খণ্ড 92
ফন্ট:100%
থিম:

১২.৫ জাস্টি ওয়ার (Just War Theory) এবং নববী সমরনীতি: প্রাচ্যবিদদের 'তলোয়ারের জোরে ইসলাম প্রসার' থিওরির ঐতিহাসিক অসারতা

জাস্টি ওয়ার থিওরি (Just War Theory) এবং নববী সমরনীতির তুলনামূলক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ


পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে যুদ্ধ ও শান্তির যৌক্তিকতা নিরূপণে 'জাস্টি ওয়ার থিওরি' (Just War Theory) বা 'ন্যায়যুদ্ধ তত্ত্ব' একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হয়। সিসারো, অগাস্টিন এবং থমাস অ্যাকুইনাসের হাত ধরে বিকশিত এই তত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো—যুদ্ধ কেবল তখনই বৈধ হতে পারে যখন তা কোনো সুনির্দিষ্ট ও ন্যায়সঙ্গত কারণে (Jus ad bellum) এবং যুদ্ধের ময়দানে মানবিক আচরণ ও সীমালঙ্ঘন না করার শর্তে (Jus in bello) পরিচালিত হয়। আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষকগণ যখন এই পশ্চিমা তত্ত্বের আলোকে সপ্তম শতকের নববী সমরনীতি বিশ্লেষণ করেন, তখন তারা এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক সামঞ্জস্য দেখতে পান। রাসুলুল্লাহ সা. যে সমরনীতি প্রণয়ন করেছিলেন, তা কেবল আধুনিক জাস্টি ওয়ার থিওরির সমকক্ষই ছিল না, বরং নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা এবং মানবিকতার দিক থেকে তা পশ্চিমা তত্ত্বের চেয়েও বহুগুণ উন্নত ও বাস্তবমুখী ছিল। নববী সমরনীতির মূল লক্ষ্য কখনোই ভূখণ্ড দখল বা রক্তপাত ছিল না, বরং এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের বিবেককে স্বাধীন করা এবং জুলুমের অবসান ঘটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।

ইসলামি সমরনীতির মূল ভিত্তি হলো আত্মরক্ষা এবং সত্য প্রচারের পথে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা দূর করা। যখন মক্কার কুরাইশ এবং তাদের মিত্র শক্তিগুলো ইসলামের দাওয়াতকে স্তব্ধ করতে এবং মুসলমানদের সমূলে নির্মূল করতে অস্ত্র ধারণ করেছিল, কেবল তখনই মুসলমানদের যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক সত্যটি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গবেষকগণ দেখিয়েছেন যে, ইসলামে তরবারি ধারণ করা হয়েছিল কেবল তখনই, যখন কুফরের পক্ষ থেকে তরবারি উত্তোলন করা হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক উৎসে উল্লেখ রয়েছে:


"ولكن حين قام الكفر بسل سيوفه ضد الإِسلام اضطر الإسلام أيضًا إلى رفع السيف، وهذه هي أصول الجهاد الإِسلامي التي لا تقبل تعديلاً أو نسخًا."

অর্থাৎ, "কিন্তু যখন কুফর ইসলামের বিরুদ্ধে তরবারি ধারণ করল, তখন ইসলামও তরবারি উত্তোলন করতে বাধ্য হলো। আর এটাই হলো ইসলামি জিহাদের মূলনীতি, যা কোনো পরিবর্তন বা রহিতকরণ গ্রহণ করে না।" [1] । এই নীতিটি আধুনিক 'Jus ad bellum' বা যুদ্ধ ঘোষণার ন্যায়সঙ্গত কারণের সাথে হুবহু মিলে যায়, যেখানে যুদ্ধকে কেবল চরম প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবেই গ্রহণ করা হয়।

তদুপরি, নববী সমরনীতিতে যুদ্ধের উদ্দেশ্যকে অত্যন্ত পবিত্র ও সুনির্দিষ্ট করা হয়েছিল। এটি কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভ, গোত্রীয় অহংকার বা লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত ছিল না। আল-খতিব তাঁর তাফসিরে প্রাচ্যবিদ ও ইসলামের শত্রুদের এই অপবাদের তীব্র জবাব দিয়েছেন যে, ইসলাম রক্তপাত ও হত্যার ধর্ম। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, ইসলামের যুদ্ধগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল শত্রুর আগ্রাসন প্রতিহত করা এবং দ্বীনের হেফাজত করা। এ প্রসঙ্গে মূল ইবারতটি প্রণিধানযোগ্য:


"يدافع الخطيب في تفسيره عن الشبهة القائمة في نفوس أعداء هذا الدين، وهي أن الإسلام دين قام على السيف والقتل وسفك الدماء، فالإسلام في حربه لأعدائه كان مقصوده..."

অর্থাৎ, "আল-খতিব তাঁর তাফসিরে এই দ্বীনের শত্রুদের মনে বিরাজমান এই সন্দেহের প্রতিবাদ করেছেন যে, ইসলাম এমন এক ধর্ম যা তরবারি, হত্যা ও রক্তপাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রকৃতপক্ষে, শত্রুদের বিরুদ্ধে ইসলামের যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল..." [2] । এটি স্পষ্ট করে যে, নববী সমরনীতিতে যুদ্ধ ছিল একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিক ব্যাধির অস্ত্রোপচারের মতো, যা কেবল সমাজদেহকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যই অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত উপায়ে প্রয়োগ করা হতো।

যুদ্ধের ময়দানে নববী সমরনীতির মানবিক দিকটি (Jus in bello) আরও বেশি উজ্জ্বল। রাসুলুল্লাহ সা. যুদ্ধের ময়দানে নারী, শিশু, বৃদ্ধ, উপাসনালয়ে রত সন্ন্যাসী এবং অসামরিক ব্যক্তিদের হত্যা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন। এমনকি যুদ্ধের চরম মুহূর্তেও তিনি মুসলমানদের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। উহুদ যুদ্ধের কঠিনতম পরিস্থিতিতে, যখন রাসুলুল্লাহ সা. নিজে গুরুতর আহত হয়েছিলেন এবং সাহাবিগণ চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তখনও তিনি আল্লাহর দরবারে উম্মাহর হেদায়েত ও ক্ষমার জন্য দোয়া করেছিলেন। উহুদ যুদ্ধের পর রাসুলুল্লাহ সা. সাহাবিদের নিয়ে যে প্রার্থনা করেছিলেন, তা তাঁর সমরনীতির আধ্যাত্মিক গভীরতা প্রমাণ করে:


"اللهم! لك الحمد كلّه. اللهم! لا قابض لما بسطت ولا باسط لما قبضت..."

অর্থাৎ, "হে আল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা কেবল আপনারই। হে আল্লাহ! আপনি যা প্রসারিত করেন তা সংকীর্ণ করার কেউ নেই, আর আপনি যা সংকীর্ণ করেন তা প্রসারিত করার কেউ নেই..." [3] । এই প্রার্থনা প্রমাণ করে যে, নববী সমরনীতি কেবল সামরিক বিজয়ের বস্তুগত লক্ষ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের আত্মিক সংশোধনের এক মহান মাধ্যম।

'তলোয়ারের জোরে ইসলাম প্রচার' তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ: প্রাচ্যবাদী বয়ানের ঐতিহাসিক ও যৌক্তিক অসারতা


ইউরোপীয় রেনেসাঁ এবং ঔপনিবেশিক যুগে পশ্চিমা প্রাচ্যবিদ (Orientalists) এবং ধর্মনিরপেক্ষ ইতিহাসবিদদের একটি বড় অংশ এই দাবি প্রচার করতে শুরু করে যে, ইসলাম মূলত তরবারির জোরে এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রসার লাভ করেছে। এই তত্ত্বটি কেবল ঐতিহাসিক সত্যের অপলাপই নয়, বরং তা ইসলামের মৌলিক ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোরও পরিপন্থী। পবিত্র কুরআনের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা হলো, ধর্মে কোনো জোরজবরদস্তি নেই। এই ঐশী মূলনীতিটি ইসলামের প্রচার ও প্রসারের মূল চালিকাশক্তি ছিল। ধর্মনিরপেক্ষ ও ইসলামবিদ্বেষী গবেষকদের এই স্ববিরোধী দাবিকে খণ্ডন করে ঐতিহাসিকগণ প্রশ্ন তুলেছেন যে, যদি ইসলাম তরবারির জোরেই প্রচারিত হয়ে থাকে, তবে কুরআনের এই অমোঘ বাণীর তাৎপর্য কী? এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক গ্রন্থে বলা হয়েছে:


"وأصحاب المناهج العلمانية يقولون: كيف أن الإسلام انتشر بحد السيف وقد قال سبحانه وتعالى في كتابه الكريم: {لا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ} [4] ؟ فكيف توفق بين هذا الأمر..."

অর্থাৎ, "ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের অনুসারীরা বলে থাকে: ইসলাম কীভাবে তরবারির জোরে প্রসারিত হলো, অথচ মহান আল্লাহ তাঁর পবিত্র গ্রন্থে বলেছেন: 'দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই' [5] ? তাহলে তোমরা কীভাবে এই দুই বিষয়ের মধ্যে সমন্বয় করবে?" [6] । এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে যে, প্রাচ্যবিদদের এই বয়ান ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং পক্ষপাতদুষ্ট।

ইসলামের এই অহিংস ও যৌক্তিক প্রসারের বিষয়টি কেবল মুসলিম ঐতিহাসিকগণই নন, বরং আধুনিক যুগের নিরপেক্ষ অমুসলিম গবেষকগণও সপ্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। মিশরের প্রখ্যাত কিবতি (Coptic Christian) গবেষক ও চিন্তাবিদ ড. নাবিল লুকা বাবাবি তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থে অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রমাণ করেছেন যে, ইসলাম তরবারির জোরে ছড়ায়নি। তাঁর এই গবেষণা পশ্চিমা ও ধর্মনিরপেক্ষ মহলে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে:


"الإسلام والسيف: فقد صدرت في مصر مؤخّرًا دراسة قبطيَّة للباحث المسيحي الدكتور/ نبيل لوقا بباوي، تحت عنوان "انتشار الإسلام بحدّ السَّيف بين الحقيقة..."

অর্থাৎ, "ইসলাম ও তরবারি: সম্প্রতি মিশরে খ্রিস্টান গবেষক ড. নাবিল লুকা বাবাবি কর্তৃক একটি কিবতি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে, যার শিরোনাম হলো 'সত্যের মুখোমুখি তরবারির জোরে ইসলামের প্রসার'..." [7] । ড. নাবিল তাঁর গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলো মুসলিম শাসনামলে সম্পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করত এবং জিজিয়া করের বিনিময়ে তাদের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্র গ্রহণ করত, যা বলপ্রয়োগের তত্ত্বকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দেয়।

ঐতিহাসিকভাবে এটি প্রমাণিত যে, রাসুলুল্লাহ সা. এবং তাঁর পরবর্তী খলিফাগণ যখন বিভিন্ন অঞ্চলে দূত প্রেরণ করতেন বা সামরিক অভিযান পরিচালনা করতেন, তখন তাদের প্রথম ও প্রধান প্রস্তাব থাকত ইসলামের দাওয়াত বা আদর্শিক আহ্বান। যদি কোনো জাতি ইসলাম গ্রহণ না-ও করত, তবে তাদের ওপর ধর্ম চাপিয়ে দেওয়া হতো না; বরং তাদের নিজস্ব ধর্মে থাকার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে কেবল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আনুগত্যের (জিজিয়া চুক্তির মাধ্যমে) প্রস্তাব দেওয়া হতো। আল-খতিব তাঁর গবেষণায় এই সত্যটি তুলে ধরেছেন যে, ইসলামের যুদ্ধগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা হরণকারী জালিম শাসকদের পতন ঘটানো, যাতে সাধারণ মানুষ কোনো ভয়ভীতি ছাড়া স্বাধীনভাবে সত্য পথ বেছে নিতে পারে। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:


"يدافع الخطيب في تفسيره عن الشبهة القائمة في نفوس أعداء هذا الدين، وهي أن الإسلام دين قام على السيف والقتل وسفك الدماء..."

অর্থাৎ, "আল-খতিব তাঁর তাফসিরে এই দ্বীনের শত্রুদের মনে বিরাজমান এই সন্দেহের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন যে, ইসলাম তরবারি ও রক্তপাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত..." [8] । সুতরাং, তরবারির জোরে ইসলাম প্রসারের তত্ত্বটি একটি ঐতিহাসিক মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়।

অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত তত্ত্বের অসারতা: ফিলিপ হিট্টি ও লিও ক্যাটানির মতবাদের খণ্ডন


যখন 'তরবারির জোরে ইসলাম প্রসার' তত্ত্বটি আধুনিক ঐতিহাসিক গবেষণার কষ্টিপাথরে টিকতে পারল না, তখন পশ্চিমা প্রাচ্যবিদদের একটি নতুন দল, যাদের মধ্যে লিও ক্যাটানি (Leone Caetani), সি. এইচ. বেকার (C.H. Becker) এবং ফিলিপ হিট্টি (Philip Hitti) অন্যতম, এক নতুন তত্ত্বের অবতারণা করলেন। তারা দাবি করলেন যে, ইসলামের প্রাথমিক বিজয়গুলো কোনো ধর্মীয় বা আদর্শিক প্রেরণা থেকে ঘটেনি, বরং তা ছিল আরব উপদ্বীপের চরম অর্থনৈতিক সংকট এবং জনসংখ্যাগত চাপের (Demographic Pressure) ফল। তাদের মতে, আরবের মরুভূমির রুক্ষতা ও সম্পদের অভাবের কারণে আরবরা উর্বর অর্ধচন্দ্রাকার অঞ্চলে (Fertile Crescent) আক্রমণ করতে বাধ্য হয়েছিল এবং খলিফা আবু বকর রা. ও উমর রা. মূলত গনিমতের মাল ও বৈষয়িক সম্পদের লোভ দেখিয়ে আরবদের যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক গ্রন্থে বলা হয়েছে:


"نتيجة لضغط الظروف، ثم وجود بديل ثالث، كان على الزردشتيين والبربر والترك اختياره (أي الإسلام)... وبدلاً من الحماس الديني فإن الضرورات الاقتصادية قد تفوقت لدى العرب على الحرب..."

অর্থাৎ, "পরিস্থিতির চাপে এবং তৃতীয় বিকল্পের উপস্থিতির কারণে জরথুস্ট্রীয়, বারবার ও তুর্কিদের ইসলাম গ্রহণ করতে হয়েছিল... এবং ধর্মীয় উদ্দীপনার পরিবর্তে অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তাই আরবদের যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিল..." [9] । ফিলিপ হিট্টি খলিফা আবু বকর রা. এর একটি চিঠিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে দাবি করেন যে, তিনি আরবদের কেবল গনিমতের লোভ দেখিয়েছিলেন।

তবে এই অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত তত্ত্বটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক এবং বাস্তবতাবিবর্জিত। প্রখ্যাত ইতালীয় প্রাচ্যবিদ ফ্রান্সিসকো গ্যাব্রিয়েলি (Francesco Gabrieli) নিজেই এই তত্ত্বের অসারতা প্রমাণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, ইসলাম আগমনের পর আরবে এমন কোনো জনসংখ্যা বিস্ফোরণ ঘটেনি যার কারণে তাদের দেশত্যাগ করতে হবে। তদুপরি, আরবরা বিজিত অঞ্চলের উর্বর ও বিলাসবহুল প্রাসাদে বসবাস করার চেয়ে তাদের প্রিয় মরুভূমিতে ফিরে যাওয়াকেই বেশি পছন্দ করত। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক নথিতে গ্যাব্রিয়েলির বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে:


"وقد أبطل المؤرخ فرانسسكو جبرائيل النظرية القائلة بالضغط السكاني الذي نتج عنه هجرة اقتصادية لأنه لا يوجد إثبات يدل على الزيادة في السكان منذ ذلك التاريخ..."

অর্থাৎ, "ঐতিহাসিক ফ্রান্সিসকো গ্যাব্রিয়েলি জনসংখ্যাগত চাপের কারণে অর্থনৈতিক হিজরতের এই তত্ত্বটিকে বাতিল করে দিয়েছেন, কারণ সেই সময় থেকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই..." [10] । তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, খলিফা উমর রা. এর শাসনামলে রাষ্ট্রীয় নীতিই ছিল এমন যে, আরবদের বিজিত অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস বা জমি ক্রয় করার অনুমতি দেওয়া হতো না, যাতে তাদের সামরিক ও নৈতিক চরিত্র নষ্ট না হয়।

প্রকৃতপক্ষে, সাহাবিদের যুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পরকালের মুক্তি, দুনিয়াবি সম্পদ বা গনিমত নয়। পারস্যের সেনাপতি রুস্তমের দরবারে প্রেরিত মুসলিম দূতদের বক্তব্য এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রুস্তম যখন মুসলমানদের অর্থ ও সম্পদের লোভ দেখিয়েছিলেন, তখন মুসলিম দূত অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, তারা দুনিয়ার সম্পদ চান না, বরং মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দাসত্বে নিয়ে আসাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে:


"فقد كان هدف الفتوحات في المقام الأول هو الجهاد الإِسلامي، وهو ما بدأ المستشرقون يعترفون به أيضًا، وعلى رأسهم جبرائيل..."

অর্থাৎ, "ইসলামি বিজয়ের মূল লক্ষ্য প্রথমত ও প্রধানত ছিল আল্লাহর পথে জিহাদ, যা আধুনিক প্রাচ্যবিদরাও স্বীকার করতে শুরু করেছেন, যাদের শীর্ষে রয়েছেন গ্যাব্রিয়েলি..." [11] । সুতরাং, ইসলামের বিজয়গুলোকে কেবল অর্থনৈতিক বা ভৌগোলিক সংকটের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করার অপচেষ্টা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

নববী সমরনীতির মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয়: আলেকজান্ডার ও চেঙ্গিস খানের সাম্রাজ্যবাদের সাথে বৈসাদৃশ্য


ইতিহাসের পাতায় বহু বিশ্ববিজেতার নাম স্বর্ণাক্ষরে বা রক্তাক্ষরে লেখা রয়েছে। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, চেঙ্গিস খান, হ্যানিবল কিংবা নেপোলিয়নের মতো সামরিক জেনারেলগণ তলোয়ারের জোরে বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু তাদের বিজয়ের সাথে ইসলামের বিজয়ের এক মৌলিক ও গুণগত পার্থক্য রয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্ববিজেতাদের বিজয় ছিল মূলত ভূখণ্ড দখল, রক্তপাত, লুণ্ঠন এবং বিজিত জাতির ওপর নির্মম আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। তারা মানুষের শরীর জয় করেছিলেন, কিন্তু মন জয় করতে পারেননি। তাদের চলে যাওয়ার সাথে সাথেই তাদের সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল। পক্ষান্তরে, নববী সমরনীতি এবং পরবর্তী ইসলামি বিজয়গুলো ছিল মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও মানবিক মুক্তির ইতিহাস। মুসলমানগণ বিজিত অঞ্চলের মানুষের ওপর কোনো জুলুম করেননি, বরং তাদের পূর্ববর্তী শাসকদের অর্থনৈতিক শোষণ ও সামাজিক বৈষম্য থেকে মুক্ত করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক তুলনামূলক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে:


"ولنقارن فتوحات فاتحي العالم مثل الإِسكندر وجنكيز وهني بال ونابليون وغيرهم بالفتوحات الإِسلامية... لقد أصابوا قلوب الناس بسيوفهم، ثم لم يضمدوا جراحها، لكن الفاتحين المسلمين حرروا الإِنسانية من عبودية الإِنسان..."

অর্থাৎ, "আসুন আমরা আলেকজান্ডার, চেঙ্গিস খান, হ্যানিবল এবং নেপোলিয়নের মতো বিশ্ববিজেতাদের বিজয়ের সাথে ইসলামি বিজয়ের তুলনা করি... তারা তাদের তরবারি দিয়ে মানুষের হৃদয়ে আঘাত করেছিলেন, কিন্তু তার ক্ষত উপশম করেননি। পক্ষান্তরে, মুসলিম বিজয়ীগণ মানবতাকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছিলেন..." [12]

ইসলামি বিজয়ের পর বিজিত অঞ্চলের মানুষ মুসলমানদের বিজয়ী হিসেবে নয়, বরং তাদের ত্রাণকর্তা (Saviors) হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিল। কারণ, মুসলমানরা সেখানে আইনের শাসন, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইসলামে কোনো বর্ণবাদ বা জাতিগত বৈষম্যের স্থান ছিল না। রাসুলুল্লাহ সা. বিদায় হজের ভাষণে যে বৈপ্লবিক ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম মানবাধিকারের সনদ। এ প্রসঙ্গে 'মওসুআতু محاسন আল-ইসলাম' গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে:


"حدد الإسلام موقفه منهما بقول رسول الله -صلى الله عليه وسلم- "لا فرق بين عربي وأعجمي، ولا بين أبيض وأسود إلا بالتقوى"."

অর্থাৎ, "রাসুলুল্লাহ সা. এর বাণীর মাধ্যমে ইসলাম বর্ণবাদ ও জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে তার অবস্থান স্পষ্ট করেছে: 'কোনো আরবের ওপর অনারবের, কিংবা কোনো সাদার ওপর কালোর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কেবল তাকওয়া ছাড়া'।" [13] । এই মানবিক সাম্যই বিজিত অঞ্চলের মানুষকে দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

ইসলামি আন্দোলনের মূল লক্ষ্যই ছিল মানুষের আত্মিক পরিবর্তন। কোনো সামরিক বিজয় তখনই প্রকৃত বিজয় হয়, যখন তা শত্রুর মনকে জয় করতে পারে। রাসুলুল্লাহ সা. এর সমরনীতির মূল দর্শনই ছিল এটি—শত্রুকে ধ্বংস করা নয়, বরং শত্রুকে হেদায়েতের আলোয় নিয়ে আসা। এ প্রসঙ্গে সীরাত গবেষকগণ অত্যন্ত চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন:


"النصر الحقيقي هو أن تدخل قادة العدو في الإسلام لا أن تهزمهم في معركة من معارك الإسلام. ويبقى هذا الهدف هو الأعلى."

অর্থাৎ, "প্রকৃত বিজয় হলো শত্রুর নেতাদের ইসলামে প্রবেশ করানো, ইসলামের কোনো যুদ্ধে তাদের কেবল পরাজিত করা নয়। আর এই লক্ষ্যটিই সর্বদা সর্বোচ্চ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।" [14] । এই মনস্তাত্ত্বিক বিজয়ের কারণেই সিরিয়া, মিশর, পারস্য এবং উত্তর আফ্রিকার মানুষ অত্যন্ত দ্রুত ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলামের সংস্কৃতি ও ভাষাকে আপন করে নিয়েছিল।

হুদায়বিয়া থেকে মক্কা বিজয়: তরবারিমুক্ত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং আদর্শিক বিজয়ের চূড়ান্ত রূপ


নববী সীরাতের ইতিহাসে হুদায়বিয়ার সন্ধি (Treaty of Hudaybiyyah) হলো তরবারিমুক্ত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং আদর্শিক বিজয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বাহ্যিকভাবে এই সন্ধির শর্তগুলো মুসলমানদের বিপক্ষে মনে হলেও, কুরআন একে 'ফাতহুম মুবিন' বা 'সুস্পষ্ট বিজয়' হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর কারণ ছিল, এই সন্ধির মাধ্যমে মক্কার কুরাইশরা প্রথমবারের মতো মুসলমানদের একটি স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং যুদ্ধের দামামা স্তব্ধ হয়ে যায়। যখন তরবারি খাপে ঢুকে গেল, তখন শুরু হলো বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক প্রচারের এক নতুন অধ্যায়। মুসলমান ও অমুসলিমদের মধ্যে অবাধ মেলামেশা ও সংলাপের সুযোগ তৈরি হলো, যার ফলে মাত্র দুই বছরে যত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তা পূর্ববর্তী ১৯ বছরেও করেনি। এ প্রসঙ্গে সীরাত গ্রন্থে বলা হয়েছে:


"ومن أجل ذلك كان الفتح المبين في الحديبية. حيث أزيح السيف من الطريق، وفتحت معركة العقيدة وسرعان ما انتصرت العقيدة في النفوس..."

অর্থাৎ, "আর এই কারণেই হুদায়বিয়াতে সুস্পষ্ট বিজয় অর্জিত হয়েছিল। যেখানে তরবারিকে পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং আকীদার যুদ্ধ উন্মুক্ত হয়েছিল, আর অতি দ্রুতই মানুষের অন্তরে আকীদার বিজয় সাধিত হয়েছিল..." [15]

এই মনস্তাত্ত্বিক বিজয়ের সবচেয়ে বড় ফসল ছিলেন কুরাইশদের দুই শ্রেষ্ঠ সামরিক প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব—খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. এবং আমর ইবনুল আস রা.। উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী এই দুই বীর হুদায়বিয়ার সন্ধির পর ইসলামের সত্যতা অনুধাবন করে মদিনায় এসে রাসুলুল্লাহ সা. এর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। আমর ইবনুল আস রা. যখন আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাশির দরবারে গিয়েছিলেন, তখন নাজাশির সাথে তাঁর কথোপকথন তাঁর হৃদয়ে এক বিশাল পরিবর্তন এনেছিল। নাজাশি তাঁকে বলেছিলেন যে, মুহাম্মাদ সা. এর কাছে সেই মহান ফেরেশতা (জিবরাইল) আসেন যিনি মুসা ও ঈসা আ. এর কাছে আসতেন। এই সত্য অনুধাবন করে আমর ইবনুল আস রা. এর অন্তর পরিবর্তন হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে মূল ইবারতে বলা হয়েছে:


"قال عمرو: فغير الله قلبي عما كنت عليه، وقلت في نفسي، عرف هذا الحق العرب والعجم وتخالف أنت..."

অর্থাৎ, "আমর রা. বলেন: অতঃপর আল্লাহ আমার অন্তরকে পূর্বের অবস্থা থেকে পরিবর্তন করে দিলেন এবং আমি মনে মনে বললাম, আরব ও অনারব সকলেই এই সত্যকে চিনে নিয়েছে, আর তুমি এর বিরোধিতা করছ..." [16] । এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইসলামের বিজয় তরবারির আঘাতে নয়, বরং সত্যের অমোঘ যৌক্তিকতায় অর্জিত হয়েছিল।

সাহাবিদের এই আত্মত্যাগ ও শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষাই ছিল ইসলামের বিজয়ের মূল চালিকাশক্তি। তারা দুনিয়ার কোনো স্বার্থে যুদ্ধ করেননি, বরং আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে সদা প্রস্তুত ছিলেন। উহুদ যুদ্ধে আমর ইবনুল জামুহ রা. এর মতো শারীরিক প্রতিবন্ধী সাহাবি, কিংবা আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ রা. এর মতো বীরদের শাহাদাতের ব্যাকুলতা প্রমাণ করে যে, তাদের অন্তরে ঈমানের যে আলো জ্বলছিল, তা কোনো পার্থিব শক্তির পক্ষে নেভানো সম্ভব ছিল না। এ প্রসঙ্গে সীরাত গ্রন্থে সাহাবিদের এই বীরত্বগাথা বর্ণিত হয়েছে:


"فقال له عمرو بن الجموح: إنّ بنيّ هؤلاء يمنعونني أن أجاهد معك، وو الله إنّي لأرجو أن أستشهد فأطأ بعرجتي هذه في الجنة!!"

অর্থাৎ, "আমর ইবনুল জামুহ রা. বললেন: হে আল্লাহর রাসুল! আমার ছেলেরা আমাকে আপনার সাথে জিহাদে যেতে বাধা দিচ্ছে। আল্লাহর কসম! আমি আশা করি যে আমি শহীদ হব এবং আমার এই খোঁড়া পা নিয়ে জান্নাতে হেঁটে বেড়াব!" [17] । এই আত্মোৎসর্গের চেতনা বিজিত অঞ্চলের মানুষের মনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, এই মানুষগুলো কোনো সাধারণ সাম্রাজ্যবাদী সৈন্য নয়, বরং তারা এক মহান ঐশী সত্যের বাহক। এই আদর্শিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয়ের ফলেই মক্কা বিজয়ের দিন কোনো রক্তপাত ছাড়াই মক্কার কুরাইশরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে এবং আরবে ইসলামের বিজয় সম্পূর্ণ হয়।

""
১২.৫ জাস্টি ওয়ার (Just War Theory) এবং নববী সমরনীতি: প্রাচ্যবিদদের 'তলোয়ারের জোরে ইসলাম প্রসার' থিওরির ঐতিহাসিক অসারতা
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১২.৫ জাস্টি ওয়ার (Just War) ও নববী সমরনীতি কুইজ

1 / 5

আলেকজান্ডার, চেঙ্গিস খান ও নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যবাদের সাথে ইসলামী সমরনীতির মূল পার্থক্য কোথায় ছিল?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...