১১.৪ মাস সাইকোলজি (Mass Psychology) এবং ইনফো-ডেমিক (Infodemic): কীভাবে গুজব একটি রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করতে পারে
আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোনো রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা কেবল তার সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না, বরং নির্ভর করে সেই রাষ্ট্রের নাগরিকদের মনস্তাত্ত্বিক সংহতির ওপর। গণমানুষের মনস্তত্ত্ব বা 'Mass Psychology' হলো এমন একটি জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে ব্যক্তি সত্তা বিলীন হয়ে একটি সমষ্টিগত চেতনার জন্ম দেয়। যখন এই সমষ্টিগত চেতনা ভুল বা বিকৃত তথ্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়, তখন তা 'ইনফো-ডেমিক' (Infodemic) বা তথ্য-সংক্রামক মহামারীতে রূপান্তরিত হয়। এই মহামারী কোনো জৈবিক ভাইরাস নয়, বরং এটি তথ্যের এমন একটি অতিপ্রবাহ যা সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার সীমারেখাকে অস্পষ্ট করে ফেলে এবং একটি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে পচিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
ঐতিহাসিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তথ্যের অপব্যবহার এবং গুজবের মাধ্যমে জনমত পরিবর্তন ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রবণতা অত্যন্ত প্রাচীন। প্রাক-ইসলামি যুগেও গোত্রীয় দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য তথ্যের বিকৃতি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানের ডিজিটাল যুগে এই প্রক্রিয়াটি আরও দ্রুততর এবং বিধ্বংসী হয়েছে। একটি রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন গুজব বা 'Misinformation' একটি সামাজিক আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে, যা রাষ্ট্রের কাঠামোগত ভিত্তি ও সামাজিক সংহতিকে তছনছ করে দিতে পারে।
গণমানুষের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো ও সাংস্কৃতিক সংহতি (Psychological Structure of the Masses and Cultural Cohesion)
গণমানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে হলে প্রথমে তাদের সাংস্কৃতিক ও আবেগীয় সংহতি বুঝতে হবে। একটি সমাজ বা জাতি কেবল কতগুলো মানুষের সমষ্টি নয়, বরং এটি অভিন্ন অভ্যাস, ঐতিহ্য এবং আবেগের একটি জটিল সমন্বয়। সংস্কৃতির এই সমজাতীয়তা বা 'Homogeneity' গণমানুষকে একটি একক মনস্তাত্ত্বিক সত্তায় পরিণত করে। যখন একটি বিশাল জনগোষ্ঠী একই ধরণের আবেগ বা অনুভূতির দ্বারা চালিত হয়, তখন একটি ক্ষুদ্রতম উদ্দীপক বা গুজবও সমগ্র জনসমষ্টিকে একযোগে আন্দোলিত করতে পারে।
সংস্কৃতি ও মনস্তাত্ত্বিক সংহতির এই গভীর সম্পর্ক সম্পর্কে বলা হয়েছে:
উপরোক্ত উদ্ধৃতিটি নির্দেশ করে যে, সংস্কৃতি হলো একটি অবিভাজ্য 'ভর' বা 'كتلة', যা অভিন্ন অভ্যাস এবং সমজাতীয় আবেগের মাধ্যমে গঠিত হয়। এই 'عواطف متشابهة' বা সমজাতীয় আবেগগুলোই হলো সেই মাধ্যম, যার মাধ্যমে গুজব বা ইনফো-ডেমিক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যদি কোনো গুজব একটি জাতির ধর্মীয়, জাতিগত বা সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতাকে স্পর্শ করে, তবে সেই আবেগীয় সংহতিই গুজবের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। ফলে, একটি সুসংগঠিত সমাজ মুহূর্তের মধ্যে বিশৃঙ্খল জনসমষ্টিতে রূপান্তরিত হতে পারে, যা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য চরম হুমকি স্বরূপ।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, গণমানুষের এই সংহতি একদিকে যেমন রাষ্ট্রের শক্তির উৎস, অন্যদিকে এটি অত্যন্ত ভঙ্গুরও বটে। যখন কোনো বহিরাগত শক্তি বা অভ্যন্তরীণ অশুভ শক্তি এই 'সাংস্কৃতিক ভর' বা 'Cultural Mass'-এর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে চায়, তখন তারা মূলত মানুষের আবেগীয় সংযোগকে লক্ষ্যবস্তু করে। তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়ে যখন মানুষের মধ্যে ভীতি বা ঘৃণা ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন তাদের এই অভিন্ন আবেগগুলোই তাদের যুক্তিবোধকে অন্ধ করে দেয়, যা রাষ্ট্রীয় অস্থিতিশীলতার পথ প্রশস্ত করে।
নিপীড়িত মনস্তত্ত্ব ও তথ্যের অতি-সংবেদনশীলতা (The Psychology of the Oppressed and Information Hyper-sensitivity)
রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে জনমানুষের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক বা অর্থনৈতিক বৈষম্য বিদ্যমান থাকে, তখন তাদের মনস্তত্ত্ব একটি বিশেষ ধরণের সংবেদনশীলতা অর্জন করে। নিপীড়িত বা অবদমিত জনগোষ্ঠী (The Oppressed) সর্বদা চারপাশের পরিবেশ এবং ক্ষমতার পরিবর্তন সম্পর্কে অত্যন্ত সতর্ক ও অতি-সংবেদনশীল থাকে। এই অতি-সংবেদনশীলতা অনেক সময় তথ্যের ভুল ব্যাখ্যা বা গুজবের প্রতি তাদের প্রবণতাকে বাড়িয়ে দেয়।
সামাজিক অবক্ষয় ও নিপীড়িত মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণায় দেখা যায়:
এই বিশ্লেষণটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নিপীড়িত বা অবদমিত জনসমষ্টির মধ্যে একটি 'তদারকি করার প্রবণতা' বা 'Hyper-vigilance' দেখা যায়, যেখানে তারা প্রতিটি ছোটখাটো ঘটনা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। এই পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা যখন তথ্যের অভাব বা অস্পষ্টতার সম্মুখীন হয়, তখন তারা শূন্যস্থান পূরণের জন্য গুজব বা কাল্পনিক তত্ত্বের আশ্রয় নেয়। এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাটি ইনফো-ডেমিকের জন্য একটি উর্বর ভূমি তৈরি করে। যখন মানুষ মনে করে যে তাদের সাথে অন্যায় করা হচ্ছে বা তাদের অধিকার হরণ করা হচ্ছে, তখন একটি মিথ্যা সংবাদ বা গুজব তাদের মধ্যে দ্রুত ক্ষোভ ও বিদ্রোহের জন্ম দিতে পারে।
তদুপরি, দীর্ঘস্থায়ী নিপীড়ন মানুষের অস্তিত্বের অভিজ্ঞতায় এক ধরণের অস্থিরতা তৈরি করে। এই অস্থিরতা মানুষের অতীত ও বর্তমানের যন্ত্রণাকে বাড়িয়ে দেয় এবং তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে। যখন একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন এই 'তদারকি করার প্রবণতা' বা 'Surveillance mindset' গুজবকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে, একটি ছোট গুজবও সামাজিক অস্থিরতা বা দাঙ্গা সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট হয়ে দাঁড়ায়, কারণ জনসমষ্টির মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিটি ইতিমধ্যে অত্যন্ত নাজুক ও সংবেদনশীল অবস্থায় থাকে।
ইনফো-ডেমিক ও ঐতিহাসিক তথ্যের বিকৃতি: একটি বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি (Infodemic and the Distortion of Information)
ইনফো-ডেমিক বা তথ্য-সংক্রামক মহামারীর মূল কারণ হলো তথ্যের গুণগত মান হ্রাস এবং তথ্যের অতিপ্রবাহ। যখন তথ্যের উৎস অনির্ভরযোগ্য হয় এবং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তখন সত্য হারিয়ে যায়। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দেখলে বোঝা যায় যে, লিখিত দলিল বা নির্ভরযোগ্য উৎসের অনুপস্থিতিতে মৌখিক বর্ণনা বা 'Oral Traditions' কীভাবে তথ্যের বিকৃতি ঘটায়। প্রাক-ইসলামি যুগেও গোত্রীয় দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতার কারণে অনেক কাহিনী বা সংবাদ কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হতো।
ঐতিহাসিক তথ্যের এই অসংগতি ও বিকৃতি সম্পর্কে বলা হয়েছে:
এখানে 'الوضع والافتعال' বা 'কৃত্রিমভাবে তৈরি করা ও সাজানো' শব্দটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, গোত্রীয় বা ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে অনেক সংবাদ বা কাহিনী জেনেশুনে মিথ্যাভাবে রচয়িত হতো। আধুনিক ইনফো-ডেমিকের সাথে এর গভীর সাদৃশ্য রয়েছে। বর্তমান যুগেও রাজনৈতিক বা সামাজিক স্বার্থ হাসিলের জন্য 'Fake News' বা কৃত্রিমভাবে তৈরি করা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। যখন এই ধরণের বিকৃত তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়।
তথ্যের এই বিকৃতি কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এটি মানুষের স্মৃতির ওপরও প্রভাব ফেলে। ঐতিহাসিক তথ্যের অসংগতি ও স্মৃতির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বলা হয়েছে:
স্মৃতি বা 'Memory' দীর্ঘকাল ধরে তথ্যের বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে পারে না; বিস্মৃতি এবং সময়ের প্রভাবে তথ্যের প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়ে যায়। এই বিষয়টি আধুনিক ইনফো-ডেমিকের ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ডিজিটাল মাধ্যমে যখন কোনো তথ্য একবার ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা বারবার শেয়ার হওয়ার মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্কে একটি 'Pseudo-truth' বা 'ছদ্ম-সত্য' হিসেবে গেঁথে যায়। যদিও মূল তথ্যটি মিথ্যা ছিল, কিন্তু বারবার দেখার ফলে তা মানুষের কাছে সত্য বলে প্রতীয়মান হয়। এই প্রক্রিয়াটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দেয়, কারণ নাগরিকরা তখন বাস্তবতার পরিবর্তে একটি কাল্পনিক বা বিকৃত বাস্তবতায় বাস করতে শুরু করে।
গুজব ও রাষ্ট্রীয় অস্থিতিশীলতা: একটি ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ (Rumors and State Instability: A Geopolitical Analysis)
গুজব বা ইনফো-ডেমিক কেবল সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে না, এটি একটি শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। আধুনিক 'Hybrid Warfare' বা হাইব্রিড যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কৌশল হলো একটি দেশের অভ্যন্তরে তথ্যগত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। যখন কোনো রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না, তখন শত্রুপক্ষ বা অশুভ শক্তিগুলো গুজব ব্যবহার করে রাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে ফাটল ধরাতে পারে।
গুজব কীভাবে কাজ করে তা বুঝতে হলে এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। গুজব মূলত মানুষের ভয়, সন্দেহ এবং পূর্বসংস্কারকে (Prejudice) পুঁজি করে। যখন কোনো গুজব একটি নির্দিষ্ট জাতিগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ছড়ানো হয়, তখন তা সমাজে বিভাজন তৈরি করে। এই বিভাজন যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন তা দাঙ্গা, গৃহযুদ্ধ বা রাষ্ট্রীয় পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, প্রাক-ইসলামি যুগেও গোত্রীয় দ্বন্দ্বের কারণে অনেক কাহিনী বা সংবাদ কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হতো, যা সামাজিক সংহতিকে ধ্বংস করত [5] ।
আধুনিক প্রেক্ষাপটে, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো এই গুজবের দ্রুত বিস্তার ঘটানোর মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। একটি ভুল তথ্য বা 'Misinformation' কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এই দ্রুততা তথ্যের সত্যতা যাচাই করার সুযোগ কমিয়ে দেয়। যখন নাগরিকরা তথ্যের সত্যতা নিয়ে সংশয়ে থাকে, তখন তারা রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। রাষ্ট্রের প্রতি এই আস্থার সংকটই হলো অস্থিতিশীলতার মূল উৎস। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয় যখন তার নাগরিকরা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে পারে এবং রাষ্ট্রের আইনি ও সামাজিক কাঠামোর ওপর আস্থা রাখে। কিন্তু ইনফো-ডেমিক এই আস্থার ভিত্তিকেই ধূলিসাৎ করে দেয়।
পরিশেষে বলা যায়, মাস সাইকোলজি এবং ইনফো-ডেমিক হলো আধুনিক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে দুটি প্রধান চ্যালেঞ্জ। গুজব কেবল কিছু মিথ্যা কথা নয়, বরং এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক মারণাস্ত্র যা মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি এবং স্মৃতির দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করতে পারে। তাই একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি নয়, বরং তথ্যের সত্যতা নিশ্চিতকরণ এবং নাগরিকদের মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষা প্রদান করা অপরিহার্য। তথ্যের এই যুদ্ধক্ষেত্রে সচেতনতা এবং সঠিক তথ্যের প্রবাহই হতে পারে একটি রাষ্ট্রের প্রধান প্রতিরক্ষা কবচ।