১০.৫ আবু সুফিয়ানের মদিনা সফর এবং কুরাইশদের রাজনৈতিক বশ্যতা (Political Assimilation)
ইসলামি ইতিহাসের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বসম্পন্ন অধ্যায় হলো হুদায়বিয়ার সন্ধির পরবর্তী পরিস্থিতি এবং কুরাইশদের পক্ষ থেকে সেই সন্ধি ভঙ্গের পর আবু সুফিয়ানের মদিনা সফর। এটি কেবল একজন ব্যক্তির সফর ছিল না, বরং এটি ছিল মক্কী অভিজাত শ্রেণির চরম অসহায়তা এবং মদিনা রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের এক বাস্তব প্রতিফলন। কুরাইশরা যখন তাদের মিত্র বনু বকরের মাধ্যমে খুজায়াহ গোত্রের ওপর আক্রমণ চালিয়ে হুদায়বিয়ার সন্ধি লঙ্ঘন করল, তখন তারা বুঝতে পেরেছিল যে তারা এক ভয়াবহ কূটনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে। এই সংকট নিরসনে এবং মদিনা রাষ্ট্রের সাথে পুনরায় কোনো সমঝোতা বা সন্ধির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য তারা তাদের তৎকালীন প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আবু সুফিয়ান বিন হারবকে প্রেরণ করে। এই সফরটি ছিল মূলত একটি 'ডেস্পারেট ডিপ্লোম্যাসি' বা মরিয়া কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, যার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে মক্কাকে রক্ষা করা এবং মদিনার সাথে পুনরায় কোনো শর্তসাপেক্ষ শান্তি স্থাপন করা [1] ।
কুরাইশদের কূটনৈতিক মরিয়া চেষ্টা এবং মদিনার রাজনৈতিক পরিবেশ
আবু সুফিয়ান যখন মদিনার অভিমুখে যাত্রা করেন, তখন তার মনে এই আশা ক্ষীণ হয়ে আসছিল যে তিনি নবি সা. এর কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাবেন। কুরাইশদের বিশ্বাসঘাতকতা এবং খুজায়াহ গোত্রের ওপর তাদের নির্মম আক্রমণ মদিনার মুসলিম সমাজে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। খুজায়াহর প্রতিনিধি দল যখন মদিনায় পৌঁছে তাদের ওপর হওয়া জুলুমের বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করল, তখন মদিনার রাজনৈতিক পরিবেশ কুরাইশদের জন্য চরম প্রতিকূল হয়ে উঠেছিল। আবু সুফিয়ান মদিনায় প্রবেশ করার পর লক্ষ্য করলেন যে, শহরের প্রতিটি স্তরে কুরাইশদের প্রতি তীব্র ঘৃণা এবং ক্রোধ বিরাজ করছে। তিনি নিজেকে মদিনার বুকে একজন একাকী এবং পরিত্যক্ত মানুষ হিসেবে অনুভব করলেন, যেখানে কোনো মানুষই তাকে হাসিমুখে গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল না [2] ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আবু সুফিয়ানের এই সফর ছিল কুরাইশদের 'পলিটিক্যাল সারভাইভাল' বা রাজনৈতিক টিকে থাকার লড়াই। তারা জানত যে, মদিনা রাষ্ট্র এখন আর আগের মতো দুর্বল নয়; বরং তারা এখন আরবের এক প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আবু সুফিয়ান চেয়েছিলেন নবি সা. এর সাথে এমন এক সমঝোতা করতে যা কুরাইশদের জন্য একটি 'জেনারেল অ্যামনেস্টি' বা সাধারণ ক্ষমা হিসেবে কাজ করবে। তবে মদিনার তৎকালীন মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতি ছিল এমন যে, কোনো ধরনের আপস বা সমঝোতা মুসলিমদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। খুজায়াহর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা কেবল একটি চুক্তি ভঙ্গ ছিল না, বরং এটি ছিল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি চরম নৈতিক পতন, যা মদিনা রাষ্ট্র কোনোভাবেই উপেক্ষা করতে প্রস্তুত ছিল না [3] ।
আবু সুফিয়ানের এই কূটনৈতিক ব্যর্থতার মূলে ছিল কুরাইশদের এই ভুল ধারণা যে, তারা কেবল কিছু উপঢৌকন বা মৌখিক প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে নবি সা. এর মন পরিবর্তন করতে পারবে। কিন্তু নবি সা. এর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং ন্যায়বিচারের নীতি ছিল অটল। তিনি জানতেন যে, বিশ্বাসঘাতকদের সাথে পুনরায় সন্ধি করা মানে হবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দুর্বলতা প্রদর্শন করা। ফলে আবু সুফিয়ান মদিনায় এসে এক চরম শূন্যতার সম্মুখীন হন, যেখানে তার রাজনৈতিক প্রভাব এবং বংশীয় মর্যাদা কোনো কাজে আসেনি [4] ।
আম্মুল মুমিনীন উম্মু হাবিবা রা. এবং আদর্শিক সংঘাত
মদিনায় প্রবেশের পর আবু সুফিয়ান যে প্রথম এবং সবচেয়ে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কাটি পান, তা ছিল তার নিজের কন্যা, মুমিন নারী উম্মু হাবিবা রা. এর আচরণে। উম্মু হাবিবা রা. ছিলেন নবি সা. এর পবিত্র পত্নী এবং একজন দৃঢ় ঈমানদার নারী। আবু সুফিয়ান যখন তার কন্যার ঘরে প্রবেশ করলেন এবং নবি সা. এর বিছানায় বসতে চাইলেন, তখন উম্মু হাবিবা রা. অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তাকে বাধা দিলেন এবং বিছানাটি গুটিয়ে নিলেন যাতে একজন মুশরিক ব্যক্তি সেখানে বসতে না পারে। এই ঘটনাটি কেবল পারিবারিক বিবাদ ছিল না, বরং এটি ছিল ঈমান এবং কুফর, সত্য এবং মিথ্যার এক চূড়ান্ত সংঘাত। আবু সুফিয়ান অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে প্রশ্ন করলেন:
অর্থাৎ, "হে আমার কন্যা! আমি কি বুঝতে পারছি যে তুমি আমাকে এই বিছানা থেকে দূরে সরিয়ে দিলে, নাকি তুমি এই বিছানাকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে নিলে?" [5] ।
উম্মু হাবিবা রা. এর উত্তর ছিল অত্যন্ত সাহসী এবং আদর্শিক। তিনি স্পষ্ট করে বললেন:
অর্থাৎ, "বরং এটি রাসুলুল্লাহ সা. এর বিছানা এবং আপনি একজন মুশরিক অপবিত্র ব্যক্তি; আমি চাইনি যে আপনি রাসুলুল্লাহ সা. এর বিছানায় বসুন" [6] ।
এই কথোপকথনটি আবু সুফিয়ানের মনে এক গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি বুঝতে পারলেন যে, তার কন্যা এখন আর কেবল তার কন্যা নন, বরং তিনি এক মহান সত্যের অনুসারী, যার কাছে রক্তের সম্পর্কের চেয়ে আকিদাহ বা বিশ্বাসের গুরুত্ব অনেক বেশি। উম্মু হাবিবা রা. তাকে মনে করিয়ে দিলেন যে, তিনি মক্কার নেতা হয়েও একটি পাথরের পূজা করছেন যা শুনতে পায় না এবং দেখতে পায় না। এই মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় আবু সুফিয়ানকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয় এবং তাকে উপলব্ধি করতে বাধ্য করে যে, মদিনার মুসলিমরা এখন আদর্শিক দিক থেকে কতটা শক্তিশালী এবং অবিচল [7] ।
নবি সা. এর সাথে আলোচনা এবং কূটনৈতিক চালের ব্যর্থতা
কন্যার কাছ থেকে পাওয়া চরম মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কার পর আবু সুফিয়ান শেষ চেষ্টা হিসেবে নবি সা. এর সাথে সরাসরি আলোচনায় বসেন। তার লক্ষ্য ছিল হুদায়বিয়ার সন্ধির মেয়াদ বাড়ানো এবং নতুন করে কোনো নিশ্চয়তা লাভ করা। তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করলেন যেন তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই সন্ধির সাথে যুক্ত ছিলেন না এবং এখন একজন নেতা হিসেবে শান্তি স্থাপন করতে এসেছেন। তিনি নবি সা. কে উদ্দেশ্য করে বললেন:
অর্থাৎ, "হে মুহাম্মাদ! আমি হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় অনুপস্থিত ছিলাম, তাই আপনি এই অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ় করুন এবং এর মেয়াদ বৃদ্ধি করুন" [8] ।
নবি সা. এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা আবু সুফিয়ানের এই কূটকৌশলকে মুহূর্তেই নস্যাৎ করে দিল। তিনি সরাসরি প্রশ্ন করলেন যে, কুরাইশদের পক্ষ থেকে কোনো চুক্তি ভঙ্গ করা হয়েছে কি না। আবু সুফিয়ান অত্যন্ত ধৃষ্টতার সাথে তা অস্বীকার করলেন এবং দাবি করলেন যে তারা তাদের অঙ্গীকারে অটল। এই মিথ্যা দাবির বিপরীতে নবি সা. অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু গম্ভীর ভাষায় উত্তর দিলেন:
অর্থাৎ, "আমরা হুদায়বিয়ার দিনের আমাদের মেয়াদ এবং সন্ধির ওপরই অটল আছি, আমরা তা পরিবর্তন বা পরিমার্জন করব না" [9] ।
নবি সা. এর এই সংক্ষিপ্ত উত্তরটি ছিল একটি রাজনৈতিক বার্তা। তিনি আবু সুফিয়ানকে কোনো প্রকার আশ্বাস দিলেন না এবং কোনো নতুন শর্ত গ্রহণে রাজি হলেন না। এর মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়ে গেল যে, মদিনা রাষ্ট্র এখন আর কুরাইশদের সাথে কোনো আপস করতে আগ্রহী নয়। আবু সুফিয়ান যখন দেখলেন যে নবি সা. এর কাছ থেকে কোনো প্রকার ছাড় পাওয়া সম্ভব নয়, তখন তিনি চরম হতাশ হয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন। তার এই ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে, সত্যের সামনে মিথ্যার কূটকৌশল কখনোই জয়ী হতে পারে না [10] ।
সাহাবায়ে কেরামের মধ্যস্থতা লাভের ব্যর্থ প্রচেষ্টা
নবি সা. এর কাছ থেকে প্রত্যাশিত ফল না পেয়ে আবু সুফিয়ান তার রাজনৈতিক কৌশল পরিবর্তন করেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি মদিনার প্রভাবশালী মুহাজিরদের সাথে যোগাযোগ করবেন, যারা কুরাইশ বংশের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক রাখেন। তিনি আশা করেছিলেন যে, তাদের মধ্যস্থতায় নবি সা. এর মনে কোনো পরিবর্তন আসতে পারে। তিনি প্রথমে আবু বকর সিদ্দীক রা. এর কাছে যান এবং তাকে অনুরোধ করেন যেন তিনি নবি সা. এর কাছে সুপারিশ করেন। কিন্তু আবু বকর রা. কুরাইশদের অপরাধের ভয়াবহতা জানতেন, তাই তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বললেন, "আমি তা করব না" [11] ।
এরপর তিনি উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর কাছে যান। উমর রা. এর কঠোরতা এবং মুশরিকদের প্রতি তার তীব্র ঘৃণা আবু সুফিয়ানের জন্য এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। উমর রা. তাকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বললেন:
অর্থাৎ, "আল্লাহর কসম! আমি যদি কেবল ক্ষুদ্র পিঁপড়াও পেতাম, তবে তা দিয়ে তোমাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতাম" [12] ।
আবু সুফিয়ান অত্যন্ত মর্মাহত হয়ে বললেন, "তুমি তোমার আত্মীয়র প্রতি চরম মন্দ আচরণ করলে।" এরপর তিনি উসমান বিন আফফান রা. এর কাছে যান, কারণ উসমান রা. বনু উমাইয়া গোত্রের সদস্য ছিলেন এবং আবু সুফিয়ানের সাথে তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। তিনি উসমান রা. কে অনুরোধ করলেন যেন তিনি সন্ধির মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করেন। কিন্তু উসমান রা. অত্যন্ত নম্রভাবে তাকে প্রত্যাখ্যান করে বললেন, "আমি রাসুলুল্লাহ সা. এর আশ্রয়ে আছি" [13] ।
সবশেষে তিনি আলি ইবনে আবি তালিব রা. এবং নবি সা. এর কন্যা ফাতিমা রা. এর কাছে যান। তিনি আলির সাথে তার আত্মীয়তার সম্পর্ককে সামনে এনে সুপারিশ চাইলেন। আলি রা. তাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন যে, রাসুলুল্লাহ সা. এখন এমন এক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে সেখানে কারো কথা বলার সুযোগ নেই। তিনি বললেন, "রাসুলুল্লাহ সা. এমন এক সংকল্প করেছেন যে তিনি তা করবেন না, এবং তিনি যা অপছন্দ করেন সে বিষয়ে কেউ কথা বলতে পারে না" [14] ।
চূড়ান্ত আবেদন এবং রাজনৈতিক বশ্যতার সূচনা
আবু সুফিয়ানের শেষ ভরসা ছিল ফাতিমা রা.। তিনি ফাতিমা রা. কে অনুরোধ করলেন যেন তিনি তার পিতার কাছে সুপারিশ করেন। তিনি এমনকি আবু আল-আস বিন রবী'র উদাহরণ টেনে আনেন, যাকে ফাতিমা রা. এর সুপারিশে নবি সা. আশ্রয় দিয়েছিলেন। কিন্তু ফাতিমা রা. অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বললেন, "আমি কেবল একজন নারী, এই সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ রাসুলুল্লাহ সা. এর হাতে" [15] ।
আবু সুফিয়ানের এই দীর্ঘ এবং ব্যর্থ প্রচেষ্টা মদিনার রাজনৈতিক বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। তিনি দেখলেন যে, মদিনার প্রতিটি স্তরে—তা হোক নবি সা., তার ঘনিষ্ঠ সাহাবিগণ কিংবা তার পরিবার—সবাই এক সূত্রে গাঁথা এবং তাদের লক্ষ্য অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। কুরাইশদের জন্য এখন আর কোনো কূটনৈতিক পথ খোলা নেই। আবু সুফিয়ানের এই ব্যর্থতা ছিল মূলত কুরাইশদের রাজনৈতিক পতনের সূচনা। তিনি যখন মদিনা ত্যাগ করে মক্কার দিকে রওনা হলেন, তখন তার মনে এই বিশ্বাস জন্মেছিল যে, মদিনা রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধের কোনো সম্ভাবনা নেই এবং একমাত্র উপায় হলো সম্পূর্ণ বশ্যতা স্বীকার করা [16] ।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আবু সুফিয়ানের মদিনা সফর ছিল একটি 'পলিটিক্যাল অ্যাসিমিলেশন' বা রাজনৈতিক একীভূতকরণের প্রারম্ভিক ধাপ। কুরাইশরা বুঝতে পেরেছিল যে, তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং বংশীয় অহংকার মদিনার ঈমানী শক্তির সামনে তুচ্ছ। উপঢৌকন বা আত্মীয়তার সম্পর্কের মাধ্যমে বশ্যতা স্বীকার করার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর, তারা বুঝতে পারে যে কেবল নিঃশর্ত আত্মসমর্পণই তাদের একমাত্র পথ। এটি ছিল মক্কী অভিজাত শ্রেণির মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় এবং মদিনা রাষ্ট্রের চূড়ান্ত বিজয়ের এক পূর্বাভাস [17] ।