্কৃত হয়, তখন তারা খায়বারে আশ্রয় নেয় এবং সেখান থেকেই মদিনার বিরুদ্ধে একটি সুসংগঠিত ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে শুরু করে। খায়বার কেবল একটি বসতি ছিল না, বরং এটি ছিল বহির্দেশী শত্রুদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে উস্কানি দেওয়ার একটি প্রধান কেন্দ্র।
আরবিতে একে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে:
অর্থাৎ, "খায়বার ছিল ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের একটি আস্তানা এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে সামরিক উস্কানি ও উত্তেজনার একটি কেন্দ্র" [3] । এই ষড়যন্ত্রের গভীরতা ছিল এতটাই যে, খায়বারের ইহুদিরা কুরাইশদের সাথে গোপন যোগাযোগ রক্ষা করত এবং মদিনার বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত জোট গঠনের চেষ্টা চালাত। তারা কেবল নিজেদের দুর্গ রক্ষা করেনি, বরং আরবের অন্যান্য বেদুইন গোত্রদের প্ররোচিত করে মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করার পরিকল্পনা করত।
সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে খায়বারের দুর্গগুলো ছিল অত্যন্ত দুর্ভেদ্য। তাদের উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং খাদ্য মজুতের সক্ষমতা তাদের দীর্ঘকাল যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করত। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল তাদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং অতি-আত্মবিশ্বাস। তারা মনে করেছিল যে, কুরাইশদের সাথে মুসলিমদের সংঘাত চলবে এবং মুসলিমরা কখনোই খায়বারের মতো শক্তিশালী দুর্গের সামনে দাঁড়ানোর সাহস করবে না। কিন্তু হুদায়বিয়ার সন্ধির পর যখন মুসলিমরা তাদের পূর্ণ শক্তি নিয়ে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন খায়বারের এই কৌশলগত হিসাব সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হলো [4] ।
সামরিক স্বাধীনতার প্রয়োগ এবং কৌশলগত সংহতকরণ
কুরাইশদের সাথে যুদ্ধবিরতির ফলে অর্জিত 'সামরিক স্বাধীনতা'র সবচেয়ে বড় প্রভাব ছিল মুসলিম বাহিনীর মনস্তাত্ত্বিক এবং কৌশলগত সংহতকরণ। এখন মুসলিমদের আর মক্কার দিকে নজর রাখতে হতো না, ফলে তারা সম্পূর্ণ মনোযোগ খায়বারের দুর্ভেদ্য দুর্গগুলোর দিকে নিবদ্ধ করতে সক্ষম হন। এই অবস্থাকে সামরিক পরিভাষায় 'কনসেন্ট্রেশন অফ ফোর্স' (Concentration of Force) বলা হয়, যেখানে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করা হয়।
নবি সা. এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে একটি সুশৃঙ্খল এবং শক্তিশালী বাহিনী গঠন করেন। এই বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য ছিল খায়বারের সামরিক সক্ষমতাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা যাতে আরবের কোনো শত্রু আর খায়বারকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে। এই অভিযানের মাধ্যমে নবি সা. কেবল একটি এলাকা জয় করতে চাননি, বরং তিনি আরবের উত্তর দিকের ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এই সামরিক স্বাধীনতার ফলে মুসলিমরা দ্রুত গতিতে খায়বারের দিকে অগ্রসর হতে সক্ষম হন, যা শত্রুপক্ষকে অপ্রস্তুত করে দিয়েছিল [5] ।
এই কৌশলগত পরিবর্তনের ফলে মদিনার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন আর কেবল শহরের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকল না, বরং তা মদিনার বাইরের কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে বিস্তৃত হলো। খায়বারের ইহুদিরা যখন দেখল যে মুসলিমরা কোনো বাধা ছাড়াই তাদের দিকে এগিয়ে আসছে, তখন তাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তারা বুঝতে পারল যে, কুরাইশদের সাথে মুসলিমদের সন্ধি তাদের জন্য একটি চরম বিপর্যয় নিয়ে এসেছে, কারণ এখন আর তাদের বাঁচাতে কোনো বহির্দেশী শক্তি নেই। এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ খায়বারের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছিল [6] ।
অভিযানের প্রস্তুতি এবং সামরিক গতিশীলতা
খায়বারের দিকে যাত্রার প্রস্তুতি ছিল অত্যন্ত নিবিড় এবং সুপরিকল্পিত। নবি সা. এমন একটি বাহিনী নির্বাচন করেন যারা দীর্ঘমেয়াদী অবরোধ যুদ্ধে সক্ষম। ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ১৪০০ জন। আরবিতে এই সৈন্যসংখ্যাকে এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:
অর্থাৎ, "তিনি ১৪০০ জন সৈন্যের একটি বাহিনী নিয়ে যাত্রা শুরু করেন" [7] । এই সৈন্যসংখ্যা খায়বারের বিশাল দুর্গের তুলনায় কম মনে হলেও, তাদের মনোবল এবং নেতৃত্বের দক্ষতা ছিল অতুলনীয়।
নবি সা. এই অভিযানে অত্যন্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করেছিলেন, যাতে খায়বারের ইহুদিরা আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে না পারে। তিনি মদিনা থেকে খায়বারের দিকে এমনভাবে অগ্রসর হন যে, শত্রুপক্ষ বুঝতে পারেনি কখন মুসলিম বাহিনী তাদের সীমানায় প্রবেশ করেছে। এই দ্রুত গতিশীলতা (Rapid Mobility) ছিল সামরিক স্বাধীনতারই একটি ফল। যদি কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ চলত, তবে এই পরিমাণ সৈন্যকে মদিনা থেকে দূরে পাঠানো হতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ মদিনা অরক্ষিত হয়ে পড়ত। কিন্তু এখন মদিনার নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকায় এই সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয় [8] ।
খায়বারে পৌঁছানোর পর মুসলিম বাহিনী অত্যন্ত কৌশলে দুর্গগুলোকে ঘিরে ফেলে। এই অবরোধের ফলে খায়বারের ইহুদিরা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাদের সাথে বাইরের জগতের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তারা চরম মানসিক চাপে ভোগে। এই পর্যায়ে আলি রা. এর মতো দক্ষ সেনাপতিদের ভূমিকা হয়ে ওঠে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন খায়বারের দুর্গগুলো একের পর এক পতনের মুখে পড়ে, তখন মুসলিম বাহিনীর এই সুসংগঠিত আক্রমণ প্রমাণ করে যে, সামরিক স্বাধীনতা এবং সঠিক কৌশল কীভাবে একটি শক্তিশালী শত্রুকে পরাজিত করতে পারে [9] ।
খায়বারের ইহুদিরা যখন দেখল যে তাদের সমস্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ হচ্ছে এবং মুসলিমদের আক্রমণ তীব্রতর হচ্ছে, তখন তারা সন্ধির প্রস্তাব পাঠাতে শুরু করে। ইবনে আবি আল-হাকিক যখন সন্ধির জন্য প্রস্তাব পাঠালেন, তখন নবি সা. অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তা মোকাবিলা করেন। এই দৃঢ়তা এবং সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব খায়বারের পতনকে অনিবার্য করে তোলে [10] । মুসলিমরা এখন আর কেবল আত্মরক্ষায় ব্যস্ত ছিল না, বরং তারা আরবের সামগ্রিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য খায়বারের মতো ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রগুলোকে নির্মূল করার সক্ষমতা অর্জন করেছিল।