৩.৪.১ কুনূতে নাযিলা: এক মাসব্যাপী ফজরের সালাতে কুরাইশ ও বিশ্বাসঘাতক গোত্রের বিরুদ্ধে প্রার্থনা
বিশ্বঘাতকতার চরম সীমা: বি’র মাউনা ও রাজী ট্র্যাজেডির ক্ষত
ইসলামি ইতিহাসের চতুর্থ হিজরির সফর মাসে সংঘটিত বি’র মাউনা এবং রাজী ট্র্যাজেডি ছিল মদিনার নবগঠিত ইসলামি রাষ্ট্রের জন্য এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কা। উহুদ যুদ্ধের পরবর্তী নাজুক পরিস্থিতিতে যখন মুসলিম উম্মাহ নিজেদের পুনর্গঠন করছিল, ঠিক তখনই আরবের কুচক্রী ও বিশ্বাসঘাতক গোত্রগুলো এক সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে। বনু আমির গোত্রের নেতা আবু বারা আমিরের আমন্ত্রণে এবং তার দেওয়া নিরাপত্তার আশ্বাসে রাসুলুল্লাহ সা. সত্তরজন বিশিষ্ট সাহাবিকে, যাঁরা মূলত ‘কুররা’ বা কুরআনের হাফেজ ও শিক্ষক ছিলেন, নজদ অভিমুখে প্রেরণ করেন [1] । কিন্তু পথিমধ্যে বি’র মাউনা নামক স্থানে পৌঁছালে আবু বারার ভ্রাতুষ্পুত্র আমের বিন তুফাইল চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে। সে বনু সুলাইমের উপগোত্র—রিল, জাকওয়ান ও উসাইয়াকে সাথে নিয়ে এই নিরস্ত্র ও শান্তিকামী শিক্ষক দলটিকে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে নির্মমভাবে হত্যা করে [2] ।
এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের সমসাময়িক কালেই সংঘটিত হয় রাজী ট্র্যাজেডি। সেখানেও বনু লিহয়ান গোত্র চরম বিশ্বাসঘাতকতার আশ্রয় নিয়ে দশজন বিশিষ্ট সাহাবির একটি দলকে অবরুদ্ধ করে এবং তাঁদের কয়েকজনকে নির্মমভাবে হত্যা করে ও বাকিদের মক্কার কুরাইশদের নিকট বিক্রি করে দেয় [3] । এই দুটি ঘটনা কেবল সামরিক বিপর্যয় ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন আরবের প্রচলিত ‘যৌথ নিরাপত্তা’ ও ‘দূতের নিরাপত্তা’ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক রীতিনীতির চরম লঙ্ঘন। মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রের জন্য এটি ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি, কারণ শাহাদাতবরণকারী এই সত্তরজন সাহাবি ছিলেন ইসলামি দাওয়াহ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ মেরুদণ্ড। এই নির্মম ট্র্যাজেডি মদিনার ঘরে ঘরে গভীর শোকের ছায়া ফেলে এবং রাসুলুল্লাহ সা. এর পবিত্র হৃদয়কে এক অভূতপূর্ব বেদনায় ভারাক্রান্ত করে তোলে।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই বিশ্বাসঘাতকতা কেবল মদিনার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলেনি, বরং আরবের অন্যান্য গোত্রগুলোর কাছে এই বার্তা প্রেরণ করেছিল যে, মুসলিমদেরকে যেকোনো চুক্তির বাইরে গিয়েও আক্রমণ করা সম্ভব। এই মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় ও সার্বভৌমত্বের সংকট থেকে উত্তরণের জন্য এবং উম্মাহর মনোবল চাঙ্গা করতে এক অভিনব ও আধ্যাত্মিক প্রতিরোধের প্রয়োজন ছিল। রাসুলুল্লাহ সা. এই সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কেবল সামরিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করেননি, বরং তিনি ঐশী দরবারে এক অনন্য আধ্যাত্মিক ফরিয়াদ পেশ করার সিদ্ধান্ত নেন, যা ইতিহাসে ‘কুনূতে নাযিলা’ নামে সুপরিচিত।
কুনূতে নাযিলার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও হাদিসের বিবরণ
বি’র মাউনা ও রাজীর এই মর্মন্তুদ সংবাদ যখন মদিনায় পৌঁছায়, তখন রাসুলুল্লাহ সা. এতটাই ব্যথিত হন যে, তাঁর সীরাতকারগণ উল্লেখ করেছেন, উহুদ যুদ্ধের ক্ষতের চেয়েও এই বিশ্বাসঘাতকতার ক্ষত তাঁর হৃদয়ে গভীরতর প্রভাব ফেলেছিল। এই চরম সংকটের মুহূর্তে রাসুলুল্লাহ সা. আল্লাহর দরবারে রোনাজারি ও ফরিয়াদের মাধ্যমে এক অভিনব কূটনৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিবাদের সূচনা করেন। তিনি টানা এক মাস ধরে প্রতিদিন ফরয সালাতে, বিশেষ করে ফজরের সালাতে রুকুর পর দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে সেই বিশ্বাসঘাতক গোত্রগুলোর নাম ধরে অভিশাপ দেন এবং মক্কায় বন্দী ও নির্যাতিত দুর্বল মুসলিমদের মুক্তির জন্য প্রার্থনা করেন [4] ।
হাদিসের বিশুদ্ধ গ্রন্থসমূহে এই কুনূতের বিবরণ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। হযরত আনাস বিন মালিক রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সা. বি’র মাউনার শহীদদের শোকে এক মাসব্যাপী ফজরের সালাতে রিল, জাকওয়ান ও উসাইয়া গোত্রের বিরুদ্ধে কুনূত পাঠ করেছিলেন। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত ইবারতটি নিম্নরূপ:
অনুবাদ:
“হে আল্লাহ! আপনি রিল, জাকওয়ান ও উসাইয়া গোত্রের ওপর লানত বা অভিশাপ বর্ষণ করুন; কেননা তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্যতা করেছে।” [5] । এই দোয়ার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. কেবল তাদের পার্থিব পরাজয়ই কামনা করেননি, বরং তাদের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দেউলিয়াত্বকে উম্মাহর সামনে উন্মোচিত করেছিলেন। একই সাথে তিনি মক্কার কুরাইশদের হাতে বন্দী থাকা অসহায় মুসলিমদের জন্য নাম ধরে ধরে দোয়া করতেন, যা উম্মাহর পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সা. যখনই কারো বিরুদ্ধে বা পক্ষে দোয়া করতে চাইতেন, তখন রুকুর পর সেজদায় যাওয়ার পূর্বে কুনূত পড়তেন। তিনি বলতেন:
অনুবাদ:
“হে আল্লাহ! আপনি ওয়ালিদ বিন ওয়ালিদ, সালামাহ বিন হিশাম, আইয়াশ বিন আবু রাবিয়াহ এবং মক্কার অন্যান্য দুর্বল মুমিনদেরকে কাফেরদের নির্যাতন থেকে মুক্তি দিন।” [6] । এই ধারাবাহিক প্রার্থনা কেবল একটি ইবাদত ছিল না, বরং এটি ছিল মদিনার রাষ্ট্রীয় মঞ্চ থেকে মক্কার কুরাইশ ও তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যা প্রতিদিন পাঁচবার মুসলিমদের হৃদয়ে জিহাদী জযবা ও মজলুম ভাইদের প্রতি সহমর্মিতার আগুন জ্বালিয়ে রাখত [7] ।
ঐশী বাণীর অবতরণ ও কুনূতের রূপান্তর
রাসুলুল্লাহ সা. এর এই এক মাসব্যাপী অবিরাম অভিশাপ ও প্রার্থনা যখন মদিনার আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, তখন ইসলামি শরীয়তের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনকারী ঐশী বাণী অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর রাসুলের এই তীব্র ক্ষোভ ও বেদনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি উম্মাহর জন্য এক চিরন্তন নীতি নির্ধারণ করে দেন। রাসুলুল্লাহ সা. যখন কুরাইশদের কতিপয় নেতার নাম ধরে (যেমন আবু সুফিয়ান, হারিস বিন হিশাম, সুহাইল বিন আমর) অভিশাপ দিচ্ছিলেন, তখন আল্লাহ তাআলা সূরা আল-ইমরানের ১২৮ নম্বর আয়াতটি নাযিল করেন [8] । আয়াতে ইরশাদ হয়েছে:
অনুবাদ:
“(হে রাসুল!) এ বিষয়ে আপনার কোনো করণীয় বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই; আল্লাহ চাইলে তাদের তাওবা কবুল করতে পারেন অথবা তাদের শাস্তি দিতে পারেন, কারণ তারা সীমালঙ্ঘনকারী।” [9] । এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ সা. নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নাম ধরে অভিশাপ দেওয়া বন্ধ করে দেন [10] ।
এই ঐশী হস্তক্ষেপের গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও তাত্ত্বিক তাৎপর্য রয়েছে। প্রথমত, এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামে চূড়ান্ত ফয়সালা ও সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর। এমনকি আল্লাহর রাসুল সা. ও নিজের ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে কারও চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক পরিণতি নির্ধারণ করতে পারেন না। দ্বিতীয়ত, এই আয়াতের দূরদর্শী সত্যতা পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছিল, যখন অভিশপ্ত কুরাইশ নেতাদের অনেকেই (যেমন হারিস বিন হিশাম ও সুহাইল বিন আমর) পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলামের একনিষ্ঠ খাদেমে পরিণত হন। এই রূপান্তরটি উম্মাহকে শিক্ষা দেয় যে, চরম শত্রুর বিরুদ্ধেও প্রার্থনার ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখা বজায় রাখতে হবে, যাতে তাদের হেদায়েতের পথ রুদ্ধ না হয়ে যায়। তবে সামষ্টিক অত্যাচারী ও চুক্তিভঙ্গকারী গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে সাধারণ অভিশাপ ও মজলুমদের জন্য দোয়া করার বিধানটি শরীয়তে কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী রূপ লাভ করে।
ভূ-রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: যৌথ নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ঘোষণা
কুনূতে নাযিলাকে কেবল একটি ধর্মীয় আচার বা প্রার্থনা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করা সম্ভব নয়। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ভূ-রাজনীতির আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ‘কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকৌশল’ (Psychological Warfare)। উহুদ যুদ্ধের পর আরবের বেদুইন গোত্রগুলো মনে করেছিল যে, মদিনার সামরিক শক্তি ভেঙে পড়েছে। এই সুযোগে তারা মদিনার দূত ও শিক্ষকদের হত্যা করে নিজেদের বীরত্ব প্রকাশ করতে চেয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সা. যদি এই ঘটনার পর নীরব থাকতেন, তবে তা মদিনার রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা হিসেবে প্রকাশ পেত এবং অন্যান্য গোত্রগুলোও মদিনার ওপর চড়াও হওয়ার সাহস পেত [11] ।
প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে, বিশেষ করে ফজরের জামাতে শত শত সাহাবির উপস্থিতিতে এই কুনূতের উচ্চকণ্ঠ উচ্চারণ মদিনার সমাজকে একীভূত ও ইস্পাতকঠিন সংকল্পে আবদ্ধ করেছিল। এটি ছিল অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টে সাহাবিদের মনোবল চাঙ্গা রাখার এক অনন্য মনস্তাত্ত্বিক দাওয়াই। এর মাধ্যমে সাহাবিদের মনে এই বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছিল যে, তাঁদের ভাইদের রক্ত বৃথা যায়নি; স্বয়ং আল্লাহর দরবারে এর বিচার চাওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, মদিনার বাইরে এই খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল যে, মদিনার নবি সা. এবং তাঁর অনুসারীরা এই বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করছেন। আরবের কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে নবির মুখের অভিশাপকে অত্যন্ত ভয়ংকর মনে করা হতো। ফলে, এই কুনূতের কারণে বিশ্বাসঘাতক গোত্রগুলোর মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, যা তাদের পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখে [12] ।
তাছাড়া, মক্কায় বন্দী থাকা অসহায় মুসলিমদের নাম ধরে ধরে দোয়া করার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছিলেন। তা হলো—মদিনা রাষ্ট্র তার নাগরিকদের এবং তার আদর্শের অনুসারীদের যেখানেই থাকুক না কেন, ভুলে যায় না। এটি ছিল আধুনিক ‘যৌথ নিরাপত্তা’ (Collective Security) এবং ‘নাগরিক সুরক্ষা’ (Citizen Protection) নীতির এক প্রাচীন ও চমৎকার বাস্তব রূপ। মক্কার বন্দীরা যখন জানতে পেরেছিল যে, মদিনার মসজিদে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সা. তাঁদের নাম ধরে দোয়া করছেন, তখন তাঁদের ঈমানী শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং তাঁরা কাফেরদের অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করার নতুন শক্তি পেয়েছিলেন [13] ।
ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা: উম্মাহর সংকটে কুনূতের ভূমিকা
কুনূতে নাযিলার এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ইসলামি ফিকহের ইতিহাসে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছে। উম্মাহর যেকোনো চরম সংকটে, যুদ্ধবিগ্রহে, মহামারী বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে কুনূতে নাযিলা পাঠ করার বৈধতা ও নিয়মাবলী নিয়ে ফকীহগণের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী—চার মাযহাবের ইমামগণই একমত যে, যখনই মুসলিম উম্মাহ কোনো বড় ধরনের বিপদের সম্মুখীন হবে, তখনই কুনূতে নাযিলা পাঠ করা সুন্নাত [14] । তবে এর প্রয়োগ ও পদ্ধতি নিয়ে সামান্য মতপার্থক্য রয়েছে।
ইমাম শাফেয়ী রহ. এর মতে, কুনূতে নাযিলা কেবল ফজরের সালাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যেকোনো ফরয সালাতেই উম্মাহর সংকটে এটি পাঠ করা যায় [15] । অন্যদিকে, হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, সাধারণত ফজরের সালাতে জাহরী বা উচ্চস্বরে কিরাআত পড়ার পর রুকু থেকে উঠে এই দোয়া করতে হয়। ফকীহগণ কুনূতে নাযিলার স্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সা. এর আমলকে প্রাধান্য দিয়েছেন। হাফেয ইবনে হাজার আল-আসকালানী রহ. কুনূতে নাযিলার স্থান সম্পর্কে অত্যন্ত চমৎকার একটি হিকমত বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:
অনুবাদ:
“আমার নিকট এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, সেজদার স্থানটি দোয়ার কবুলিয়তের জন্য অধিক উপযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও কুনূতে নাযিলাকে রুকু থেকে ওঠার পর (ই’তিদালে) নির্ধারণ করার হিকমত হলো—যাতে মুক্তাদীগণ ইমামের দোয়ার সাথে আমীন বলার মাধ্যমে সরাসরি শরিক হতে পারেন।” [16] । এই ফিকহী বিশ্লেষণটি প্রমাণ করে যে, কুনূতে নাযিলা কেবল একক কোনো প্রার্থনা নয়, বরং এটি উম্মাহর সামষ্টিক ঐক্যের এক জীবন্ত বহিঃপ্রকাশ।
সমকালীন বিশ্বে যখনই মুসলিম উম্মাহ ফিলিস্তিন, কাশ্মীর বা বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে চরম নির্যাতন, গণহত্যা ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়, তখন কুনূতে নাযিলার প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে সামনে আসে। এটি কেবল একটি দোয়া নয়, বরং এটি বিশ্ব মুসলিমের পারস্পরিক সহমর্মিতা ও বৈশ্বিক সংহতির এক আধ্যাত্মিক মাধ্যম। আধুনিক যুগের গবেষক শেখ আহমদ আল-জুমান তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, কুনূতে নাযিলা উম্মাহর অবচেতন মনকে জাগ্রত রাখে এবং তাদেরকে বৈশ্বিক মজলুম ভাইদের দুঃখ-কষ্টের সাথে একাত্ম হতে শেখায় [17] । রাসুলুল্লাহ সা. এর এই সুন্নাহটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, যখনই উম্মাহর কোনো অংশ আক্রান্ত হবে, তখন সমগ্র উম্মাহকে তার পাশে দাঁড়াতে হবে—সামরিক, কূটনৈতিক এবং সর্বোপরি আধ্যাত্মিক ফরিয়াদের মাধ্যমে।