খণ্ড 46
ফন্ট:100%
থিম:

৬.২.১ মাংসে কামড় দেওয়ার পর রাসুল (সা.)-এর তাৎক্ষণিক নির্দেশ: "হাত গুটিয়ে নাও, এই রান আমাকে বলছে যে এতে বিষ মেশানো

মাংসে কামড় দেওয়ার পর রাসুল (সা.)-এর তাৎক্ষণিক নির্দেশ: অতীন্দ্রিয় উপলব্ধি ও বিষপ্রয়োগের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ইসলামি ইতিহাসের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হলো খায়বার বিজয়ের পরবর্তী ঘটনাবলি। খায়বার দুর্গসমূহের পতন এবং ইহুদি শক্তির দাপট প্রশমিত করার পর, মুসলিম উম্মাহর জন্য এক নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল। তবে এই বিজয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই এক সুক্ষ্ম ও মারাত্মক ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছিল খায়বারের ইহুদিরা। এই ষড়যন্ত্রটি ছিল সরাসরি রাসুলুল্লাহ সা.-এর জীবনাবসান ঘটানোর একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা। এই ঘটনাটি কেবল একটি হত্যার চেষ্টা ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ধর্মীয় সংঘাতের এক চরম বহিঃপ্রকাশ।

খায়বার বিজয়ের পর ইহুদিদের একটি গোষ্ঠী অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠেছিল। তাদের এই ক্ষোভের মূলে ছিল তাদের রাজনৈতিক আধিপত্য হারানো এবং মুসলিম শক্তির ক্রমবর্ধমান উত্থান। এই প্রেক্ষাপটে, জয়নাব নামক এক ইহুদি নারী একটি অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও মরণঘাতী কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি একটি মেষ বা ছাগল জবাই করে তাতে অত্যন্ত শক্তিশালী বিষ মিশিয়ে দেন এবং তা রাসুলুল্লাহ সা.-এর নিকট উপহার হিসেবে পাঠাতে উদ্যত হন। এই ঘটনাটি কেবল একটি ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন খায়বারের অবশিষ্ট ইহুদি শক্তির পক্ষ থেকে একটি রাজনৈতিক ও সামরিক পাল্টা আঘাতের প্রচেষ্টা।

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, এই বিষপ্রয়োগের ঘটনাটি ঘটেছিল যখন রাসুলুল্লাহ সা. এবং তাঁর সাহাবিবর্গ বিজয়ের আনন্দ ও খাদ্যের আমেজ উপভোগ করছিলেন। এই মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রাত্যহিক, কিন্তু এর আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক মরণঘাতী নীল নকশা। এই ঘটনার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে, ইসলামের প্রাথমিক প্রসারের সময় রাসুলুল্লাহ সা.-কে কতটা সুক্ষ্ম ও ধূর্ত শত্রুর মোকাবিলা করতে হয়েছিল। [1] বিষাক্ত মাংসের মুহূর্ত: রাসুল (সা.)-এর অতীন্দ্রিয় সংকেত ও তাৎক্ষণিক নির্দেশ

ঘটনার সেই মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত নাটকীয় এবং বিস্ময়কর। রাসুলুল্লাহ সা. যখন সেই বিষাক্ত মাংসের একটি অংশ গ্রহণ করতে উদ্যত হলেন, তখন তাঁর কাছে এক অতীন্দ্রিয় বা ঐশী সংকেত অনুভূত হয়। এটি ছিল তাঁর নবুওয়াতের একটি বিশেষ নিদর্শন, যেখানে বস্তুগত জগতের ঊর্ধ্বে গিয়ে তিনি সত্যের স্বরূপ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মাংসের একটি টুকরো মুখে দেওয়ার সাথে সাথেই তিনি বুঝতে পারলেন যে, এই খাদ্যে প্রাণঘাতী বিষ মিশ্রিত করা হয়েছে।

তৎক্ষণাৎ, কোনো প্রকার দ্বিধা বা বিলম্ব না করে রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর সাহাবিদের অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে একটি নির্দেশ প্রদান করলেন। তিনি তাঁর সঙ্গীদের ভোজন স্থগিত করার জন্য আদেশ দিলেন। তাঁর সেই ঐতিহাসিক ও অতীন্দ্রিয় নির্দেশটি ছিল নিম্নরূপ:

كفوا أيديكم فإن هذه الذراع تخبرنى أنها مسمومة [2] । এই ইবারত বা আরবি পাঠ্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানে রাসুলুল্লাহ সা. মাংসের সেই নির্দিষ্ট অংশ বা হাড়ের টুকরোটিকে (الذراع) একটি জীবন্ত সত্তার মতো বর্ণনা করেছেন, যা তাঁকে বিষের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত করছে। এটি কেবল একটি শারীরিক অনুভূতি ছিল না, বরং এটি ছিল ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত এক প্রকার জ্ঞান বা সংকেত, যা তাঁকে এবং তাঁর সাহাবিদের নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছিল।

রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াটি তাঁর প্রজ্ঞা এবং অতীন্দ্রিয় ক্ষমতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে হয়তো তিনি বিষের স্বাদ বুঝতে পারতেন, কিন্তু একজন নবি হিসেবে তিনি বিষের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানতে পেরেছিলেন। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলকে শত্রুর চক্রান্ত থেকে রক্ষা করার জন্য সর্বদা বিশেষ জ্ঞান ও সংকেতের মাধ্যমে সাহায্য করে থাকেন। এই নির্দেশটি কেবল একটি আদেশ ছিল না, বরং এটি ছিল সাহাবিদের জীবন রক্ষার একটি ঐশী সুরক্ষা কবচ। [3] বিশর ইবনে আল-বারা (রা.)-এর আত্মত্যাগ ও রাসুল (সা.)-এর চিকিৎসা সংক্রান্ত নির্দেশনা

রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই নির্দেশ সত্ত্বেও, তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সাহাবি বিশর ইবনে আল-বারা (রা.) সেই বিষাক্ত মাংসের একটি অংশ গ্রহণ করেছিলেন। বিশর ইবনে আল-বারা (রা.) ছিলেন অত্যন্ত মহৎ হৃদয়ের একজন মানুষ। তিনি যখন দেখলেন রাসুলুল্লাহ সা. ভোজন স্থগিত করার নির্দেশ দিচ্ছেন, তখন তিনি বিষের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়েও একটি বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। তিনি রাসুলুল্লাহ সা.-এর ভোজনের আনন্দ বা পরিবেশ নষ্ট করতে চাননি, তাই তিনি সেই মাংসটি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর এই কাজ ছিল রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তির বহিঃপ্রকাশ, যদিও এটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশর ইবনে আল-বারা (রা.)-এর এই ত্যাগ ছিল অপরিসীম। বিষক্রিয়ার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, তিনি তৎক্ষণাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাঁর শরীরের বর্ণ কালো হয়ে যেতে শুরু করে। বিষটি তাঁর শরীরে প্রবেশ করার পর তিনি দীর্ঘকাল যন্ত্রণার শিকার হন। ঐতিহাসিক তথ্যমতে, তিনি প্রায় এক বছর যাবত এই বিষের প্রভাবে পঙ্গু অবস্থায় যন্ত্রণার সাথে জীবন অতিবাহিত করেন এবং অবশেষে এই বিষক্রিয়ার কারণেই শাহাদাত বরণ করেন। [4] এই সংকটময় মুহূর্তে রাসুলুল্লাহ সা. কেবল একজন নেতা হিসেবেই নয়, বরং একজন চিকিৎসক ও অভিভাবক হিসেবেও ভূমিকা পালন করেন। তিনি লক্ষ্য করলেন যে, আরও কিছু সাহাবি সেই বিষাক্ত মাংসের অংশ গ্রহণ করেছিলেন। তাই তিনি তৎক্ষণাৎ একটি চিকিৎসা সংক্রান্ত নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি নির্দেশ দেন যে, যারা এই বিষাক্ত মাংস খেয়েছেন, তাদের যেন 'হিজামা' বা রক্তমোক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

রাসুলুল্লাহ সা. নিজেই নিজের কাঁধে হিজামা করিয়েছিলেন যাতে বিষের প্রভাব প্রশমিত করা যায়। এটি ছিল তৎকালীন সময়ের একটি অত্যন্ত কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি। রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই নির্দেশটি প্রমাণ করে যে, ইসলাম কেবল আধ্যাত্মিকতা নয়, বরং বাস্তবসম্মত চিকিৎসা বিজ্ঞান ও জীবন রক্ষার গুরুত্বকেও সমানভাবে স্বীকার করে। বিশর ইবনে আল-বারা (রা.)-এর এই আত্মত্যাগ এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর চিকিৎসা সংক্রান্ত পদক্ষেপটি ইসলামের ইতিহাসে বীরত্ব ও প্রজ্ঞার এক অবিস্মরণীয় সমন্বয় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। [5] অপরাধীর স্বীকারোক্তি ও আইনি ও নৈতিক বিচারব্যবস্থার সমন্বয়

ঘটনার পর রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে এই ষড়যন্ত্রের মূল হোতাকে চিহ্নিত করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। জয়নাব নামক সেই ইহুদি নারীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য উপস্থিত করা হয়। যখন তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয় যে, কেন তিনি এই জঘন্য কাজ করেছেন, তখন তিনি অত্যন্ত নির্লিপ্ত ও সাহসের সাথে তাঁর অপরাধ স্বীকার করেন। তাঁর স্বীকারোক্তি ছিল অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এবং এটি তৎকালীন ইহুদিদের মানসিকতা ও প্রতিহিংসার স্বরূপ উন্মোচন করে।

জয়নাব স্বীকার করেন যে, তিনি রাসুলুল্লাহ সা.-কে হত্যার উদ্দেশ্যেই এই বিষ মিশিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল অত্যন্ত কুৎসিত: তিনি বলেছিলেন যে, তাঁর পরিবার ও আত্মীয়স্বজন মুসলিমদের হাতে নিহত হয়েছে, তাই তিনি প্রতিশোধ নিতে চেয়েছেন। তিনি বলেছিলেন:

لقد بلغت من قومى ما لا يخفى عليك قتلت زوجى وأبي وعمى، فقلت: إن كان نبيًّا فسيخبره الله، وإن كان ملكًا استرحنا منه

অর্থাৎ, "আমার গোত্রের অবস্থা আপনার কাছে অজানা নয়; আমি আমার স্বামী, পিতা ও চাচাকে হারিয়েছি। তাই আমি ভেবেছিলাম, যদি তিনি নবি হন তবে আল্লাহ তাঁকে তা জানিয়ে দেবেন, আর যদি তিনি কেবল একজন রাজা হন তবে আমরা তাঁর হাত থেকে মুক্তি পাব।" [6] । জয়নাবের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, তিনি রাসুলুল্লাহ সা.-এর নবুওয়াত সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে তিনি যেকোনো উপায়ে বিষপ্রয়োগ করতে দ্বিধা করেননি।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে রাসুলুল্লাহ সা.-এর বিচারিক সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত অধিকারের খাতিরে জয়নাবকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, কিন্তু সামাজিক ন্যায়বিচার ও 'কিসাস' বা প্রতিশোধের বিধান কার্যকর করার জন্য তাঁকে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের নির্দেশ দেন। বিশর ইবনে আল-বারা (রা.)-এর মৃত্যু যেহেতু এই বিষক্রিয়ার কারণে হয়েছিল, তাই আইনিভাবে জয়নাবকে কিসাস হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ছিল অপরিহার্য। [7]

রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই সিদ্ধান্তটি ইসলামের আইনি ও নৈতিক কাঠামোর এক অনন্য উদাহরণ। এখানে ব্যক্তিগত ক্ষমা এবং রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক ন্যায়বিচারের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ও কার্যকর সমন্বয় সাধিত হয়েছে। একদিকে যেমন তিনি শত্রুর প্রতি দয়ার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন, অন্যদিকে তেমনি একজন মুসলিম সাহাবির রক্তের মর্যাদা রক্ষায় কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছেন। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ইসলামে অপরাধের বিচার কেবল আবেগ দ্বারা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট আইনি ও নৈতিক নীতিমালা দ্বারা পরিচালিত হয়। [8]

""
৬.২.১ মাংসে কামড় দেওয়ার পর রাসুল (সা.)-এর তাৎক্ষণিক নির্দেশ: "হাত গুটিয়ে নাও, এই রান আমাকে বলছে যে এতে বিষ মেশানো
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

৬.২.১ মাংসে কামড় দেওয়ার পর রাসুল (সা.)-এর তাৎক্ষণিক নির্দেশ: "হাত গুটিয়ে নাও, এই রান আমাকে বলছে যে এতে বিষ মেশানো কুইজ

1 / 5

মাংসে কামড় দেওয়ার পরপরই রাসুল (সা.) সাহাবীদের কী বলেছিলেন?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...