খণ্ড 38
ফন্ট:100%
থিম:

২.২.১ আসেম ইবনে সাবিত (রা.): ঈমানী দৃঢ়তার পর্বত ও তাঁর শেষ প্রার্থনা

আর্টিকেলের বিষয়বস্তু

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বীরত্বগাথা: আসেম ইবনে সাবিত (রা.)

ইসলামের ইতিহাসে উহুদ যুদ্ধ-পরবর্তী সময়কালটি ছিল অত্যন্ত নাজুক এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। মক্কার কুরাইশ এবং মদিনার আশপাশের বিভিন্ন গোত্রগুলোর মধ্যে মদিনা রাষ্ট্রকে অবরুদ্ধ ও দুর্বল করার এক অঘোষিত প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল। এই জটিল রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে যেসকল সাহাবি নিজেদের ঈমানী দৃঢ়তা, সামরিক প্রজ্ঞা এবং আপসহীন তাওহীদি চেতনার মাধ্যমে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন আনসার গোত্রের বিশিষ্ট বীর হযরত আসেম ইবনে সাবিত (রা.)। তিনি ছিলেন মদিনার আউস গোত্রের বনু আমর ইবনে আউফ শাখার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং ইসলামের ইতিহাসে "হামিউদ দাবার" (বোলতা বা মৌমাছি দ্বারা সুরক্ষিত ব্যক্তি) হিসেবে সুপরিচিত।

১. আসেম ইবনে সাবিত (রা.)-এর প্রাথমিক পরিচিতি ও উহুদ যুদ্ধের বীরত্ব

হযরত আসেম ইবনে সাবিত (রা.) ছিলেন মদিনার প্রথম সারির আনসার সাহাবিদের অন্যতম। রাসুলুল্লাহ সা. যখন মদিনায় হিজরত করেন, তখন থেকেই আসেম (রা.) ইসলামের প্রতিরক্ষায় নিজেকে উৎসর্গ করেন। তিনি বদর এবং উহুদ উভয় যুদ্ধে অত্যন্ত বীরত্বের সাথে অংশগ্রহণ করেছিলেন। উহুদ যুদ্ধে তাঁর বীরত্ব কুরাইশদের হৃদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। বিশেষ করে, কুরাইশদের অন্যতম প্রভাবশালী নারী সুলাফা বিনতে সা’দ-এর দুই পুত্র মুসাফি’ এবং জুলাসকে তিনি অত্যন্ত নিখুঁত ধনুর্বিদ্যার মাধ্যমে হত্যা করেন

[1]

সুলাফা বিনতে সা’দ তার দুই পুত্রের মৃত্যুর পর শোকে ও ক্ষোভে উন্মত্ত হয়ে পড়ে। সে মক্কায় এই মর্মে এক ভয়াবহ মানত বা প্রতিজ্ঞা করে যে, যে ব্যক্তি আসেম ইবনে সাবিতের মাথা কেটে এনে দিতে পারবে, তাকে সে একশত উট পুরস্কার দেবে। শুধু তাই নয়, সে প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, আসেমের মাথার খুলিতে সে মদ পান করবে। এই পৈশাচিক মানতের কথা মক্কার কুরাইশ এবং মদিনার চারপাশের মুশরিক গোত্রগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আসেম (রা.)-এর মাথা কুরাইশদের কাছে একটি অত্যন্ত মূল্যবান এবং লোভনীয় বস্তুতে পরিণত হয়

[2]

আসেম ইবনে সাবিত (রা.) তাঁর জীবদ্দশায় একটি কঠোর প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। তিনি আল্লাহর কাছে অঙ্গীকার করেছিলেন যে, তিনি কখনো কোনো মুশরিককে স্পর্শ করবেন না এবং কোনো মুশরিককেও তাঁর শরীর স্পর্শ করতে দেবেন না। এটি কেবল একটি শারীরিক দূরত্বের বিষয় ছিল না, বরং এটি ছিল তাওহীদি আকিদার এক চরম বহিঃপ্রকাশ, যেখানে শিরকের সাথে কোনো প্রকার আপস বা স্পর্শের সুযোগ ছিল না। তাঁর এই পবিত্র ও আপসহীন মনোভাবকে আল্লাহ তাআলা পরবর্তীতে এক অলৌকিক পন্থায় রক্ষা করেছিলেন, যা সীরাতের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়

[3]

২. রাজী অভিযানের ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রেক্ষাপট

হিজরি চতুর্থ সালের সফর মাসে (মে, ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ) সংঘটিত রাজী অভিযানটি ছিল মূলত একটি গভীর ষড়যন্ত্রের ফসল। উহুদ যুদ্ধের পর মদিনা রাষ্ট্রের সামরিক শক্তিকে দুর্বল মনে করে আশপাশের গোত্রগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। বনু লিহয়ান গোত্র, যারা কুরাইশদের মিত্র ছিল, তারা রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে একটি প্রতিনিধি দল পাঠায়। তারা দাবি করে যে, তাদের গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করতে আগ্রহী এবং তাদের দ্বীন ও কুরআন শেখানোর জন্য যেন মদিনা থেকে কিছু যোগ্য শিক্ষক পাঠানো হয়। এটি ছিল মূলত একটি সুপরিকল্পিত ফাঁদ, যার উদ্দেশ্য ছিল মদিনার প্রথম সারির সাহাবিদের বন্দি করে কুরাইশদের কাছে চড়া মূল্যে বিক্রি করা অথবা হত্যা করা

[4]

রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর দূরদর্শী রাজনৈতিক ও সামরিক প্রজ্ঞার অংশ হিসেবে দশজন সাহাবির একটি দল গঠন করেন। এই দলের নেতৃত্ব বা আমির হিসেবে নিযুক্ত করা হয় হযরত আসেম ইবনে সাবিত (রা.)-কে। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় এটিকে একটি "Intelligence and Security Mission" বা গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা মিশন হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। রাসুলুল্লাহ সা. এই দলটিকে মূলত মক্কার কুরাইশদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং বনু লিহয়ান গোত্রের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পাঠিয়েছিলেন। এই অভিযানের কৌশলগত গুরুত্ব ছিল অপরিসীম, কারণ মদিনার যৌথ নিরাপত্তা (Collective Security) বজায় রাখার জন্য কুরাইশদের গতিবিধির আগাম তথ্য পাওয়া অত্যন্ত জরুরি ছিল

[5]

সাহাবিদের এই ক্ষুদ্র দলটি যখন মক্কা ও উসফানের মধ্যবর্তী "রাজী" নামক একটি পানির কূপের কাছে পৌঁছান, তখন বনু লিহয়ান গোত্রের বিশ্বাসঘাতকতা প্রকাশ পেয়ে যায়। তারা প্রায় দুইশত সশস্ত্র তীরন্দাজ নিয়ে সাহাবিদের অবরুদ্ধ করে ফেলে। এই অতর্কিত আক্রমণ এবং চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আসেম ইবনে সাবিত (রা.) তাঁর সামরিক নেতৃত্ব ও ঈমানী দৃঢ়তার পরিচয় দেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, আত্মসমর্পণ করার অর্থ হলো কুরাইশদের দাসত্ব ও অবমাননা মেনে নেওয়া, যা একজন মুমিনের আত্মমর্যাদার পরিপন্থী

[6]

৩. বনু লিহয়ানের বিশ্বাসঘাতকতা এবং রাজী প্রান্তরে অবরুদ্ধ আসেম

বনু লিহয়ানের দুইশত সশস্ত্র তীরন্দাজ যখন আসেম (রা.) এবং তাঁর সঙ্গীদের ঘিরে ফেলে, তখন তারা সাহাবিদের উদ্দেশে ঘোষণা করে, "তোমরা যদি নিচে নেমে আস এবং আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করো, তবে আমরা অঙ্গীকার করছি যে তোমাদের কাউকেই হত্যা করব না।" এটি ছিল একটি চরম মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা। একদিকে নিশ্চিত মৃত্যু অথবা বন্দিত্ব, অন্যদিকে কুরাইশদের কাছে বিক্রির আশঙ্কা। কিন্তু আসেম ইবনে সাবিত (রা.) মুশরিকদের এই কপট প্রতিশ্রুতি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন:

«أَمَّا أَنَا فَلاَ أَنْزِلُ فِي ذِمَّةِ كَافِرٍ»

অর্থাৎ, "আমি অন্তত কোনো কাফেরের প্রতিশ্রুতি বা আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দেব না"

[7]। তাঁর এই অকুতোভয় ঘোষণা তাঁর সাথে থাকা অন্যান্য সাহাবিদের মধ্যেও শাহাদাতের তামান্না জাগ্রত করে তোলে।

আসেম (রা.) তাঁর ধনুক থেকে তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করেন এবং বীরত্বের সাথে লড়াই চালিয়ে যান। বনু লিহয়ানের তীরন্দাজরা দূর থেকে অনবরত তীর বর্ষণ করতে থাকে। এই অসম যুদ্ধে আসেম (রা.) এবং তাঁর সাতজন সঙ্গী বীরত্বের সাথে লড়াই করে শাহাদাত বরণ করেন। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী তাঁর 'ফাতহুল বারী' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, আসেম (রা.)-এর এই প্রতিরোধ ছিল মূলত ইসলামের আত্মমর্যাদা ও তাওহীদি আকিদার এক চরম পরাকাষ্ঠা, যেখানে তিনি জীবনের বিনিময়ে হলেও মুশরিকদের কাছে মাথা নত করেননি

[8]

এই অবরুদ্ধ অবস্থায় আসেম (রা.) তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোতে আল্লাহর দরবারে এক ঐতিহাসিক প্রার্থনা করেছিলেন। তিনি জানতেন যে তাঁর মৃত্যু আসন্ন এবং মুশরিকরা তাঁর মৃতদেহ নিয়ে বিকৃত করবে, বিশেষ করে সুলাফা বিনতে সা’দের সেই পৈশাচিক মানত পূর্ণ করার জন্য তাঁর মাথা কেটে নিয়ে যাওয়া হবে। এই চরম সংকটে তিনি আল্লাহর কাছে তাঁর পবিত্রতা ও মৃতদেহের সুরক্ষার জন্য ফরিয়াদ জানান, যা পরবর্তীতে এক অলৌকিক ঘটনার জন্ম দেয়

[9]

৪. আসেম ইবনে সাবিত (রা.)-এর ঐতিহাসিক শপথ ও শেষ প্রার্থনা

শাহাদাতের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে, যখন আসেম (রা.) তীরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত এবং তাঁর শরীর অবশ হয়ে আসছিল, তখন তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর দরবারে তাঁর শেষ আকুতি পেশ করেন। তাঁর এই প্রার্থনা ছিল অত্যন্ত গভীর এবং ঈমানী আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন:

«اللَّهُمَّ أَخْبِرْ عَنَّا رَسُولَكَ»

অর্থাৎ, "হে আল্লাহ! আমাদের এই পরিস্থিতির খবর আপনার রাসুলের কাছে পৌঁছে দিন"

[10]। তিনি চেয়েছিলেন যেন মদিনায় রাসুলুল্লাহ সা. জানতে পারেন যে তাঁর সাহাবিরা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ঈমানের ওপর অবিচল ছিলেন এবং কোনো বিশ্বাসঘাতকতার কাছে মাথা নত করেননি।

একই সাথে তিনি তাঁর সেই আজীবনের শপথ স্মরণ করে আল্লাহর কাছে তাঁর মৃতদেহ সুরক্ষার জন্য প্রার্থনা করেন। তিনি বলেছিলেন, "হে আল্লাহ! আমি আপনার দ্বীনের সুরক্ষায় আমার জীবন উৎসর্গ করেছি। আজ আমার এই মৃতদেহকে মুশরিকদের স্পর্শ থেকে রক্ষা করুন।" তিনি আল্লাহর কাছে তাঁর শরীরের পবিত্রতা রক্ষার জন্য যে আকুল আবেদন করেছিলেন, তা সীরাত গ্রন্থগুলোতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বর্ণিত হয়েছে:

«اللَّهُمَّ إِنِّي حَمَيْتُ دِينَكَ أَوَّلَ النَّهَارِ، فَاحْمِ لَحْمِي وَعِظَامِي آخِرَهُ»

অর্থাৎ, "হে আল্লাহ! আমি দিনের প্রথমাংশে (আমার জীবনে) আপনার দ্বীনকে রক্ষা করেছি, অতএব আপনি দিনের শেষাংশে (আমার মৃত্যুর পর) আমার গোশত ও হাড়কে রক্ষা করুন"

[11]

আল্লাহ তাআলা তাঁর এই মুখলিস বান্দার প্রার্থনা তাৎক্ষণিকভাবে কবুল করেছিলেন। একদিকে জিবরাঈল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে মদিনায় রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে রাজী প্রান্তরের এই মর্মান্তিক ও বীরত্বপূর্ণ ঘটনার খবর পৌঁছে দেওয়া হয়, অন্যদিকে আসেম (রা.)-এর পবিত্র মৃতদেহকে মুশরিকদের অপবিত্র হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এক অলৌকিক ঐশ্বরিক প্রাচীর গড়ে তোলা হয়

[12]

৫. অলৌকিক ঐশ্বরিক সুরক্ষা: বোলতা ও বৃষ্টির পানির অলৌকিক ঘটনা

আসেম ইবনে সাবিত (রা.)-এর শাহাদাতের পর বনু লিহয়ান এবং কুরাইশদের প্রেরিত দূতেরা তাঁর মৃতদেহের কাছে আসে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল আসেমের মাথা কেটে মক্কায় সুলাফা বিনতে সা’দের কাছে নিয়ে যাওয়া এবং সেই বিশাল পুরস্কারের অর্থ ও উটগুলো দাবি করা। কিন্তু তারা যখনই আসেম (রা.)-এর পবিত্র দেহের দিকে অগ্রসর হতে চাইল, তখনই এক অলৌকিক ঘটনার অবতারণা হলো। হঠাৎ করেই কোথা থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বোলতা, মৌমাছি এবং বিষাক্ত কীটপতঙ্গ (الزنابير أو الدبر) এসে আসেম (রা.)-এর মৃতদেহকে মেঘের মতো ঢেকে ফেলল

[13]

মুশরিকরা যতবারই তাঁর দেহের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, এই বিষাক্ত বোলতাগুলো তাদের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছিল। কোনোভাবেই তারা আসেম (রা.)-এর দেহের স্পর্শ সীমানায় পৌঁছাতে পারছিল না। অবশেষে তারা সিদ্ধান্ত নিল, "এখন ছেড়ে দাও, রাতের বেলা যখন বোলতাগুলো চলে যাবে, তখন আমরা তাঁর মাথা কেটে নেব।" কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। রাতের অন্ধকার নেমে আসার সাথে সাথেই আকাশ ভেঙে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। মরুভূমির সেই শুষ্ক উপত্যকায় এমন আকস্মিক ও তীব্র বন্যা (السيل) সৃষ্টি হলো যা সচরাচর দেখা যায় না। সেই বন্যার পানি আসেম (রা.)-এর পবিত্র দেহকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল এমন এক অজ্ঞাত স্থানে, যেখানে কোনো মুশরিকের পক্ষে পৌঁছানো সম্ভব ছিল না

[14]

এই অলৌকিক ঘটনার পর থেকে আসেম (রা.)-কে ইসলামের ইতিহাসে "حمِيُّ الدَّبْرِ" (বোলতা দ্বারা সুরক্ষিত ব্যক্তি) উপাধিতে ভূষিত করা হয়। মদিনায় যখন এই অলৌকিক সুরক্ষার খবর পৌঁছায়, তখন হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে একটি ঐতিহাসিক উক্তি করেছিলেন, যা ইমাম বুখারী তাঁর গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন:

«يَحْفَظُ اللَّهُ الْعَبْدَ الْمُؤْمِنَ بَعْدَ وَفَاتِهِ كَمَا حَفِظَهُ فِي حَيَاتِهِ»

অর্থাৎ, "আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দাকে মৃত্যুর পরেও ঠিক তেমনিভাবে রক্ষা করেন, যেভাবে তিনি তাকে তাঁর জীবদ্দশায় রক্ষা করেছিলেন"

[15]। আসেম (রা.)-এর এই অলৌকিক সুরক্ষা প্রমাণ করে যে, আল্লাহর পথে উৎসর্গীকৃত বান্দাদের সম্মান ও মর্যাদা স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজেই রক্ষা করেন।

৬. আসেম (রা.)-এর শাহাদাতের রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

আসেম ইবনে সাবিত (রা.)-এর শাহাদাত এবং তাঁর মৃতদেহের অলৌকিক সুরক্ষার ঘটনাটি মদিনার মুসলিম সমাজ এবং মক্কার কুরাইশদের মধ্যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছিল। কুরাইশদের জন্য এটি ছিল একটি বড় ধরনের নৈতিক পরাজয়। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, মুসলমানদের কেবল শারীরিকভাবে হত্যা করা সম্ভব হলেও তাদের ঈমানী চেতনা এবং আল্লাহর সাথে তাদের আত্মিক সম্পর্ককে কোনোভাবেই পরাস্ত করা সম্ভব নয়। সুলাফা বিনতে সা’দের সেই দম্ভ ও পৈশাচিক মানত চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যায়, যা কুরাইশদের আভিজাত্য ও অহংকারে এক বড় আঘাত ছিল

[16]

মদিনার মুসলমানদের জন্য এই ঘটনাটি ছিল একদিকে শোকের, অন্যদিকে চরম গৌরব ও অনুপ্রেরণার। আসেম (রা.)-এর শেষ প্রার্থনা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তার তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়া সাহাবিদের ঈমানী শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। এটি প্রমাণ করেছিল যে, বাহ্যিক পরাজয় বা শাহাদাত আসলে কোনো পরাজয় নয়, বরং এটি আল্লাহর দরবারে এক পরম বিজয়। এই ঘটনাটি মদিনা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামূলক কূটনীতি এবং গোয়েন্দা তৎপরতাকে আরও জোরদার করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল, যার ফলে পরবর্তীতে মুসলমানরা শত্রুদের যেকোনো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আরও বেশি সতর্ক ও প্রস্তুত হতে পেরেছিল

[17]

আসেম ইবনে সাবিত (রা.)-এর এই মহান আত্মত্যাগ ইসলামের ইতিহাসে ঈমানী দৃঢ়তা, আনুগত্য এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের এক চিরন্তন প্রতীক হিসেবে রয়ে গেছে। তাঁর জীবন ও শাহাদাত আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকারে অবিচল থাকলে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই অনন্য মর্যাদায় ভূষিত করেন। রাজী প্রান্তরের এই রক্তক্ষয়ী অধ্যায়টি ইসলামের ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করছে।

""
২.২.১ আসেম ইবনে সাবিত (রা.): ঈমানী দৃঢ়তার পর্বত ও তাঁর শেষ প্রার্থনা
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

২.২.১ আসেম ইবনে সাবিত (রা.): ঈমানী দৃঢ়তার পর্বত ও তাঁর শেষ প্রার্থনা কুইজ

1 / 5

আসেম ইবনে সাবিত (রা.)-কে কিসের সাথে তুলনা করা হয়েছে?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...