খণ্ড 9
ফন্ট:100%
থিম:

অধ্যায় ২: জাহেলি সমাজের সাথে কগনিটিভ ডিসোন্যান্স (Cognitive Dissonance with Jahili Society)

অধ্যায় ২: জাহেলি সমাজের সাথে কগনিটিভ ডিসোন্যান্স (Cognitive Dissonance with Jahili Society)

মানব ইতিহাসের প্রাক-ইসলামি যুগ বা 'জাহেলি যুগ' কেবল একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়কাল ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুসংগঠিত সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যবস্থার বহিঃপ্রকাশ। মক্কার তৎকালীন আর্থ-সামাজিক কাঠামো এবং কুরাইশ বংশের আধিপত্যবাদী শাসনব্যবস্থা যখন চরম নৈতিক অবক্ষয় ও পৌত্তলিকতার শিখরে আরোহণ করেছিল, তখন সেই পরিবেশে একজন মহৎ ও সত্যনিষ্ঠ সত্তার অস্তিত্বের সাথে সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত বা 'কগনিটিভ ডিসোন্যান্স' (Cognitive Dissonance) তৈরি হওয়া ছিল অনিবার্য। কগনিটিভ ডিসোন্যান্স বলতে এমন এক মানসিক অবস্থাকে বোঝায়, যেখানে একজন ব্যক্তির অন্তরের মৌলিক বিশ্বাস বা 'ফিতরাহ' (Fitrah) এবং তার চারপাশের বাহ্যিক বাস্তবতার মধ্যে এক চরম বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। নবি সা.-এর ক্ষেত্রে এই বৈপরীত্য ছিল অস্তিত্ববাদী এবং বুদ্ধিবৃত্তিক।

মক্কার সমাজব্যবস্থা ছিল মূলত বংশীয় শ্রেষ্ঠত্ব এবং উপজাতীয় অহংকারের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। সেখানে সত্যের চেয়ে বংশমর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের চেয়ে ক্ষমতার দাপট ছিল মুখ্য। এই প্রেক্ষাপটে, যখন নবি সা.-এর অন্তরে সত্যের অন্বেষণ এবং একত্ববাদের (Tawhid) প্রতি সহজাত টান অনুভূত হতে শুরু করল, তখন মক্কার প্রচলিত মূর্তিপূজা ও সামাজিক অবিচার তাঁর সত্তার সাথে এক গভীর সংঘাত সৃষ্টি করল। এই সংঘাত কেবল বাহ্যিক ছিল না, বরং এটি ছিল একটি অভ্যন্তরীণ বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই, যা তাঁকে তৎকালীন জাহেলি রীতিনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।

১. ফিট্রাহ ও জাহেলি রীতিনীতির মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত

মানুষের অন্তরে আল্লাহ তাআলা এক সহজাত সত্যের বীজ বপন করে দিয়েছেন, যাকে ইসলামি পরিভাষায় 'ফিতরাহ' বলা হয়। জাহেলি সমাজের চরম পৌত্তলিকতা এবং অনৈতিকতা এই ফিতরাহ বা সহজাত প্রবৃত্তির সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। নবি সা.-এর মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর গভীরে যে সত্যের আলো ছিল, তা মক্কার অন্ধকারাচ্ছন্ন রীতিনীতির সাথে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছিল। এই সংঘাতটি ছিল মূলত অস্তিত্বের মৌলিক সত্য এবং সামাজিক প্রথার মধ্যকার একটি দ্বান্দ্বিক লড়াই।

কুরআনিক নির্দেশনায় এবং সত্যের সন্ধানে থাকা মানুষের অন্তরাত্মার যে অবস্থা, তা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। সত্যের সন্ধানকারী ব্যক্তি যখন মহাবিশ্বের নিদর্শনাবলি এবং নিজের অন্তরের প্রশান্তি অনুসন্ধান করে, তখন সে এক পরম সত্যের মুখোমুখি হয়। এই সত্যটি মানুষের অন্তরে এবং মহাবিশ্বের দিগন্তে বিদ্যমান। যেমনটি বলা হয়েছে:

هدی بآياته في النفس والآفاق [1]
অর্থাৎ, আল্লাহ তাঁর নিদর্শনাবলি দ্বারা মানুষের অন্তরে (নফস) এবং দিগন্তের (আফাক) মাঝে পথ প্রদর্শন করেছেন। নবি সা.-এর ক্ষেত্রে এই 'নফস' বা অন্তরের দিকটি ছিল অত্যন্ত প্রখর। তাঁর অন্তরের এই আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রজ্ঞা মক্কার তৎকালীন অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের সাথে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

এই মনস্তাত্ত্বিক ডিসোন্যান্স বা বৈপরীত্যের কারণে নবি সা.- সামাজিক রীতিনীতির অন্ধ অনুকরণে লিপ্ত হতে পারেননি। জাহেলি সমাজের মানুষ যখন তাদের পূর্বপুরুষদের মূর্তিপূজাকেই পরম সত্য বলে মেনে নিয়েছিল, তখন নবি সা.-এর অন্তরের সত্যনিষ্ঠা তাঁকে সেই অন্ধত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বাধ্য করেছিল। এই অবস্থাকে সমাজতাত্ত্বিক ভাষায় 'Intellectual Alienation' বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্ছিন্নতা বলা যেতে পারে। ইবনে খালদুন তাঁর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন যে, সত্যের পথে চলা এবং তাওহীদের দাওয়াত প্রদান করা অত্যন্ত কঠিন ও সংগ্রামের বিষয়। এই সংগ্রাম কেবল বাহ্যিক যুদ্ধের নয়, বরং এটি ছিল একটি আদর্শিক লড়াই যা বিদ্যমান সমাজব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত।

فإنه في إظهار دعوة التوحيد كالمجاهد والمكابد [2]
অর্থাৎ, তাওহীদের দাওয়াত প্রকাশ করার ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি একজন মুজাহিদ বা কঠোর সংগ্রামকারীর ন্যায় কাজ করেন। নবি সা.-এর ক্ষেত্রে এই 'মুজাহিদ' বা সংগ্রামীর ভূমিকাটি ছিল তাঁর নিজের অন্তরের ফিতরাহকে জাহেলি সমাজের অবক্ষয় থেকে রক্ষা করার একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া।

২. আর্থ-সামাজিক কাঠামো ও নৈতিক অবক্ষয়ের দ্বান্দ্বিকতা

মক্কার আর্থ-সামাজিক কাঠামো ছিল অত্যন্ত বৈষম্যমূলক এবং শোষণমূলক। কুরাইশ অভিজাত শ্রেণি তাদের বাণিজ্যিক আধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে সামাজিক ন্যায়বিচারকে বিসর্জন দিয়েছিল। উপজাতীয় প্রথা এবং ক্ষমতার দাপট সেখানে নৈতিকতার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই কাঠামোগত অবিচার এবং নৈতিক অবক্ষয় নবি সা.-এর উচ্চতর নৈতিক আদর্শের সাথে এক তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করেছিল।

জাহেলি সমাজের নৈতিকতা ছিল মূলত 'Power Politics' বা ক্ষমতার রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল। যেখানে শক্তিশালীরা দুর্বলদের শোষণ করত এবং বংশীয় মর্যাদা বজায় রাখতে গিয়ে অন্যায়ের আশ্রয় নিত। এই সামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন ব্যক্তি, যার চরিত্রে সততা ও ন্যায়বিচারের প্রবল আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তার জন্য এই পরিবেশ অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে। নবি সা.-এর চরিত্রে যে নৈতিক উৎকর্ষতা ছিল, তা মক্কার তৎকালীন পারিবারিক ও সামাজিক আচরণের সাথে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ছিল। ড. আব্দুল্লাহ বিন নাসের আল-সদহান তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, সীরাতের প্রতিটি ঘটনা থেকে পারিবারিক ও সামাজিক আচরণের নৈতিক গুরুত্ব অনুধাবন করা সম্ভব। [3]
নবি সা.-এর জীবনের এই নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব মক্কার তৎকালীন বিশৃঙ্খল ও অনৈতিক পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর বিপরীতে একটি শক্তিশালী বৈপরীত্য হিসেবে কাজ করেছিল।

মক্কার এই আর্থ-সামাজিক অস্থিরতা এবং নৈতিক পতন কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সামগ্রিক সিস্টেমিক ক্রাইসিস। উপজাতীয় সংঘাত এবং সম্পদের অসম বণ্টন মক্কার স্থিতিশীলতাকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ফেলছিল। এই অবস্থায় যখন নবি সা.- সত্যের পথে অগ্রসর হতে চাইলেন, তখন তিনি কেবল একটি ধর্মীয় দাওয়াত দিচ্ছিলেন না, বরং তিনি একটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া সামাজিক ও নৈতিক কাঠামোর বিকল্প হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন। ইবনে খালদুন তাঁর 'তাকরির' বা বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন যে, যখন কোনো সমাজ তার নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলে এবং কেবল বাহ্যিক আড়ম্বর বা ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, তখন সেই সমাজের পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে।

الكمالات كالأعراض، فمن ذلك ذكر الملّة التي كملت وكبرت، والأخرى التي كانت ثم غمرت وصغرت [4]
অর্থাৎ, কোনো জাতি বা ধর্ম যখন পূর্ণতা লাভ করে তখন তা বড় হয়, আর যখন তা তার নৈতিকতা ও আদর্শ হারিয়ে ফেলে তখন তা বিলীন হয়ে যায়। মক্কার জাহেলি সমাজ ঠিক এই দ্বিতীয় অবস্থার দিকেই ধাবিত হচ্ছিল, যা নবি সা.-এর অন্তরের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার সাথে এক চরম দ্বন্দ্ব তৈরি করেছিল।

৩. তাওহীদের দাওয়াত ও অস্তিত্ববাদী সংগ্রাম

তাওহীদ বা একত্ববাদের দাওয়াত প্রদান করা কেবল একটি ধর্মতাত্ত্বিক ঘোষণা ছিল না, বরং এটি ছিল মক্কার তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক Hegemony বা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এক সরাসরি চ্যালেঞ্জ। মক্কার কুরাইশ শাসকরা তাদের মূর্তিপূজা ও উপজাতীয় প্রথাকে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করত। তাই তাওহীদের ডাক ছিল তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের ওপর আঘাত। এই প্রেক্ষাপটে নবি সা.- এর দাওয়াত প্রদান ছিল এক গভীর অস্তিত্ববাদী সংগ্রাম (Existential Struggle)।

তাওহীদের দাওয়াত দেওয়ার অর্থ ছিল মানুষের সার্বভৌমত্বকে (Sovereignty) আল্লাহর সার্বভৌমত্বের (Hakimiyyah) অধীনে নিয়ে আসা। আধুনিক রাজনৈতিক বিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে, এটি ছিল 'Divine Sovereignty' বনাম 'Human/Tribal Sovereignty'-এর মধ্যকার লড়াই। সাইয়্যেদ কুতুবের চিন্তাধারার আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, 'হাকিমিয়্যাহ' বা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ধারণাটি জাহেলি সমাজের মানুষের তৈরি করা কৃত্রিম আইন ও প্রথার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার। [5]
নবি সা.- যখন তাওহীদের কথা বলতেন, তখন তিনি মূলত মক্কার সেই প্রচলিত ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাতেন যা মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে স্রষ্টার দাসত্বে নিয়ে আসার আহ্বান জানাত।

এই অস্তিত্ববাদী সংগ্রাম ছিল অত্যন্ত জটিল এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে ক্লান্তিকর। একদিকে ছিল তাঁর নিজের অন্তরের সত্যের প্রতি অবিচল টান, আর অন্যদিকে ছিল তাঁর আপন সমাজ, আত্মীয়-স্বজন এবং পরিচিত পরিবেশের প্রবল বিরোধিতা। এই দ্বান্দ্বিকতা নবি সা.- কে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে তিনি সমাজের অংশ হয়েও সমাজের অবিচার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিলেন। ইবনে খালদুন তাঁর গ্রন্থে এই সংগ্রামের তীব্রতা বর্ণনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, তাওহীদের দাওয়াত প্রদানকারী ব্যক্তি এক প্রকারের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যান।

فإنه في إظهار دعوة التوحيد كالمجاهد والمكابد [6]
এই 'মুজাহিদ' বা সংগ্রামীর ভূমিকাটি ছিল মক্কার সেই জাহেলি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যা মানুষের বিবেক ও বুদ্ধিবৃত্তিকে মূর্তিপূজা ও উপজাতীয় অহংকারের শিকলে বন্দি করে রেখেছিল। নবি সা.- এর এই সংগ্রাম ছিল মূলত মানবতাকে তার প্রকৃত মর্যাদায় ফিরিয়ে আনার এক মহৎ প্রচেষ্টা, যা তৎকালীন মক্কার ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল।

""
অধ্যায় ২: জাহেলি সমাজের সাথে কগনিটিভ ডিসোন্যান্স (Cognitive Dissonance with Jahili Society)
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

অধ্যায় ২: জাহেলি সমাজের সাথে কগনিটিভ ডিসোন্যান্স (Cognitive Dissonance with Jahili Society) কুইজ

1 / 5

'কগনিটিভ ডিসোন্যান্স' (Cognitive Dissonance) বলতে মনস্তত্ত্বে কী বোঝায়?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...