খণ্ড 95
ফন্ট:100%
থিম:

১১.২ নিউ-অ্যাথেইজম (New Atheism) এবং সাইন্টিজম (Scientism): বিজ্ঞানবাদ ও নাস্তিকতার লজিক্যাল ফ্যালাসি (Logical Fallacies) খণ্ডন

একবিংশ শতাব্দীর বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে 'নিউ-অ্যাথেইজম' বা নব্য-নাস্তিকতা এবং 'সাইন্টিজম' বা বিজ্ঞানবাদ একটি প্রভাবশালী প্রবণতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই মতাদর্শের মূল ভিত্তি হলো বিজ্ঞানকে কেবল একটি অনুসন্ধান পদ্ধতি হিসেবে নয়, বরং সত্য নির্ধারণের একমাত্র এবং চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। এই দৃষ্টিভঙ্গির ফলে তারা এমন এক যৌক্তিক ভ্রান্তির (Logical Fallacy) জন্ম দিয়েছে, যেখানে তারা দাবি করে যে, যা কিছু পরীক্ষাগারে প্রমাণ করা সম্ভব নয় বা যা দৃশ্যমান প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে, তা অস্তিত্বহীন অথবা অলীক। এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি কেবল ধর্মতত্ত্বকেই অস্বীকার করে না, বরং দর্শনের মৌলিক প্রশ্নাবলি এবং মানব অস্তিত্বের আধ্যাত্মিক মাত্রাকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে।

সাইন্টিজমের এই চরমপন্থা মূলত একটি 'ক্যাটেগরিকাল এরর' (Categorical Error), যেখানে তারা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের (Natural Science) পদ্ধতিকে অধিবিদ্যক (Metaphysics) এবং নৈতিকতার (Ethics) ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে চায়। নব্য-নাস্তিকরা দাবি করে যে, মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনার পেছনে একটি অনিবার্য প্রাকৃতিক কারণ রয়েছে এবং এই কারণের বাইরে কোনো ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ সম্ভব নয়। তবে এই দাবিটিই তাদের সবচেয়ে বড় যৌক্তিক দুর্বলতা। তারা তথাকথিত 'প্রাকৃতিক নিয়ম'কে একটি অপরিবর্তনীয় এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা হিসেবে কল্পনা করে, যা প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞানের নিজস্ব সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করার শামিল।

ইসলামিক জ্ঞানতত্ত্ব এবং বিশেষ করে ইমাম গাজালির রহ. চিন্তাধারার আলোকে এই বিজ্ঞানবাদের খণ্ডন করা সম্ভব। বিজ্ঞানবাদীরা মনে করে যে, কারণ এবং কার্যের (Cause and Effect) মধ্যে একটি অনিবার্য সম্পর্ক বিদ্যমান। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, এই সম্পর্কটি কেবল একটি পর্যবেক্ষণমূলক ধারাবাহিকতা মাত্র, কোনো অনিবার্য বাধ্যবাধকতা নয়। এই দার্শনিক পার্থক্যটিই নিউ-অ্যাথেইজমের ভিত্তি নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, কারণ তারা তাদের সমস্ত যুক্তি এই তথাকথিত 'অনিবার্যতার' ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলেছে।

কার্যকারণতত্ত্বের ভ্রান্তি এবং 'কনস্ট্যান্ট কনজাংশন' (Constant Conjunction)

নিউ-অ্যাথেইজমের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হলো কার্যকারণতত্ত্বের (Causality) একপাক্ষিক ব্যাখ্যা। তারা মনে করে, আগুন পোড়ায় কারণ পোড়ানো আগুনের একটি সহজাত এবং অনিবার্য বৈশিষ্ট্য। কিন্তু গভীর গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ এবং ইসলামিক দর্শনের দৃষ্টিতে, কারণ এবং কার্যের মধ্যে কোনো সহজাত বা অনিবার্য সম্পর্ক নেই; বরং এটি একটি 'একত্রিত উপস্থিতি' বা 'কনস্ট্যান্ট কনজাংশন' (Constant Conjunction)। অর্থাৎ, আমরা বারবার দেখেছি যে আগুনের সংস্পর্শে বস্তু পুড়েছে, তাই আমরা ধরে নিয়েছি আগুনই পোড়ানোর কারণ। কিন্তু এই পোড়ানোর ক্ষমতা আগুনের নিজস্ব নয়, বরং এটি আল্লাহর ইচ্ছায় এবং তাঁর নির্ধারিত নিয়মে ঘটে।

এই বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, আধুনিক বিজ্ঞানীদের গবেষণার চূড়ান্ত পর্যায়েও এই সত্যটি প্রকাশিত হয়েছে। কারণ এবং কার্যের সম্পর্কটি কেবল একটি নিয়মিত পুনরাবৃত্তি মাত্র, যা থেকে পরবর্তীতে নিয়ম বা আইন (Law) তৈরি করা হয়েছে। আরবি ইবারতে এই বিষয়টি এভাবে এসেছে:


ولقد علم كل باحث ومثقّف اليوم بأن أحدث ما انتهت إليه مدارك العلماء في هذا الصدد، هو أن العلاقة التي نراها بين الأسباب ومسبّباتها، ليست إلا علاقة اقتران مطرد، اكتسبت تحليلاً، ثم تعليلاً، ثم استنبط منها القانون الذي هو تابع لظهور تلك العلاقة، وليس العكس!

[1]

উপরোক্ত ইবারতটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বিজ্ঞানবাদীরা যে 'প্রাকৃতিক নিয়ম' বা 'ল' (Law) এর কথা বলে, তা আসলে ঘটনার অনুগামী, ঘটনার স্রষ্টা নয়। অর্থাৎ, আগে ঘটনাটি ঘটে, তারপর বিজ্ঞানীরা সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তির ওপর ভিত্তি করে একটি নিয়ম তৈরি করেন। সুতরাং, নিয়মটি ঘটনার تابع (অনুসারী), নিয়ন্ত্রণকারী নয়। যখন নব্য-নাস্তিকরা দাবি করে যে, প্রাকৃতিক নিয়মের কারণে মুজিজা বা অলৌকিক ঘটনা অসম্ভব, তখন তারা আসলে একটি লজিক্যাল ফ্যালাসি বা যৌক্তিক ভ্রান্তিতে লিপ্ত হয়। তারা একটি বর্ণনামূলক নিয়মকে (Descriptive Law) বাধ্যতামূলক নিয়মে (Prescriptive Law) রূপান্তর করার চেষ্টা করে।

ইমাম গাজালির রহ. এই সত্যটি বহু শতাব্দী আগে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যে, কারণ এবং কার্যের মধ্যবর্তী সম্পর্কটি কেবল একটি সংযোগ মাত্র, কোনো অনিবার্য বাধ্যবাধকতা নয়। বিজ্ঞানবাদীরা এই সত্যটি এড়িয়ে গিয়ে বিজ্ঞানের নাম করে এক ধরণের 'প্রকৃতি-পূজা' বা 'প্রকৃতি-নির্ধারণবাদ' (Determinism) প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অথচ প্রকৃত বিজ্ঞান বলে যে, আমরা কেবল প্যাটার্ন পর্যবেক্ষণ করি, আমরা সেই প্যাটার্নের চূড়ান্ত উৎস বা 'সার' (Essence) নিয়ন্ত্রণ করি না। এই উপলব্ধিটিই প্রমাণ করে যে, মহাবিশ্বের প্রতিটি অণু-পরমাণু আল্লাহর ইচ্ছাধীন এবং তিনি চাইলে যেকোনো মুহূর্তে এই তথাকথিত 'নিয়ম' পরিবর্তন করতে পারেন।

সাইন্টিজম এবং মুজিজার যৌক্তিক সম্ভাবনা

সাইন্টিজমের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর 'মেথডোলজিক্যাল ন্যাচারালিজম' (Methodological Naturalism)। তারা মনে করে, যা কিছু পর্যবেক্ষণযোগ্য এবং পরিমাপযোগ্য, কেবল তা-ই সত্য। এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তারা মুজিজা বা অলৌকিক ঘটনাগুলোকে 'অসম্ভব' বলে উড়িয়ে দেয়। কিন্তু যৌক্তিকভাবে বিচার করলে, যদি মহাবিশ্বের নিয়মগুলো আল্লাহর সৃষ্টি হয়, তবে সেই নিয়মগুলোর স্রষ্টা অবশ্যই সেই নিয়মগুলোর ঊর্ধ্বে। সুতরাং, স্রষ্টার পক্ষে তাঁর তৈরি নিয়মকে সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা বা পরিবর্তন করা সম্পূর্ণ সম্ভব।

নব্য-নাস্তিকদের এই ভ্রান্তির বিপরীতে যুক্তি হলো, মুজিজা কোনো বৈজ্ঞানিক অসম্ভবতা নয়, বরং এটি একটি 'উচ্চতর বিজ্ঞানের' বহিঃপ্রকাশ, যা সাধারণ মানুষের উপলব্ধির বাইরে। যখন কোনো মুজিজা ঘটে, তখন তা বিজ্ঞানের পরিপন্থী হয় না, বরং তা বিজ্ঞানের জন্য একটি নতুন গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আরবি ইবারতে এই যৌক্তিক বিশ্লেষণটি এভাবে উপস্থাপিত হয়েছে:


فإن رحت تسأل القانون العلميّ عن رأيه في خارقة أو معجزة إلهيّة، قال لك بلسان الحال الذي يفقهه كل عالم بل كل متبصر بثقافة العصر: ليست الخوارق والمعجزات من موضوعات بحثي واختصاصي؛ فلا حكم لي عليها بشيء، ولكن إذا وقعت خارقة من ذلك أمامي فإنها تصبح في تلك الحال موضوعاً جاهزاً للنظر والتحليل، ثم الشرح والتعليل، ثم تغطى تلك الخارقة بقانونها التابع لها!

[2]

এই বিশ্লেষণটি অত্যন্ত গভীর। এখানে বলা হয়েছে যে, বৈজ্ঞানিক নিয়মগুলো মুজিজাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা রাখে না, কারণ মুজিজা তাদের গবেষণার আওতার বাইরে। তবে যদি কোনো মুজিজা সামনে ঘটে, তবে বিজ্ঞান তা বিশ্লেষণ করে তার জন্য একটি নতুন নিয়ম তৈরি করবে। অর্থাৎ, মুজিজা বিজ্ঞানের বিরোধী নয়, বরং মুজিজা বিজ্ঞানের সীমানাকে প্রসারিত করে। নব্য-নাস্তিকরা যখন মুজিজাকে অস্বীকার করে, তারা আসলে বিজ্ঞানের নাম করে নিজেদের অজ্ঞতাকে ঢেকে রাখার চেষ্টা করে।

রাসুল সা. এর জীবনের অসংখ্য মুজিজা কেবল বিশ্বাসের বিষয় নয়, বরং তা ছিল সত্যের প্রমাণ। বিজ্ঞানবাদীরা যখন এই মুজিজাগুলোকে অস্বীকার করে, তারা আসলে ইতিহাসের একটি বিশাল অংশ এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণাদিকে (Authentic Evidence) অগ্রাহ্য করে। তারা মনে করে যে, কারণ-ফলাফলের যে চক্র তারা দেখেছে, তা চিরকাল অপরিবর্তনীয়। অথচ মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব (Cosmology) বলে যে, বিগ ব্যাং-এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছিল, যা নিজেই একটি চরম অলৌকিক ঘটনা। সুতরাং, যে স্রষ্টা শূন্য থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করতে পারেন, তাঁর জন্য আগুনের শীতলতা বা সমুদ্রের বিভক্ত করা কোনো অসম্ভব বিষয় নয়।

বিশ্বাস এবং যুক্তির কৃত্রিম দ্বন্দ্বে নব্য-নাস্তিকতার প্রতারণা

নিউ-অ্যাথেইজমের একটি প্রধান কৌশল হলো 'ফলস ডাইকোটমি' (False Dichotomy) বা মিথ্যা দ্বিমুখী বিভাজন তৈরি করা। তারা মানবজাতিকে এই বলে প্রলুব্ধ করে যে, হয় আপনাকে ঐশ্বরিক নির্দেশনাবলি (Divine Guidance) মেনে চলতে হবে এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও মানবিয় উদ্ভাবনকে ত্যাগ করতে হবে, অথবা আপনাকে বিজ্ঞানের অগ্রগতির পথে হাঁটতে হবে এবং ধর্মকে পরিত্যাগ করতে হবে। এই ধরণের উপস্থাপনা একটি অত্যন্ত নীচ এবং প্রতারণামূলক কৌশল। কারণ, প্রকৃত ইসলাম কখনোই বিজ্ঞান বা মানবিয় সৃজনশীলতার বিরোধী নয়; বরং ইসলামই সেই সৃজনশীলতার প্রকৃত উৎস এবং পথপ্রদর্শক।

এই প্রতারণামূলক মানসিকতাকে আরবি ইবারতে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে:


ولنعرف أن هناك عصابة من المضلّلين الخادعين أعداء البشرية، يضعون لها المنهج الإلهي في كفة، والإبداع الإنساني في عالم المادة في الكفة الأخرى، ثم يقولون لها: اختاري! إما المنهج الإلهي في الحياة والتخلي عن كل ما أبدعته يد الإنسان في عالم المادة، وإما الأخذ بثمار المعرفة الإنسانيّة والتخلي عن منهج الله! وهذا خداع لئيم خبيث!

[3]

এই উদ্ধৃতিটি স্পষ্ট করে যে, নব্য-নাস্তিকরা একটি কৃত্রিম দেয়াল তৈরি করতে চায়। তারা বোঝাতে চায় যে, ধর্ম মানেই অন্ধবিশ্বাস এবং বিজ্ঞান মানেই প্রগতি। অথচ বাস্তব সত্য হলো, ঐশ্বরিক পথই মানুষকে প্রকৃত সৃজনশীলতার দিকে পরিচালিত করে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে পৃথিবীতে খলিফা হিসেবে পাঠিয়েছেন এবং তাকে অসীম সম্ভাবনা ও শক্তি দান করেছেন। এই শক্তি এবং বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনগুলো আসলে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত, যা ব্যবহার করে মানুষকে তাঁর ইবাদত এবং সৃষ্টির সেবায় নিয়োজিত হতে হবে। সুতরাং, বিজ্ঞান এবং ঈমানের মধ্যে কোনো সংঘাত নেই; বরং বিজ্ঞান হলো স্রষ্টার সৃষ্টিজগতকে জানার একটি মাধ্যম মাত্র।

নব্য-নাস্তিকদের এই প্রোপাগান্ডার উদ্দেশ্য হলো মানুষকে আধ্যাত্মিক শূন্যতার দিকে ঠেলে দেওয়া। তারা যখন মানুষকে বলে যে, কেবল বস্তুগত জগতই সত্য, তখন মানুষ তার জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের কথা ভুলে যায়। এই বস্তুবাদ (Materialism) মানুষকে সাময়িকভাবে প্রগতির মোহ দেখায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি মানসিক অবসাদ এবং নৈতিক অবক্ষয়ের জন্ম দেয়। ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে, বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তখন তা ইবাদতে পরিণত হয়। সুতরাং, বিজ্ঞানবাদীদের এই বিভাজনমূলক তত্ত্বটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এটি কেবল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ফাঁদ মাত্র।

সীরাত গবেষণায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এবং নব্য-নাস্তিকতার পদ্ধতিগত ত্রুটি

নিউ-অ্যাথেইজম কেবল দর্শনে নয়, বরং ইতিহাসের গবেষণায়ও এক ধরণের 'সন্দেহবাদ' (Skepticism) ছড়িয়ে দিয়েছে। তারা দাবি করে যে, প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থ বা সীরাতের বর্ণনাগুলো পরবর্তী যুগের মানুষের দ্বারা পরিবর্তিত বা মনগড়া। তারা তথাকথিত 'আধুনিক ঐতিহাসিক পদ্ধতি'র দোহাই দিয়ে নির্ভরযোগ্য হাদিস এবং সীরাতের বর্ণনাগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু তাদের এই পদ্ধতিটি নিরপেক্ষ নয়, বরং এটি একটি পূর্বনির্ধারিত নাস্তিক্যবাদী এজেন্ডার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

প্রকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (Sound Scientific Method) হলো সেই পদ্ধতি, যা প্রমাণের ভিত্তিতে সত্যকে গ্রহণ করে এবং প্রমাণের অভাবে মিথ্যাকে বর্জন করে। সীরাত গবেষণার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিটি অত্যন্ত কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। রাসুল সা. এর সীরাত পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সীরাত, কারণ এটি অত্যন্ত নিখুঁত একটি সনদ (Chain of Narrators) এবং যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এসেছে। আরবি ইবারতে এই পদ্ধতিগত শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা হয়েছে:


نعم، لا بد أن يشترط كل إنسان عاقل يحترم العقل والحقيقة، لقبول أي خبر، سواء تضمن أمراً خارقاً أو مألوفاً، شرطاً واحداً، وهو أن يصل الخبر إليه عن طريق علمي سليم ينهض على القواعد التي عرفناها، وأن سيرة الرسول صلى الله عليه وسلم أصح سيرة لتاريخ نبي مرسل

[4]

এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, যেকোনো সংবাদ—তা অলৌকিক হোক বা সাধারণ—গ্রহণ করার জন্য একটি 'সঠিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি' (علمي سليم) প্রয়োজন। সীরাত শাস্ত্রের মুহাদ্দিসগণ এই পদ্ধতিটি সর্বোচ্চ স্তরে প্রয়োগ করেছেন। তারা কেবল সেই বর্ণনাগুলো গ্রহণ করেছেন যা বিশুদ্ধ এবং নির্ভরযোগ্য। অন্যদিকে, নব্য-নাস্তিকরা যখন সীরাতকে আক্রমণ করে, তারা আসলে এই কঠোর যাচাইকরণ পদ্ধতিটিকে অস্বীকার করে। তারা কেবল তাদের নিজস্ব মনগড়া সন্দেহবাদকে 'বিজ্ঞান' হিসেবে উপস্থাপন করে।

সীরাত গবেষণার সঠিক পদ্ধতিটি হলো কুরআন এবং সহিহ হাদিসের আলোকে ঘটনাগুলোকে বিশ্লেষণ করা। নব্য-নাস্তিকরা কুরআনকে কেবল একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ হিসেবে দেখে, অথচ কুরআন হলো সত্যের চূড়ান্ত মানদণ্ড। যখন আমরা কুরআনের আলোকে সীরাতকে দেখি, তখন আমরা বুঝতে পারি যে, রাসুল সা. এর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল ঐশ্বরিক পরিকল্পনার অংশ। বিজ্ঞানবাদীদের পদ্ধতিগত ত্রুটি হলো তারা কেবল বাহ্যিক তথ্যের ওপর নির্ভর করে এবং তথ্যের অন্তরালে থাকা ঐশ্বরিক হিকমত বা প্রজ্ঞাকে অস্বীকার করে। ফলে তাদের গবেষণায় সত্যের পরিবর্তে কেবল সংশয় এবং বিভ্রান্তি প্রতিফলিত হয়।

পরিশেষে, নিউ-অ্যাথেইজম এবং সাইন্টিজম কোনো প্রকৃত বিজ্ঞান নয়, বরং এটি বিজ্ঞানের পোশাক পরিহিত একটি নতুন ধরণের অন্ধবিশ্বাস। তারা প্রমাণ করতে চায় যে, মহাবিশ্ব কোনো স্রষ্টা ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে, যা গাণিতিক এবং যৌক্তিকভাবে অসম্ভব। মহাবিশ্বের এই নিখুঁত ভারসাম্য, জটিল নকশা এবং কার্যকারিতা প্রমাণ করে যে, এর পেছনে একজন মহাপরাক্রমশালী এবং মহাজ্ঞানী স্রষ্টা রয়েছেন। বিজ্ঞানবাদীদের লজিক্যাল ফ্যালাসিগুলো খণ্ডন করার মাধ্যমেই আমরা এই যুগের বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারি এবং ঈমানের সাথে বিজ্ঞানের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটাতে পারি।

""
১১.২ নিউ-অ্যাথেইজম (New Atheism) এবং সাইন্টিজম (Scientism): বিজ্ঞানবাদ ও নাস্তিকতার লজিক্যাল ফ্যালাসি (Logical Fallacies) খণ্ডন
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১১.২ নিউ-অ্যাথেইজম (New Atheism) কুইজ

1 / 5

নিউ-অ্যাথেইজম বা নব্য-নাস্তিক্যবাদের প্রধান হাতিয়ার কোনটি?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...