১১.১ ওহী ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক: কিয়ামত ও মহাবিশ্ব বিষয়ক আয়াত
মানবসভ্যতার জ্ঞানতাত্ত্বিক বিবর্তনের ইতিহাসে ওহী (ঐশী প্রত্যাদেশ) এবং বিজ্ঞান (Science) সর্বদা একটি জটিল ও গভীর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেছে। একদিকে যেখানে বিজ্ঞান তার অভিজ্ঞতাবাদী (Empirical) ও পর্যবেক্ষণমূলক পদ্ধতির মাধ্যমে মহাবিশ্বের বাহ্যিক ও বস্তুগত নিয়মাবলি উন্মোচন করতে সচেষ্ট, অন্যদিকে ওহী বা ঐশী বাণী মানুষের অস্তিত্বের গূঢ় রহস্য, মহাজাগতিক সৃষ্টির উদ্দেশ্য এবং কিয়ামতের মতো অতীন্দ্রিয় (Metaphysical) ঘটনাবলির সত্যতা প্রদান করে। এই দুই ধারার মধ্যকার সম্পর্কটি কেবল দ্বন্দ্বের নয়, বরং এটি একটি গভীর সমন্বয় ও পরিপূরক সম্পর্কের ক্ষেত্র, যেখানে বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ও ওহীর অসীমতা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।
ওহীর জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি ও বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা
আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের (Epistemology) প্রেক্ষাপটে ওহীকে একটি স্বতন্ত্র ও উচ্চতর জ্ঞানভাণ্ডার হিসেবে গণ্য করা হয়। বিজ্ঞান মূলত 'কিভাবে' (How) প্রশ্নের উত্তর খোঁজে—অর্থাৎ মহাজাগতিক বস্তুসমূহ কীভাবে কাজ করে, কিন্তু ওহী উত্তর দেয় 'কেন' (Why) প্রশ্নের—অর্থাৎ মহাবিশ্বের সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য কী। ওহী কেবল মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি সরাসরি স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রেরিত একটি পরম সত্য। ওহীর এই বিশেষত্বটি বিজ্ঞান ও যুক্তির সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে।
বিজ্ঞান ও যুক্তি মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি ও অজানাকে জানার ক্ষেত্রে অনস্বীকার্য ভূমিকা পালন করে। তবে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান যখন অতীন্দ্রিয় বা গায়িব (Ghaib) জগতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়, তখন তার কার্যকারিতা ও সীমানা নির্ধারিত হয়ে যায়। মহাবিশ্বের প্রকৃত স্বরূপ এবং জীবনের মূল রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞান ও যুক্তি যে পর্যায়ে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে, তার বাইরেও অস্তিত্বের এমন অনেক স্তর রয়েছে যা কেবল ওহীর মাধ্যমেই জানা সম্ভব।
বিজ্ঞান ও যুক্তির এই সীমাবদ্ধতা মূলত তাদের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের কারণে ঘটে। বিজ্ঞান কেবল সেই বিষয়গুলোকেই বিশ্লেষণ করতে পারে যা পর্যবেক্ষণযোগ্য এবং যা প্রাকৃতিক নিয়মের (Natural Laws) অধীন। কিন্তু ওহী এমন সব সত্যের ঘোষণা দেয় যা প্রাকৃতিক নিয়মের ঊর্ধ্বে বা যা প্রাকৃতিক নিয়মের স্রষ্টা কর্তৃক নির্ধারিত। সুতরাং, বিজ্ঞানের মাধ্যমে মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হলেও, ওহী ব্যতীত মহাবিশ্বের চূড়ান্ত গন্তব্য বা কিয়ামতের মতো মহাজাগতিক বিবর্তন সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। [1] মহাবিশ্ব: ওহী ও মহাজাগতিক নিদর্শনের মিলনস্থল
ইসলামি দর্শনে মহাবিশ্ব কেবল জড় পদার্থের সমষ্টি নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর অস্তিত্ব ও ক্ষমতার এক বিশাল নিদর্শন (Ayat)। ওহী মহাবিশ্বকে একটি 'জ্ঞানের উৎস' হিসেবে নির্দেশিত করেছে। বিজ্ঞান যখন মহাজাগতিক বস্তুসমূহ নিয়ে গবেষণা করে, তখন সে মূলত ওহীর দ্বারা নির্দেশিত সেই মহাজাগতিক নিদর্শনগুলোকেই পর্যবেক্ষণ করে। ওহী ও বিজ্ঞানের এই সংযোগস্থলে মহাবিশ্ব একটি 'খিলাফত' বা প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ওহী মানুষকে মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করতে এবং এর মাধ্যমে স্রষ্টাকে চিনতে উদ্বুদ্ধ করে। মহাবিশ্ব হলো একটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য মহাজাগতিক বাস্তবতা (Sensory Cosmic Reality), যা ওহীর সত্যতাকে প্রমাণ করার জন্য একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। ওহী মহাবিশ্বকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যা মানুষকে কেবল বস্তুগত জ্ঞান নয়, বরং আধ্যাত্মিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক উপলব্ধির দিকে ধাবিত করে।
"والوحي يبثُّ في واقع كوني محسوس، ويبرهن على صحَّته من الكون، ويرشد إلى الكون كمصدر للمعرفة، ويجعله محورَ استخلافٍ الوحيُ منهاجه" [2] এই প্রেক্ষাপটে, মহাবিশ্ব ও ওহীর সম্পর্কটি অত্যন্ত নিবিড়। ওহী মহাবিশ্বের নিয়মাবলিকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে, যা বিজ্ঞানকে গবেষণার পথ দেখায়। অন্যদিকে, বিজ্ঞান যখন মহাজাগতিক বিস্ময়গুলো উন্মোচন করে, তখন তা মূলত ওহীর সত্যতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। সুতরাং, বিজ্ঞানের অগ্রগতি ওহীর পরিপন্থী নয়, বরং ওহীর নির্দেশিত মহাজাগতিক সত্যেরই একটি অংশিক প্রকাশ মাত্র। [3] কিয়ামত ও মহাজাগতিক নিয়মাবলির পরিবর্তন
মহাবিশ্বের বর্তমান অবস্থা এবং এর ভবিষ্যৎ পরিণতি বা কিয়ামত সম্পর্কে ওহী যে বর্ণনা প্রদান করে, তা বিজ্ঞানের প্রচলিত প্রাকৃতিক নিয়মের (Natural Laws) সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে। বিজ্ঞান মহাবিশ্বের বিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব (যেমন: Big Bang বা Heat Death) প্রদান করলেও, কিয়ামতের সময় মহাজাগতিক নিয়মাবলির যে আমূল পরিবর্তন ঘটবে, তা বিজ্ঞানের গাণিতিক বা পর্যবেক্ষণমূলক মডেলের আওতাভুক্ত নয়। ওহী এখানে একটি 'মহাজাগতিক বিপর্যয়' বা আমূল পরিবর্তনের কথা বলে, যা প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলোকে অকার্যকর করে দেবে।
কিয়ামতের সময় মহাবিশ্বের যে অবস্থা—যেমন নক্ষত্রের আলো নিভে যাওয়া, আকাশ ফেটে যাওয়া বা পাহাড়সমূহ তুলার মতো উড়তে থাকা—এগুলো মূলত প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে ঘটে যাওয়া ঘটনা (Extraordinary cosmic events)। এই ধরনের ঘটনাগুলো বিজ্ঞানের সাধারণ নিয়মের (General Laws of Nature) পরিপন্থী। যখন কোনো নবি বা রাসুলের মাধ্যমে এমন কোনো মহাজাগতিক ঘটনার সংবাদ আসে, তখন মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জের প্রধান জায়গাটি হলো এই 'অস্বাভাবিকতা'।
এই পর্যায়ে ওহীর সত্যতা যাচাইয়ের মাপকাঠি হলো 'রিওয়ায়াত' বা বর্ণনার বিশুদ্ধতা। যদি কোনো মহাজাগতিক ঘটনা বা কিয়ামত বিষয়ক সংবাদ নির্ভরযোগ্য সূত্রে (Authentic Chain of Narration) প্রমাণিত হয়, তবে মানুষের জন্য তা গ্রহণ করা এবং আল্লাহর অসীম ক্ষমতার প্রতি আত্মসমর্পণ (Taslim) করা অপরিহার্য। বিজ্ঞানের মাধ্যমে যা ব্যাখ্যা করা অসম্ভব, তা ওহীর মাধ্যমে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিয়ামত কেবল একটি ধ্বংসাত্মক ঘটনা নয়, বরং এটি মহাবিশ্বের একটি নতুন ও পূর্ণাঙ্গ পর্যায়ের সূচনা, যা কেবল ওহীর মাধ্যমেই জানা সম্ভব। [4] জ্ঞান সংরক্ষণ ও মহাজাগতিক সত্যের উত্তরাধিকার
ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত মহাজাগতিক জ্ঞান এবং কিয়ামত বিষয়ক তথ্যসমূহ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার বিষয় হলেও, এই জ্ঞান সংরক্ষণের জন্য ওহী ও হাদিসের ওপর নির্ভরতা অপরিহার্য। ইসলামের ইতিহাসে ওলামায়ে কেরাম বা আলেমগণ এই জ্ঞান সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বরং ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত মহাজাগতিক সত্য ও অতীন্দ্রিয় ঘটনাবলির সঠিক ব্যাখ্যা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করেছেন।
জ্ঞান যখন ওলামায়ে কেরাম বা আলেমদের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়, তখন তা কেবল তথ্য হিসেবে থাকে না, বরং তা একটি জীবন্ত ঐতিহ্য হিসেবে প্রবাহিত হয়। নবি সা.-এর উত্তরাধিকারী হিসেবে আলেমগণ ওহীর সেই জ্ঞানকে রক্ষা করেছেন যা মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও ধ্বংসের রহস্য উন্মোচন করে। বিজ্ঞানের পরিবর্তনশীলতার বিপরীতে ওহীর এই জ্ঞান চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয়।
রাসুলুল্লাহ সা.-এর হাদিস ও ওহীর জ্ঞান সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, জ্ঞান মানুষের অন্তর থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হবে না, বরং আলেমদের মৃত্যু ও জ্ঞানের বিলুপ্তির মাধ্যমে তা হারিয়ে যাবে। এই প্রেক্ষাপটে, মহাবিশ্ব ও কিয়ামত বিষয়ক ওহীর জ্ঞানকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে নির্ভরযোগ্য আলেম ও মুহাদ্দিসদের অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। তাঁদের মাধ্যমেই ওহীর সেই মহাজাগতিক সত্যগুলো মানুষের কাছে পৌঁছেছে যা বিজ্ঞান ও যুক্তির সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে মানুষের অন্তরে ঈমান ও বিস্ময় সৃষ্টি করে। [5] মহাবিশ্বের বিশালতা এবং কিয়ামতের মহিমা অনুধাবন করার জন্য মানুষের প্রয়োজন ওহীর আলোকবর্তিকা। বিজ্ঞান যেখানে কেবল দৃশ্যমান জগতের সীমানায় আবদ্ধ, ওহী সেখানে অসীম ও অতীন্দ্রিয় জগতের দ্বার উন্মোচন করে। এই দুইয়ের সমন্বয়ই মানুষকে মহাবিশ্বের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা প্রদান করে।