হুদায়বিয়ার সন্ধি ভঙ্গ করার মাধ্যমে কুরাইশদের যে কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল, তা মক্কার অস্তিত্বকে এক চরম সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। বনু বকর ও বনু খুজাআহ-এর মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে কুরাইশদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা ছিল আন্তর্জাতিক চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই বিশ্বাসঘাতকতার ফলে মক্কার রাজনৈতিক আধিপত্য ধসে পড়ার উপক্রম হলে, কুরাইশদের প্রধান নেতা আবু সুফিয়ান বিন হারব মদিনার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কেন্দ্রবিন্দুতে একটি অত্যন্ত জটিল ও মরিয়া 'লবিং' (Lobbying) বা মধ্যস্থতা প্রচেষ্টায় লিপ্ত হন। তাঁর এই মিশন ছিল মূলত হুদায়বিয়ার সন্ধির মেয়াদ বৃদ্ধি করা এবং কুরাইশদের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ হ্রাস করার একটি শেষ চেষ্টা।
আবু সুফিয়ানের এই কূটনৈতিক অভিযানটি কেবল একটি ব্যক্তিগত অনুরোধ ছিল না, বরং এটি ছিল মক্কার রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, মদিনার সামরিক শক্তি এবং মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের সামনে কুরাইশদের প্রচলিত কূটনীতি আর কার্যকর হচ্ছে না। ফলে তিনি মদিনার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বদের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা.-এর সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের একটি বহুমুখী প্রচেষ্টা শুরু করেন।
মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: মদিনায় আবু সুফিয়ানের অবস্থান
মদিনায় প্রবেশের সাথে সাথেই আবু সুফিয়ান এক অভূতপূর্ব মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সম্মুখীন হন। হুদায়বিয়ার সন্ধি ভঙ্গের ফলে মদিনার জনমানসে কুরাইশদের প্রতি যে তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভ সঞ্চিত হয়েছিল, তা আবু সুফিয়ানের জন্য এক বিশাল প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। মদিনার প্রতিটি প্রান্তে কুরাইশদের বিশ্বাসঘাতকতার সংবাদ ছড়িয়ে পড়ায়, আবু সুফিয়ান নিজেকে এক জনবিচ্ছিন্ন ও অবাঞ্ছিত ব্যক্তি হিসেবে আবিষ্কার করেন। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, মদিনার পরিবেশে কুরাইশদের বিরুদ্ধে এমন এক তীব্র রোষ বিদ্যমান ছিল যে, আবু সুফিয়ানকে কোনো মানুষই হাসিমুখে গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল না।[1]
এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতার চূড়ান্ত ও সবচেয়ে বেদনাদায়ক বহিঃপ্রকাশ ঘটে যখন তিনি তাঁর কন্যা, উম্মে হাবিবা (রা.)-এর নিকট পৌঁছান। উম্মে হাবিবা (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ সা.-এর অন্যতম পবিত্র পত্নী বা উম্মুল মুমিনীন। আবু সুফিয়ান যখন তাঁর কন্যার ঘরে প্রবেশ করেন, তখন তিনি আশা করেছিলেন পারিবারিক সম্পর্কের খাতিরে কিছুটা উষ্ণতা ও সম্মান পাবেন। কিন্তু সেখানে তিনি যে কঠোরতা ও আদর্শিক দৃঢ়তা দেখতে পান, তা তাঁর রাজনৈতিক অহংকারকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। তিনি যখন রাসুলুল্লাহ সা.-এর বিছানায় বসার চেষ্টা করেন, তখন উম্মে হাবিবা (রা.) অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তা প্রতিহত করেন।
আবু সুফিয়ান অত্যন্ত ব্যথিত ও মর্মাহত হয়ে তাঁর কন্যাকে বলেন:
উম্মে হাবিবা (রা.)-এর উত্তর ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও আদর্শিক: তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, এটি রাসুলুল্লাহ সা.-এর বিছানা এবং আবু সুফিয়ান একজন মুশরিক ও অপবিত্র ব্যক্তি হিসেবে সেখানে বসতে পারেন না। এই ঘটনাটি আবু সুফিয়ানের জন্য কেবল একটি পারিবারিক বিবাদ ছিল না, বরং এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরাজয়ের একটি প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ। তাঁর নিজের কন্যা কর্তৃক 'মুশরিক' ও 'নাজিস' (অপবিত্র) হিসেবে সম্বোধিত হওয়া তাঁর মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে বিপর্যস্ত করে দেয়, যা তাঁর পরবর্তী কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও বেশি মরিয়া ও অস্থির করে তোলে।[4]
রাসুলুল্লাহ সা.-এর সাথে সরাসরি আলোচনার ব্যর্থতা ও কূটনৈতিক কৌশল
পরিবার ও সমাজের কাছ থেকে চরম প্রত্যাখ্যান পাওয়ার পর, আবু সুফিয়ান তাঁর মূল লক্ষ্য অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সা.-এর সাথে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে সন্ধির মেয়াদ বৃদ্ধির চেষ্টা করেন। এই পর্যায়ে তিনি একটি অত্যন্ত চতুর ও ধূর্ত কূটনৈতিক কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি দাবি করেন যে, তিনি হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় উপস্থিত ছিলেন না, তাই এই সন্ধি তাঁর ওপর কার্যকর নয়। অর্থাৎ, তিনি একটি আইনি ফাঁকফোকর (Legal Loophole) ব্যবহার করে সন্ধির মেয়াদ বাড়ানোর একটি অজুহাত তৈরি করার চেষ্টা করেন।
আবু সুফিয়ান রাসুলুল্লাহ সা.-এর সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে দাবি করেন:
তবে রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর এই কূটনৈতিক চাল বা 'Diplomatic Maneuver' অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে রুখে দেন। তিনি আবু সুফিয়ানের এই মিথ্যাচার বা বিভ্রান্তিকর দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করে বরং অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট উত্তরের মাধ্যমে বিষয়টিকে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করে দেন। রাসুলুল্লাহ সা. তাঁকে বলেন যে, মদিনার পক্ষ থেকে সন্ধির কোনো পরিবর্তন বা মেয়াদ বৃদ্ধির কোনো অবকাশ নেই।
রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই সংক্ষিপ্ত অথচ অটল বক্তব্য আবু সুফিয়ানকে সম্পূর্ণভাবে দিশেহারা করে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন যে, সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে কুরাইশদের জন্য কোনো রাজনৈতিক ছাড় বা 'Concession' পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই 'Strategic Communication' বা কৌশলগত যোগাযোগ আবু সুফিয়ানের সমস্ত কূটকৌশলকে অকার্যকর করে দেয় এবং তাঁকে মদিনার অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে মধ্যস্থতা বা লবিং করার জন্য বাধ্য করে।[7]
বহুমাত্রিক লবিং কৌশল: আত্মীয়তা ও প্রভাবশালীদের ব্যবহার
সরাসরি আলোচনার ব্যর্থতা এবং সামাজিক অবমাননার পর, আবু সুফিয়ান একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে তাঁর কৌশল পরিবর্তন করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, সরাসরি রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে না গিয়ে মদিনার প্রভাবশালী সাহাবিদের মাধ্যমে 'Indirect Lobbying' বা পরোক্ষ মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করা অধিকতর কার্যকর হতে পারে। তিনি মদিনার শীর্ষস্থানীয় সাহাবিদের কাছে গিয়ে তাঁদের রাজনৈতিক ও পারিবারিক প্রভাব ব্যবহার করে রাসুলুল্লাহ সা.-এর মন পরিবর্তনের চেষ্টা করেন।
প্রথমত, তিনি মদিনার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব আবু বকর (রা.)-এর কাছে যান। আবু সুফিয়ান আশা করেছিলেন যে, মক্কার কুরাইশদের সাথে তাঁর দীর্ঘদিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে আবু বকর (রা.) তাঁর পক্ষে সুপারিশ করবেন। কিন্তু কুরাইশদের দ্বারা সংঘটিত বিশ্বাসঘাতকতার ভয়াবহতা সম্পর্কে অবগত থাকায় আবু বকর (রা.) অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।[8]
দ্বিতীয়ত, আবু সুফিয়ান তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্কের রাজনীতি (Politics of Kinship) ব্যবহার করার চেষ্টা করেন। তিনি উসমান বিন আফফান (রা.)-এর কাছে যান, কারণ উসমান (রা.) ছিলেন বনু উমাইয়া গোত্রের এবং আবু সুফিয়ানের আত্মীয়। তিনি উসমান (রা.)-কে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, মদিনার এই সন্ধি বজায় রাখা এবং কুরাইশদের প্রতি সদয় হওয়া উচিত। তিনি বলেন:
কিন্তু উসমান (রা.) অত্যন্ত বিনয়ের সাথে কিন্তু অটলভাবে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি আবু সুফিয়ানের এই লবিং প্রচেষ্টাকে সফল হতে দেননি, যা প্রমাণ করে যে মদিনার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আদর্শ তখন ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে ছিল।[10]
তৃতীয়ত, আবু সুফিয়ান তাঁর শেষ চেষ্টা হিসেবে আলি (রা.) এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর শরণাপন্ন হন। তিনি আলি (রা.)-এর নিকট তাঁর আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে সুপারিশ করতে বলেন। আলি (রা.) তাঁকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, রাসুলুল্লাহ সা. এমন একটি বিষয়ে অটল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যেখানে কোনো মধ্যস্থতা সম্ভব নয়। তিনি বলেন:
অবশেষে, আবু সুফিয়ান যখন ফাতিমা (রা.)-এর কাছে গিয়ে তাঁর পিতার কাছে সুপারিশ করার অনুরোধ করেন, তখন ফাতিমা (রা.)-এর উত্তর ছিল অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও আদর্শিক। তিনি তাঁর পিতার সিদ্ধান্তের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করে বলেন যে, এই বিষয়টি সম্পূর্ণ রাসুলুল্লাহ সা.-এর এখতিয়ারে এবং তিনি এতে হস্তক্ষেপ করতে পারেন না।[12] আবু সুফিয়ানের এই বহুমুখী লবিং প্রচেষ্টা—তা রাজনৈতিক হোক বা পারিবারিক—মদিনার দৃঢ় আদর্শিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর সামনে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়। তাঁর এই ব্যর্থতা মক্কার জন্য এক অনিবার্য পতনের পূর্বাভাস প্রদান করেছিল।[13]