খণ্ড 79
ফন্ট:100%
থিম:

১৪.৪ প্রাচ্যবিদদের দাবি: 'সুদ নিষিদ্ধকরণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (Economic Growth) বাধাগ্রস্ত করে'— এর আধুনিক খণ্ডন

ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে প্রাচ্যবিদ (Orientalists) এবং ধ্রুপদী পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদদের একটি প্রধান ও বহুল প্রচলিত দাবি হলো— সুদের (Riba) অনুপস্থিতি বা সুদ নিষিদ্ধকরণ একটি দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধিকে (Economic Growth) স্থবির করে দিতে পারে। তাদের যুক্তি হলো, সুদের মাধ্যমে পুঁজির সহজলভ্যতা নিশ্চিত হয় এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি নিশ্চিত মুনাফার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়, যা শিল্পায়ন ও বাণিজ্যের চাকা সচল রাখে। তবে, এই দাবিটি কেবল একটি সংকীর্ণ অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন নয়, বরং এটি ইসলামের মৌলিক অর্থনৈতিক দর্শন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কাঠামোর প্রতি এক চরম অবজ্ঞা। এই প্রবন্ধে আমরা প্রাচ্যবিদদের এই ভ্রান্ত ধারণার তাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক এবং প্রায়োগিক খণ্ডন উপস্থাপন করব।

ইসলামি অর্থনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি: খিলাফত ও সম্পদের মালিকানা

প্রাচ্যবিদদের এই দাবিটি খণ্ডন করার জন্য প্রথমেই ইসলামের 'খিলাফত' বা প্রতিনিধিত্বের ধারণাটি অনুধাবন করা অপরিহার্য। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সম্পদের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিস্বাধীন, যা প্রায়শই সম্পদের চরম কেন্দ্রীকরণ ঘটায়। পক্ষান্তরে, ইসলামে সম্পদের প্রকৃত মালিকানা মহান আল্লাহর এবং মানুষ কেবল তার প্রতিনিধি বা আমানতদার (Trustee) হিসেবে সম্পদ ব্যবহারের অধিকার রাখে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন:

﴿ وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً[1]

[2]

এই 'ইস্তিখলাফ' বা প্রতিনিধিত্বের ধারণাটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। যখন একজন মানুষ নিজেকে সম্পদের মালিক মনে করে, তখন সে সুদের মাধ্যমে অন্যের শ্রম ও প্রয়োজনকে শোষণ করে নিজের সম্পদ বৃদ্ধি করতে চায়। কিন্তু যখন সে নিজেকে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে গণ্য করে, তখন তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্য হয় 'ইবাদত' এবং সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। প্রাচ্যবিদরা মনে করেন, সুদের মাধ্যমে পুঁজি সঞ্চয় করা হয়, কিন্তু ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে সুদের মাধ্যমে পুঁজি সঞ্চয় নয়, বরং পুঁজির 'স্থবিরতা' (Stagnation) তৈরি হয়। কারণ, সুদী কারবারি পুঁজিকে উৎপাদনশীল খাতে (Productive Sector) বিনিয়োগ করার পরিবর্তে ঋণের চক্রে আবদ্ধ করে ফেলে, যা প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্তরায়।

ইসলামি শরিয়াহর লক্ষ্য বা 'মাকাসিদ আল-শরিয়াহ' (Maqasid al-Shari'ah) অনুযায়ী, উপার্জনের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। কেবল মুনাফা অর্জনই লক্ষ্য নয়, বরং উপার্জনের প্রক্রিয়াটি হতে হবে নৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্যপূর্ণ। শরিয়াহর বিধান অনুযায়ী, সুদ (Riba), একচেটিয়া কারবার (Ihtikar) এবং সম্পদ মজুদ করা (Kanz al-Mal) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

المبحث الرابع: ضوابط الكسب، حيث تطرقت إلى بعض الأخلاق الإسلامية في الكسب كحرمة الربا، والاحتكار، وكنز المال...

[3]

প্রাচ্যবিদদের দাবি যে সুদ প্রবৃদ্ধি বাড়ায়, তা মূলত 'অসৎ উপার্জনের' (Illicit Gain) একটি কৌশল মাত্র। সুদভিত্তিক প্রবৃদ্ধি আসলে একটি 'ভ্রান্ত প্রবৃদ্ধি' (Artificial Growth), যা প্রকৃত সম্পদ বা উৎপাদন বৃদ্ধির পরিবর্তে কেবল ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি করে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সুদী ব্যবস্থার ধ্বংসাত্মক প্রভাব

প্রাচ্যবিদদের এই তাত্ত্বিক দাবির বিপরীতে ইতিহাসের পাতায় সুদী ব্যবস্থার ধ্বংসাত্মক প্রভাব স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। পুঁজিবাদী ও সুদী ব্যবস্থার উত্থান কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করেছে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে, তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ইউরোপের শিল্প বিপ্লব পরবর্তী প্রেক্ষাপট। ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, সুদের হার ও মুদ্রাস্ফীতির পরিবর্তন কীভাবে সমাজের নিম্নবিত্তকে ধ্বংস করে দেয়, তা অত্যন্ত ভয়াবহ।

উদাহরণস্বরূপ, ইংল্যান্ডের ১৫৩৬ সালের একটি আইনের কথা উল্লেখ করা যায়, যা সুদের হার পরিবর্তন করে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। এই পরিবর্তনটি মূলত শিল্পপতি ও বড় ব্যবসায়ীদের স্বার্থে করা হয়েছিল, কিন্তু এর ফলে সৃষ্ট মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ শ্রমিক ও কৃষকদের জন্য চরম দুর্ভোগ বয়ে আনে। ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, এই সময়ে ভাড়ার হার ১০০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং খাদ্যের দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল।

وأفادت التجارة والصناعة من قانون صدر عام 1536 يغير أسعار الفائدة بواقع 10 في المائة. وكان ارتفاع الأثمان السريع في صالح المشروع وبمثابة عقاب حكم به على العمال والفلاحين واللوردات الإقطاعيين من النمط القديم.

[4]

এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, সুদের হার নিয়ন্ত্রণ বা পরিবর্তন করার মাধ্যমে যে 'প্রবৃদ্ধি'র দাবি করা হয়, তা মূলত একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির (Elite Class) সম্পদ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ নয় বরং অভিশাপ। যখন সুদের হার বৃদ্ধি পায় বা মুদ্রাস্ফীতি ঘটে, তখন ঋণের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর এমনভাবে চেপে বসে যে তারা দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হয়। ঐতিহাসিক টমাস স্টার (Thomas Star) তৎকালীন সামাজিক অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছিলেন যে, দারিদ্র্য এতটাই প্রকট ছিল যে তা সমাজের যেকোনো প্রকৃত কল্যাণ বা সমৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

প্রাচ্যবিদরা যে প্রবৃদ্ধির কথা বলেন, তা মূলত 'পুঁজিবাদের অপকর্ষ' (Corruption of Capitalism) দ্বারা চালিত। তারা দেখান যে, সুদের মাধ্যমে পুঁজি দ্রুত সঞ্চিত হয়, কিন্তু তারা এই বিষয়টি এড়িয়ে যান যে, এই সঞ্চিত পুঁজি কীভাবে সামাজিক বৈষম্য ও অস্থিরতা তৈরি করে। সুদী ব্যবস্থা মূলত 'ঝুঁকি স্থানান্তর' (Risk Transfer) করে, যেখানে ঋণগ্রহীতা সমস্ত ঝুঁকি বহন করে এবং ঋণদাতা কোনো ঝুঁকি ছাড়াই নিশ্চিত মুনাফা পায়। এটি অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করে এবং একটি 'ঋণ-নির্ভর অর্থনীতি' (Debt-based Economy) তৈরি করে, যা যেকোনো সময় ধসে পড়ার জন্য প্রস্তুত থাকে।

আধুনিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ: ঝুঁকি বণ্টন বনাম ঝুঁকি শোষণ

আধুনিক অর্থনৈতিক তত্ত্বে প্রাচ্যবিদদের দাবি খণ্ডন করার জন্য 'ঝুঁকি বণ্টন' (Risk Sharing) এবং 'ঝুঁকি শোষণ' (Risk Transfer)-এর মধ্যকার পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুদী ব্যবস্থায় ঋণদাতা কোনো ব্যবসায়িক ঝুঁকি গ্রহণ করে না; সে কেবল তার অর্থের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মুনাফা দাবি করে, চাই ব্যবসায় লাভ হোক বা ক্ষতি। এটি মূলত একটি শোষণমূলক প্রক্রিয়া। অন্যদিকে, ইসলামি অর্থনৈতিক মডেল—যা মূলত মুদারাবাহ (Mudarabah) এবং মুশারাকাহ (Musharakah)-এর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত—সেখানে পুঁজি এবং শ্রম উভয় পক্ষই ব্যবসায়িক ঝুঁকি ও লাভের অংশীদার হয়।

প্রাচ্যবিদদের দাবি যে সুদ প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে, তা মূলত ভুল ধারণা। প্রকৃতপক্ষে, সুদ প্রবৃদ্ধিকে 'অস্থিতিশীল' (Volatile) করে তোলে। যখন একটি অর্থনীতি সুদের ওপর নির্ভরশীল হয়, তখন তা প্রকৃত উৎপাদনশীলতা (Real Productivity) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে 'ফাইন্যান্সিয়ালাইজেশন' (Financialization) বা আর্থিক খাতের অস্বাভাবিক বিস্তার ঘটে, যেখানে টাকা দিয়ে টাকা বানানোই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু পণ্য বা সেবা উৎপাদন গৌণ হয়ে পড়ে।

ইসলামি অর্থনীতিতে মুদ্রার মান ও ঋণের পরিশোধযোগ্যতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। মুদ্রার মানের পরিবর্তন কীভাবে ঋণের ওপর প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে ইসলামি ফিকহ শাস্ত্র অত্যন্ত সুক্ষ্ম বিশ্লেষণ প্রদান করেছে।

تغير قيمة النقود وأثره في سداد الدين في الإسلام | مجلد 1 | صفحة 46

[5]

সুদী ব্যবস্থায় মুদ্রাস্ফীতি ঘটলে ঋণদাতার প্রকৃত মূল্য কমে যায়, আবার অনেক ক্ষেত্রে ঋণের বোঝা ঋণগ্রহীতাকে নিঃস্ব করে দেয়। ইসলামি অর্থনীতিতে এই ভারসাম্য রক্ষার জন্য সুদের পরিবর্তে 'সম্পদ-ভিত্তিক লেনদেন' (Asset-backed transactions) নিশ্চিত করা হয়। এতে করে অর্থ কেবল কাগজের নোট বা সংখ্যায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব সম্পদ বা সেবার সাথে যুক্ত থাকে। ফলে মুদ্রাস্ফীতি বা অর্থনৈতিক মন্দার সময়ও অর্থনীতিতে একটি স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।

পরিশেষে বলা যায়, প্রাচ্যবিদদের দাবিটি একটি একপাক্ষিক ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। তারা প্রবৃদ্ধিকে কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক বা জিডিপি (GDP) বৃদ্ধির মাপকাঠিতে বিচার করেন, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি কতটা ন্যায়সংগত, কতটা টেকসই এবং তা সমাজের কত শতাংশ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে—তা তাদের বিবেচনার বাইরে। ইসলামি অর্থনৈতিক মডেল প্রবৃদ্ধিকে কেবল সংখ্যায় নয়, বরং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার মাপকাঠিতে বিচার করে। সুদের পরিবর্তে ঝুঁকি বণ্টন ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণ করাই হলো ইসলামের মূল লক্ষ্য, যা প্রাচ্যবিদদের ভ্রান্ত ধারণাকে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক উভয় দিক থেকেই অসার প্রমাণ করে।

""
১৪.৪ প্রাচ্যবিদদের দাবি: 'সুদ নিষিদ্ধকরণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (Economic Growth) বাধাগ্রস্ত করে'— এর আধুনিক খণ্ডন
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১৪.৪ প্রাচ্যবিদদের দাবি: 'সুদ নিষিদ্ধকরণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (Economic Growth) বাধাগ্রস্ত করে'— এর আধুনিক খণ্ডন কুইজ

1 / 5

প্রাচ্যবিদ এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদদের একটি প্রধান দাবি কী?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...