খণ্ড 4
ফন্ট:100%
থিম:

৯.৫ খতনা ও নাভি কর্তন: জন্মগত অবস্থা (Born Circumcised) বনাম আব্দুল মুত্তালিবের সপ্তম দিনের আনুষ্ঠানিকতা

৯.৫ খতনা ও নাভি কর্তন: জন্মগত অবস্থা (Born Circumcised) বনাম আব্দুল মুত্তালিবের সপ্তম দিনের আনুষ্ঠানিকতা

রাসুলুল্লাহ সা. এর জন্মগত শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং শৈশবের প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতাগুলো ইসলামের ইতিহাস ও সীরাত শাস্ত্রের এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গবেষণাধর্মী আলোচনার বিষয়। বিশেষ করে খতনা (Circumcision) এবং নাভি কর্তনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে মুহাদ্দিসীন এবং সীরাত লেখকদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মতামতের অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়। এই আলোচনা কেবল একটি শারীরিক প্রক্রিয়ার বিবরণ নয়, বরং এটি নবিজির 'বাশারিয়াত' (মানবতা) এবং 'মুজিজা' (অলৌকিকতা)-র মধ্যবর্তী এক তাত্ত্বিক মেলবন্ধন। ঐতিহাসিকভাবে এই বিষয়টি নিয়ে তিনটি প্রধান ধারা প্রচলিত রয়েছে: প্রথমত, তিনি জন্মগতভাবেই খতনার অধিকারী ছিলেন; দ্বিতীয়ত, ফেরেশতা জিবরাঈল আ. তাঁর পবিত্রতা অর্জনের প্রক্রিয়ায় এটি সম্পন্ন করেছিলেন; এবং তৃতীয়ত, তাঁর পিতামহ আব্দুল মুত্তালিব প্রচলিত আরবিয় প্রথা অনুযায়ী সপ্তম দিনে এটি সম্পাদন করেন।

জন্মগত খতনার ধারণা ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ (The Concept of Born Circumcised)

সীরাতের কিছু বর্ণনা এবং প্রাচীন ঐতিহ্যে এই দাবি করা হয়েছে যে, নবি মুহাম্মাদ সা. জন্মগতভাবেই খতনার অধিকারী ছিলেন। এই মতবাদের প্রবক্তারা মনে করেন, যেহেতু তিনি সমস্ত মানবজাতির জন্য শ্রেষ্ঠ এবং শেষ নবি, তাই তাঁর শারীরিক গঠন জন্মলগ্ন থেকেই পবিত্র ও নিখুঁত ছিল। এই ধারণাকে সমর্থন করে কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয়েছে:

أنه وُلِد مختونًا، وهو حديث ضعيف [1] তাত্ত্বিকভাবে এই মতটি নবিজির 'নবুওয়াতের বিশেষত্ব' এবং 'শারীরিক পবিত্রতা'র সাথে সম্পৃক্ত। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, পূর্ববর্তী তেরোজন নবিও জন্মগতভাবে খতনার অধিকারী ছিলেন এবং মুহাম্মাদ সা. সেই ঐতিহ্যেরই অংশ। তবে এই মতটি যখন কঠোর হাদিস শাস্ত্রের মানদণ্ডে যাচাই করা হয়, তখন দেখা যায় যে এর স্বপক্ষে উপস্থাপিত বর্ণনাগুলো অত্যন্ত দুর্বল (Da'if)। মুহাদ্দিসীনদের একটি বড় অংশ মনে করেন, নবিজির জীবনের প্রতিটি পর্যায় মানবিয় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে, যাতে তিনি মানবজাতির জন্য আদর্শ হতে পারেন। জন্মগত খতনার দাবিটি তাঁর এই মানবিয় অভিজ্ঞতার সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে, তাই অনেক গবেষক একে অলৌকিকতার অতিরঞ্জিত বর্ণনা হিসেবে গণ্য করেন।

মনস্তাত্ত্বিক ও ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই মতবাদটি নবিজির প্রতি গভীর ভক্তি এবং তাঁকে সাধারণ মানুষের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা। তবে বিশুদ্ধ সীরাত চর্চায় 'বাশারিয়াত' বা মানবিয় সত্তার গুরুত্ব অপরিসীম। যদি তিনি জন্মগতভাবেই খতনার অধিকারী হতেন, তবে খতনার যে বিধান পরবর্তীকালে উম্মতের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, তার বাস্তব উদাহরণ তিনি নিজে হতে পারতেন না। তাই অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য গবেষক এই মতটিকে ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল বলে অভিহিত করেছেন।

আব্দুল মুত্তালিবের সপ্তম দিনের আনুষ্ঠানিকতা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট

দ্বিতীয় এবং অধিকতর গ্রহণযোগ্য মতটি হলো, নবি মুহাম্মাদ সা. এর খতনা তাঁর পিতামহ আব্দুল মুত্তালিব কর্তৃক সপ্তম দিনে সম্পন্ন করা হয়েছিল। তৎকালীন আরবের সামাজিক রীতি ও প্রথা অনুযায়ী, নবজাতকের সপ্তম দিনে নাম রাখা এবং খতনার মতো আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা একটি প্রচলিত রীতি ছিল। এই প্রথাটি কেবল ধর্মীয় নয়, বরং একটি সামাজিক পরিচয় এবং পুরুষত্বের প্রাথমিক চিহ্ন হিসেবে গণ্য হতো। এই বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে:

وأن عبد المطلب ختنه يوم سابعه ولم يصح في ذلك شيء على ما قاله جمع من [2] রাজনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আব্দুল মুত্তালিব তৎকালীন মক্কায় অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং বংশীয় ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। নবিজির খতনার ক্ষেত্রে তিনি প্রচলিত আরবিয় প্রথা অনুসরণ করে তাঁর নাতিকে সামাজিক ও শারীরিক শুদ্ধতার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়ে যান। এটি প্রমাণ করে যে, নবি সা. তাঁর জীবনের শুরু থেকেই আরবের সামাজিক কাঠামোর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং তিনি সাধারণ মানুষের মতোই জন্মগত ও শৈশবকালীন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছেন।

তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম বিতর্ক রয়েছে। কিছু মুহাদ্দিস মনে করেন, এই বর্ণনাটিও সম্পূর্ণভাবে প্রমাণিত নয়। কিন্তু জন্মগত খতনার তুলনায় এই বর্ণনাটি অধিক যুক্তিযুক্ত, কারণ এটি নবিজির মানবিয় সত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করে। খতনার এই প্রক্রিয়াটি কেবল একটি শারীরিক অস্ত্রোপচার ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন আরবে একটি 'রাইট অফ প্যাসেজ' (Rite of Passage), যা শিশুকে শৈশব থেকে পরবর্তী স্তরে উত্তরণের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে চিহ্নিত করত। আব্দুল মুত্তালিবের এই পদক্ষেপ নবিজির জীবনের সেই স্বাভাবিক মানবিয় প্রবাহেরই অংশ ছিল।

জিবরাঈল আ. এর হস্তক্ষেপ ও আধ্যাত্মিক পবিত্রতা (Metaphysical Purification)

একটি তৃতীয় এবং অত্যন্ত রহস্যময় মতবাদ হলো, নবি সা. এর খতনা কোনো মানবিয় হস্ত দ্বারা নয়, বরং ফেরেশতা জিবরাঈল আ. এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছিল। এই মতবাদটি মূলত নবিজির হৃদয়ের পবিত্রতা বা 'শাক্কুস সদর' (বক্ষ বিদারণ) প্রক্রিয়ার সাথে সংযুক্ত। বলা হয় যে, যখন জিবরাঈল আ. নবিজির হৃদয় থেকে কালো অংশটি অপসারণ করে সেখানে ঈমান ও হিকমত স্থাপন করেন, ঠিক সেই সময়েই তাঁর শারীরিক পবিত্রতা বা খতনা সম্পন্ন করা হয়। এই বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে:

وأن جبريل ختنه حين طهر قلبه [3] এই দৃষ্টিভঙ্গিটি খতনাকে কেবল একটি শারীরিক প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখে একটি আধ্যাত্মিক রূপান্তর হিসেবে উপস্থাপন করে। এখানে শারীরিক খতনা এবং আধ্যাত্মিক পবিত্রতাকে একীভূত করা হয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে, নবিজির শরীর এবং আত্মা উভয়ই আল্লাহর বিশেষ তত্ত্বাবধানে ছিল। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁর শারীরিক অপবিত্রতা দূর করা এবং তাঁকে নবুওয়াতের জন্য প্রস্তুত করার একটি স্বর্গীয় পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়েছিল।

তবে এই মতবাদটিও ঐতিহাসিকভাবে বিতর্কিত। অনেক গবেষক মনে করেন, এটি মূলত নবিজির প্রতি অতি-ভক্তির বহিঃপ্রকাশ এবং এর কোনো শক্তিশালী সনদ বা সূত্র নেই। তবুও, আধ্যাত্মিক গবেষণায় এই মতটি গুরুত্ব পায় কারণ এটি নবিজির জীবনের সেই অলৌকিক দিকগুলোকে ফুটিয়ে তোলে যা সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে। শারীরিক খতনার সাথে হৃদয়ের পবিত্রতার এই সংযোগটি নবিজির জীবনের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে কিছু গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, যদিও তা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়নি।

খতনার সংজ্ঞা এবং ঐতিহাসিক ও ফিকহী সমন্বয়

খতনার প্রকৃত অর্থ এবং এর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে হলে তৎকালীন চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং ফিকহী সংজ্ঞার দিকে তাকাতে হবে। ইমাম মাওয়ার্দী এবং অন্যান্য ফকীহগণ খতনার একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা প্রদান করেছেন, যা নবিজির খতনার আলোচনাতেও প্রাসঙ্গিক। খতনার সংজ্ঞা সম্পর্কে বলা হয়েছে:

خِتَانُ الذَّكر قطعُ الجِلْدَة التي تُغَطِّي الحَشَفة [4] এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, খতনা হলো পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগের চামড়া অপসারণ করা। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এটি কেবল একটি ধর্মীয় বিধান ছিল না, বরং এটি ছিল স্বাস্থ্যবিধি এবং পরিচ্ছন্নতার একটি অংশ। নবি সা. এর খতনার বিষয়ে যে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে, তা মূলত তাঁর জীবনের দুটি বিপরীতমুখী দিকের সংঘাত: একদিকে তাঁর 'মুজিজা' বা অলৌকিকতা এবং অন্যদিকে তাঁর 'বাশারিয়াত' বা মানবিয় সত্তা। যারা জন্মগত খতনার কথা বলেন, তারা অলৌকিকতাকে প্রাধান্য দেন; আর যারা আব্দুল মুত্তালিবের খতনার কথা বলেন, তারা তাঁর মানবিয় সত্তাকে প্রাধান্য দেন।

গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য সীরাত লেখক এবং মুহাদ্দিসীন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, নবিজির খতনার বিষয়ে কোনো একক বর্ণনা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত (Sahih) নয়। তবে যৌক্তিক দিক থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে, তিনি আরবের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী খতনার মধ্য দিয়ে গেছেন। কারণ, ইসলামে খতনা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত এবং ইব্রাহিম আ. এর ঐতিহ্যের অংশ। নবি সা. যদি জন্মগতভাবে খতনার অধিকারী হতেন, তবে তিনি ইব্রাহিম আ. এর সেই সুন্নাহর বাস্তব অনুসরণ এবং প্রদর্শনের সুযোগ পেতেন না। সুতরাং, আব্দুল মুত্তালিবের সপ্তম দিনের আনুষ্ঠানিকতাটিই ঐতিহাসিকভাবে এবং যৌক্তিকভাবে অধিক গ্রহণযোগ্য।

নাভি কর্তনের বিষয়টি খতনার মতোই একটি স্বাভাবিক জন্মগত প্রক্রিয়া। যদিও সীরাতের প্রধান গ্রন্থগুলোতে নাভি কর্তন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা নেই, তবে এটি ধরে নেওয়া হয় যে, তৎকালীন দাইয়া বা ধাত্রীদের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছিল। নবিজির জন্মের সময় যে অলৌকিক নূর বা আলোর বর্ণনা পাওয়া যায়, তা তাঁর আধ্যাত্মিক উচ্চতাকে নির্দেশ করে, কিন্তু তাঁর শারীরিক জন্ম এবং প্রাথমিক যত্নগুলো ছিল সম্পূর্ণ মানবিয়। এই সমন্বয়ই নবি মুহাম্মাদ সা. কে পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যিনি একইসাথে আল্লাহর প্রেরিত রাসুল এবং রক্ত-মাংসের মানুষ।

""
৯.৫ খতনা ও নাভি কর্তন: জন্মগত অবস্থা (Born Circumcised) বনাম আব্দুল মুত্তালিবের সপ্তম দিনের আনুষ্ঠানিকতা
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

৯.৫ খতনা ও নাভি কর্তন: জন্মগত অবস্থা (Born Circumcised) বনাম আব্দুল মুত্তালিবের সপ্তম দিনের আনুষ্ঠানিকতা কুইজ

1 / 5

নবি সা.-এর খতনা বিষয়ে সবচেয়ে অধিকতর গ্রহণযোগ্য এবং যৌক্তিক মত কোনটি?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...