খণ্ড 92
ফন্ট:100%
থিম:

৯.৬ এলজিবিটিকিউ+ (LGBTQ+) মুভমেন্ট এবং আইডেন্টিটি পলিটিক্স: বায়োলজিক্যাল এসেনশিয়ালিজম (Biological Essentialism) বনাম সোশ্যাল কনস্ট্রাক্ট

ভূমিকা ও আধুনিক পরিচয়বাদী রাজনীতির (Identity Politics) তাত্ত্বিক ভিত্তি


বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে বৈশ্বিক রাজনীতি ও সমাজতাত্ত্বিক ডিসকোর্সে এক অভূতপূর্ব রূপান্তর পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা আধুনিক পরিভাষায় ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’ বা পরিচয়বাদী রাজনীতি নামে পরিচিত। এই রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হলো সামষ্টিক বা সর্বজনীন মানবিক পরিচয়ের পরিবর্তে লিঙ্গ, যৌন প্রবণতা এবং জাতিগত ক্ষুদ্র পরিচয়ের ভিত্তিতে সমাজকে খণ্ডিত করা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যকে পুনর্নির্ধারণ করা। বিশেষত, এলজিবিটিকিউ+ (LGBTQ+) আন্দোলন এই পরিচয়বাদী রাজনীতির অগ্রভাগে অবস্থান করছে। ঐতিহ্যগত ইসলামি সমাজদর্শন এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক (Epistemological) কাঠামোর সাথে এই আন্দোলনের সংঘাত কেবল বাহ্যিক আচার-আচরণের স্তরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মানুষের অস্তিত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব এবং নৈতিকতার মৌলিক ভিত্তির ওপর আঘাত হানে। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হয় তার ‘ফিতরাত’ বা আল্লাহ প্রদত্ত আদি ও অকৃত্রিম স্বভাব এবং স্রষ্টার সাথে তার দাসত্বের সম্পর্কের মাধ্যমে। পক্ষান্তরে, আধুনিক পরিচয়বাদী রাজনীতি মানুষকে তার জৈবিক কামনা ও মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতির ফ্রেমে বন্দি করে এক নতুন কৃত্রিম পরিচয় নির্মাণ করতে চায়।

পশ্চিমা আধুনিকতাবাদ ও উত্তর-আধুনিকতাবাদের গর্ভে জন্ম নেওয়া এই মতাদর্শিক রূপান্তরকে বুঝতে হলে আমাদের সমকালীন পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের দিকে তাকাতে হবে। পশ্চিমা সমাজ যখন ওহির আলো থেকে বিচ্যুত হয়ে চরম বস্তুবাদের দিকে ধাবিত হয়, তখন তারা নৈতিকতার কোনো সর্বজনীন ও স্থায়ী মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। এই নৈতিক আপেক্ষিকতাবাদ (Moral Relativism) এবং মূল্যবোধের শূন্যতা আধুনিক পশ্চিমা সমাজকে এক গভীর সংকটে নিপতিত করেছে। পশ্চিমা নারীবাদ ও উত্তর-আধুনিক দর্শনের এই বিবর্তন সম্পর্কে সমকালীন চিন্তাবিদগণ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যেমনটি পশ্চিমা নৈতিক সংকটের ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে একটি গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে:

... للحديث عن الغرب في العصر الحديث، الغرب الآن، لننتفقْ أننا لسنا في وضع يسمح لنا بإلقاء محاضرات أخلاقية على أي شخص...

অনুবাদ: "...আধুনিক যুগে পশ্চিমের কথা বলতে গেলে—বর্তমান পশ্চিমের ক্ষেত্রে—আসুন আমরা একমত হই যে, আমরা এমন কোনো অবস্থানে নেই যা আমাদের অন্য কাউকে নৈতিক উপদেশ দেওয়ার অধিকার দেয়..." [1] । এই নৈতিক দেউলিয়াত্বই মূলত ঐতিহ্যগত পারিবারিক কাঠামো এবং জৈবিক সত্যকে অস্বীকার করে চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও যৌন নৈরাজ্যবাদের পথ সুগম করেছে।

ইসলামি সমাজব্যবস্থায় সামষ্টিক নিরাপত্তা (Collective Security) এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি হলো ওহি-ভিত্তিক জ্ঞান এবং ফিতরাতের সংরক্ষণ। রাসুলুল্লাহ সা. মদিনায় যে রাষ্ট্র ও সমাজ গঠন করেছিলেন, তার ভিত্তি ছিল তাওহিদ এবং তাকওয়া, কোনো কৃত্রিম যৌন বা গোত্রীয় পরিচয় নয়। আধুনিক সেক্যুলার ও সিভিল ডিসকোর্স যখন ওহির কর্তৃত্বকে অস্বীকার করে মানুষের খেয়ালখুশিকে আইনের মর্যাদা দেয়, তখন তা সমাজকে এক অন্ধকার জাহিলিয়াতের দিকে ঠেলে দেয়। সমকালীন মুসলিম বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে এই সিভিল ডিসকোর্সের নেতিবাচক প্রভাব ও তার পরিণতি সম্পর্কে গভীর আলোচনা হয়েছে, যা আধুনিক সেক্যুলারিজমের অসারতাকে উন্মোচিত করে [2] । পরিচয়বাদী রাজনীতি মূলত মানুষের আধ্যাত্মিক শূন্যতাকে জাগতিক ও জৈবিক পরিচয়ের মাধ্যমে পূরণ করার একটি ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র।

বায়োলজিক্যাল এসেনশিয়ালিজম (Biological Essentialism) এবং ফিতরাতের ইসলামি ধারণা


বায়োলজিক্যাল এসেনশিয়ালিজম বা জৈবিক অপরিহার্যতাবাদ হলো এমন একটি বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা দাবি করে যে মানুষের লিঙ্গীয় পরিচয় (পুরুষ ও নারী) এবং তাদের আচরণগত কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য মূলত তাদের জৈবিক গঠন, ক্রোমোজোম, হরমোন এবং শারীরবৃত্তীয় কাঠামোর দ্বারা নির্ধারিত ও অপরিবর্তনীয়। ইসলামি আকাইদ ও ফিকহের পরিভাষায় এই ধারণার সমান্তরাল এবং আরও গভীর ও আধ্যাত্মিক রূপ হলো ‘ফিতরাত’ (primordial nature)। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মানবজাতিকে পুরুষ ও নারী—এই দ্বিমুখী জৈবিক বাস্তবতায় সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের প্রত্যেকের জন্য নির্দিষ্ট শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, "আর তিনি সৃষ্টি করেছেন জোড়ায় জোড়ায় পুরুষ ও নারী" [3] । এই জৈবিক দ্বিরূপতা (Sexual Dimorphism) কোনো সামাজিক চুক্তি বা কৃত্রিম নির্মাণ নয়, বরং এটি মহাবিশ্বের স্রষ্টার এক সুনিপুণ পরিকল্পনা ও সৃষ্টিতাত্ত্বিক সত্য।

মনস্তাত্ত্বিক ও মানবিয় বিকাশের বৈজ্ঞানিক ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, শৈশব থেকেই মানুষের লিঙ্গীয় পরিচয় এবং তার পারিপার্শ্বিক অনুধাবন একটি সুনির্দিষ্ট প্রাকৃতিক নিয়মে আবর্তিত হয়। মানব শিশুর বিকাশ প্রক্রিয়ার ওপর রচিত একটি গ্রন্থে শিশুর জ্ঞানীয় ও মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ সম্পর্কে বলা হয়েছে:

إن الطفل في هذه المرحلة يبدأ في الانتباه إلى ما هو مهم, وتجاهل ما هو غير مرتبط أو منبت الصلة, وبالتالي يميز السمات والخصائص الجوهرية لتجميع الشياء تجميعًا منطقيًّا ...

অনুবাদ: "নিশ্চয়ই শিশু এই পর্যায়ে যা গুরুত্বপূর্ণ তার প্রতি মনোযোগ দিতে শুরু করে এবং যা অপ্রাসঙ্গিক বা সম্পর্কহীন তা উপেক্ষা করে। ফলস্বরূপ, সে বস্তুসমূহকে যৌক্তিকভাবে শ্রেণিবদ্ধ করার জন্য তাদের মৌলিক ও অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যসমূহকে পৃথক করতে পারে..." [4] । এই প্রাকৃতিক বিকাশ প্রমাণ করে যে, মানুষের মস্তিষ্ক এবং তার বোধশক্তি প্রাকৃতিকভাবেই অপরিহার্য সত্য ও বাস্তবতাকে চিনতে অভ্যস্ত, যা তার ফিতরাতেরই অংশ।

তদুপরি, ছেলে ও মেয়ের শারীরিক গঠন, ওজন এবং হরমোনজনিত পার্থক্য শৈশব থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করে, যা তাদের ভিন্ন ভিন্ন জৈবিক ভূমিকাকে নির্দেশ করে। মানব উন্নয়ন সংক্রান্ত গবেষণায় দেখা যায়:

المرحلة يكون متوسط وزن الولد حوالي 18 كيلو جرامًا, ومتوسط وزن البنت 17،5 كيلو جرامًا...

অনুবাদ: "...এই পর্যায়ে একটি ছেলের গড় ওজন হয় প্রায় ১৮ কেজি এবং একটি মেয়ের গড় ওজন হয় ১৭.৫ কেজি..." [5] । এই সূক্ষ্ম শারীরিক ও শারীরবৃত্তীয় পার্থক্যসমূহ প্রমাণ করে যে, পুরুষ ও নারীর লিঙ্গীয় পরিচয় কেবল মনস্তাত্ত্বিক কোনো কল্পনা নয়, বরং এটি একটি অকাট্য জৈবিক সত্য। ইসলামি শরিয়ত এই জৈবিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করেই পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব বণ্টন করেছে। রাসুলুল্লাহ সা. পুরুষদের নারীদের সদৃশ হতে এবং নারীদের পুরুষদের সদৃশ হতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন, যা ফিতরাত ও জৈবিক সত্যকে বিকৃত করার বিরুদ্ধে ইসলামের দৃঢ় অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ।

সোশ্যাল কনস্ট্রাক্ট (Social Construct) তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ ও ইসলামি সমালোচনা


আধুনিক কুইয়ার থিওরি (Queer Theory) এবং চরমপন্থী নারীবাদী দর্শনের মূল দাবি হলো, লিঙ্গ (Gender) কোনো জৈবিক সত্য নয়, বরং এটি একটি ‘সোশ্যাল কনস্ট্রাক্ট’ বা সামাজিক বিনির্মাণ। তাদের মতে, সমাজই জোরপূর্বক মানুষের ওপর পুরুষত্ব বা নারীত্বের ভূমিকা চাপিয়ে দেয়। এই তত্ত্বের চরম প্রকাশ ঘটেছে জেন্ডার আইডেন্টিটি বা লিঙ্গীয় আত্মপরিচয়ের ধারণায়, যেখানে দাবি করা হয় যে একজন ব্যক্তি শারীরিকভাবে পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও মানসিকভাবে নিজেকে নারী দাবি করতে পারে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রকে তা মেনে নিতে হবে। ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব এই সামাজিক বিনির্মাণবাদকে চরম বিভ্রান্তি এবং স্রষ্টার সৃষ্টির বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য বিদ্রোহ হিসেবে গণ্য করে। ইসলাম স্বীকার করে যে, সংস্কৃতিভেদে পুরুষ ও নারীর পোশাক বা বাহ্যিক আচরণের কিছু সামাজিক প্রকাশ পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু তাদের মূল লিঙ্গীয় পরিচয় এবং ফিতরাত কখনোই সামাজিক বিনির্মাণ নয়, বরং তা ঐশ্বরিক সৃষ্টি।

মানব সভ্যতার ইতিহাস এবং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ধারা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, মানুষের চিন্তাধারা ও জীবনযাত্রার বাহ্যিক রূপ যতই পরিবর্তিত হোক না কেন, মানুষের মৌলিক সৃষ্টিগত ও নৈতিক আইনসমূহ অপরিবর্তিত থাকে। সীরাত ও ইতিহাস বিষয়ক একটি গ্রন্থে অত্যন্ত চমৎকারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:

مهما اختلفت بالناس مناحي الحياة، وطرائق التفكير .. ومهما (تطورت) العلوم والمعارف ووسائلها، ومهما تنوّعت أساليب الحياة الاجتماعيّة في المجتمع البشري ..

অনুবাদ: "মানুষের জীবনের গতিপথ এবং চিন্তাধারা যতই ভিন্ন হোক না কেন... এবং বিজ্ঞান, জ্ঞান ও তার মাধ্যমসমূহের যতই (উন্নতি) ঘটুক না কেন, এবং মানবসমাজে সামাজিক জীবনযাত্রার পদ্ধতি যতই বৈচিত্র্যময় হোক না কেন..."। অর্থাৎ, বাহ্যিক সভ্যতার বৈচিত্র্য ও বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন কখনোই মানুষের মৌলিক ফিতরাত এবং জৈবিক পরিচয়কে বদলে দিতে পারে না। লিঙ্গীয় পরিচয়কে সামাজিক বিনির্মাণ বলে দাবি করা মূলত মানব অস্তিত্বের মূল লক্ষ্য বা ‘হায়াতী লক্ষ্য’ (الهدف الحيوي)-কে ধ্বংস করার শামিল [6]

সামাজিক বিনির্মাণবাদের এই চরমপন্থী রূপ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ভারসাম্যকে বিনষ্ট করে। যখন একজন মানুষকে শেখানো হয় যে তার শরীর এবং তার মনের লিঙ্গীয় পরিচয় এক নয়, তখন সে এক গভীর অস্তিত্ববাদী সংকটে (Existential Crisis) পতিত হয়। ইসলাম এই মনস্তাত্ত্বিক নৈরাজ্য থেকে মানবতাকে রক্ষা করে। রাসুলুল্লাহ সা. মানবজাতিকে যে ফিতরাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তা মানুষকে তার শারীরিক বাস্তবতার সাথে তার মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক সত্তার এক অপূর্ব সমন্বয় সাধন করে। লিঙ্গীয় পরিচয়কে অস্বীকার করা মূলত আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করার শয়তানি চক্রান্তের অংশ, যার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে শয়তানের উক্তি উল্লেখ করে সতর্ক করা হয়েছে: "এবং আমি অবশ্যই তাদের নির্দেশ দেব, ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করবেই" [7]

সভ্যতার উত্থান-পতন, নৈতিক অবক্ষয় এবং লূত আ.-এর সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক শিক্ষা


ইতিহাসের দর্শন (Philosophy of History) পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, যেকোনো সভ্যতার চরম বিকাশ যখন বস্তুগত বিলাসিতা ও নৈতিক শূন্যতায় রূপ নেয়, তখন সেখানে ফিতরাত-বিরোধী যৌন আচরণ ও নৈতিক বিকৃতির প্রাদুর্ভাব ঘটে। সমাজ যখন প্রাকৃতিক ও ঐশ্বরিক আইনকে অমান্য করে চরম ভোগবাদে লিপ্ত হয়, তখনই তার পতন ত্বরান্বিত হয়। প্রাচীন সভ্যতাসমূহের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে এই সত্যটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রাচীন প্রাচ্যের সভ্যতার বিবর্তন সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন:

أما المدنية فتدل على سكنى المدن والانتظام في مجتمعات أكثر تعقيدًا ورقيًّا أو كما تقول بعض كتب اللغة: إنها تمثل الانغماس في حياة الدَّعة والترف.

অনুবাদ: "আর নাগরিকতা (মাদানিয়্যাত) নির্দেশ করে নগরে বসবাস এবং আরও জটিল ও উন্নত সমাজে সুশৃঙ্খল হওয়াকে, অথবা যেমনটি কিছু অভিধানে বলা হয়েছে: এটি মূলত আরাম-আয়েশ ও বিলাসিতার জীবনে নিমজ্জিত হওয়াকে প্রতিনিধিত্ব করে" [8] । এই অতিরিক্ত আরাম-আয়েশ এবং বিলাসিতাই মানুষকে প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে গিয়ে নতুন নতুন কৃত্রিম ও বিকৃত চাহিদা তৈরি করতে প্ররোচিত করে।

ইসলামি ইতিহাসে এই নৈতিক অবক্ষয় এবং ফিতরাত-বিরোধী আচরণের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক উদাহরণ হলো লূত আ.-এর সম্প্রদায় (সাদুম ও আমোরাহ)। তারা ছিল ইতিহাসের প্রথম জাতি যারা ফিতরাতের সীমা লঙ্ঘন করে সমকামিতার মতো চরম বিকৃতিতে লিপ্ত হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা তাদের এই আচরণকে ‘ফাহিশাহ’ বা চরম অশ্লীলতা এবং ‘ইসরাফ’ বা সীমা লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাদের এই বিকৃতি কেবল ব্যক্তিগত পাপ ছিল না, বরং তা ছিল একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক রূপ, যা আজকের এলজিবিটিকিউ+ আন্দোলনের আইডেন্টিটি পলিটিক্সের মতোই সমাজকে গ্রাস করেছিল। ফলস্বরূপ, আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর এমন ভয়াবহ শাস্তি নাজিল করেছিলেন যা মানব ইতিহাসের জন্য এক চিরন্তন সতর্কবার্তা।

সভ্যতার টিকে থাকা এবং তার ধ্বংসের মূল কারণ নিহিত থাকে তার ধর্ম ও নৈতিকতার সাথে সম্পর্কের ওপর। প্রাচীন সভ্যতাসমূহের ধ্বংসাবশেষ এবং তাদের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি যে, তাদের ধর্ম ও শিল্পকলা কীভাবে তাদের নৈতিক অবস্থাকে প্রতিফলিত করত:

والديانة شأنها شأن الحضارة خرجت في معناها عن مدلولها الأصلي... إلا أن المعنى المألوف هو أنها: "الاعتراف بقوة أو قوى تفوق البشر، تسيطر عليهم، ويجب عليهم إطاعتها ويؤثر اعترافهم بها في سلوكهم وفي عقليتهم"

অনুবাদ: "ধর্মের বিষয়টিও সভ্যতার মতোই, যা তার মূল আভিধানিক অর্থ থেকে বের হয়ে এসেছে... তবে এর পরিচিত অর্থ হলো: 'এমন এক বা একাধিক অতিমানবিয় শক্তির স্বীকৃতি দেওয়া, যা মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করে, যার আনুগত্য করা মানুষের জন্য আবশ্যক এবং এই স্বীকৃতি মানুষের আচরণ ও মানসিকতায় প্রভাব বিস্তার করে'" [9]

যখন কোনো সমাজ এই অতিপ্রাকৃতিক ও ঐশ্বরিক শক্তির বিধানকে অস্বীকার করে নিজেদের মনগড়া নৈতিকতা তৈরি করে, তখন তাদের আচরণ ও মানসিকতায় চরম বিকৃতি দেখা দেয়। রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার যে আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা ছিল এই ধরনের সমস্ত জাহিলি বিকৃতি থেকে মুক্ত। তিনি সা. পারিবারিক কাঠামোকে পবিত্র ও সুরক্ষিত রাখার জন্য বিয়ের বিধানকে সহজ করেছেন এবং যেকোনো ধরনের ফিতরাত-বিরোধী যৌন আচরণকে কঠোর শাস্তির আওতায় এনেছেন। এটিই ছিল ইসলামের ‘সামষ্টিক নিরাপত্তা’ (Collective Security) নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি, যা সমাজকে নৈতিক পচন ও সভ্যতার বিলুপ্তি থেকে রক্ষা করে। আধুনিক এলজিবিটিকিউ+ আন্দোলন এবং তার পেছনের আইডেন্টিটি পলিটিক্স মূলত মানবতাকে সেই প্রাচীন সাদুমের ধ্বংসাত্মক পরিণতির দিকেই নিয়ে যাচ্ছে, যা থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো ওহির নির্দেশিত ফিতরাত ও নৈতিকতার চিরন্তন আলোয় ফিরে আসা।

""
৯.৬ এলজিবিটিকিউ+ (LGBTQ+) মুভমেন্ট এবং আইডেন্টিটি পলিটিক্স: বায়োলজিক্যাল এসেনশিয়ালিজম (Biological Essentialism) বনাম সোশ্যাল কনস্ট্রাক্ট
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

৯.৬ এলজিবিটিকিউ+ (LGBTQ+) মুভমেন্ট এবং আইডেন্টিটি পলিটিক্স: বায়োলজিক্যাল এসেনশিয়ালিজম (Biological Essentialism) বনাম সোশ্যাল কনস্ট্রাক্ট কুইজ

1 / 5

ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের পরিচয় কিসের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...