খণ্ড 100
ফন্ট:100%
থিম:

৯.১ রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও কূটনীতি (Political Science and Diplomacy)

ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনের তাত্ত্বিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক ভূ-রাজনীতি (Theoretical Foundations of Islamic Statecraft and Geopolitics)

মানবজাতির রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, রাষ্ট্রগঠন ও শাসনব্যবস্থার বিকাশে বিভিন্ন সভ্যতা ভিন্ন ভিন্ন দার্শনিক তত্ত্বের আশ্রয় গ্রহণ করেছে। প্রাচীন গ্রীক রাষ্ট্রচিন্তায় প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের নগর-রাষ্ট্রীয় ধারণার ভিত্তি ছিল যৌক্তিক নৈতিকতা, যার পরবর্তী রূপায়ণ আধুনিক পাশ্চাত্য চিন্তায় ম্যাকিয়াভেলীয় বাস্তববাদ (Realism) এবং থমাস হবসের সার্বভৌম ক্ষমতার তত্ত্বে রূপ লাভ করে। পক্ষান্তরে, মহান নবি মুহাম্মাদ সা. কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মদিনা ভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামোটি কোনো বিচ্ছিন্ন গোত্রীয় সংঘাতের ফসল ছিল না, বরং তা ছিল একটি সম্পূর্ণ নতুন ও ঐশ্বরিক জীবনদর্শনের রাজনৈতিক প্রকাশ। আরব উপদ্বীপের প্রাক-ইসলামি যুগে যখন কোনো কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক আইন বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সীমানা ছিল না—যাকে ইতিহাসবিদগণ 'আইয়ামে জাহিলিয়্যা' বা গোত্রীয় নৈরাজ্যের যুগ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন—তখন রাসুলুল্লাহ সা. একটি সুসংহত, সার্বভৌম এবং নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন রাষ্ট্রীয় সত্তা নির্মাণ করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আধুনিক সংজ্ঞায় সার্বভৌমত্ব, জনসংখ্যা, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড এবং সরকার—এই চারটি মৌলিক উপাদানের উপস্থিতি আবশ্যকীয়। মুহাম্মাদ সা. এই চার উপাদানের সমন্বয় ঘটিয়ে কেবল একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রই প্রতিষ্ঠা করেননি, বরং তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নৈতিকতার এমন এক অবিনশ্বর মানদণ্ড স্থাপন করেছিলেন, যা আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বের 'যৌথ নিরাপত্তা' (Collective Security) এবং 'আইনের শাসন' (Rule of Law)-এর ধারণার চেয়েও প্রগামী ও মানবিক। [1]

ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে একচ্ছত্র ঐশ্বরিক সার্বভৌমত্ব (حاكمية / Divine Sovereignty), যা রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে স্বৈরাচারী শাসক বা শক্তির আধিপত্যের পরিবর্তে নীতিগত ন্যায়বিচারের অধীন করে তোলে। মদিনার রাজনৈতিক কাঠামোয় রাসুলুল্লাহ সা. কেবল একজন ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী, বিচারক এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সর্বাধিনায়ক। প্রাচীন বিশ্বরাজনীতিতে যেখানে ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্ব পরিমাপ করা হতো সামরিক দমনপীড়ন ও ভূখণ্ড দখলের মাধ্যমে, সেখানে ইসলামি রাষ্ট্রীয় ভূ-রাজনীতির মূল প্রেরণা ছিল মানবকল্যাণ, সাম্য এবং চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা। ইসলামি রাষ্ট্রবিজ্ঞান কেবল ভূমির নিয়ন্ত্রণকেই সার্বভৌমত্ব হিসেবে বিবেচনা করে না; বরং এটি আত্মিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে একটি সুশীল সমাজ (Civil Society) গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের আধুনিক গবেষকগণ স্বীকার করেন যে, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কে বলপ্রয়োগের নীতিকে শিথিল করে চুক্তিগত নৈতিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সা.-এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। [2]

রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও স্বীকৃতি লাভের জন্য যে দূরদর্শী ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের প্রয়োজন হয়, নবুওয়াতের মাদীনায় তা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল। নবাগত ইসলামি রাষ্ট্রটি তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তি—রুম (বাইজান্টাইন) ও পারস্য (সাসানীয়) সাম্রাজ্য—এবং তাদের অনুগত আঞ্চলিক গোত্রগুলোর দ্বারা বেষ্টিত ছিল। এই জটিল ভৌগোলিক বাস্তবতায় রাসুলুল্লাহ সা. বলপ্রয়োগের পরিবর্তে বাস্তবমুখী কৌশলগত ভারসাম্য (Balance of Power) নীতি গ্রহণ করেন। তিনি একদিকে অভ্যন্তরীণ সামাজিক সংহতি জোরদার করেন এবং অন্যদিকে বহিরাগত হুমকি মোকাবেলায় কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেন। কুরআন মাজীদে চুক্তি রক্ষা এবং ন্যায়ভিত্তিক রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, যা ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনের মৌলিক ভিত্তি সংজ্ঞায়িত করে:

وَأَوْفُوا بِعَهْدِ اللَّهِ إِذَا عَاهَدْتُمْ وَلَا تَنْقُضُوا الْأَيْمَانَ بَعْدَ تَوْكِيدِهَا وَقَدْ جَعَلْتُمُ اللَّهَ عَلَيْكُمْ كَفِيلًا إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ

“আর তোমরা আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করো যখন তোমরা কোনো অঙ্গীকার করো এবং শপথ সুদৃঢ় করার পর তা ভঙ্গ করো না, অথচ তোমরা আল্লাহকে তোমাদের জামিনদার বানিয়েছ। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো আল্লাহ তা জানেন।” [3] । এই ঐশ্বরিক আদেশের মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্রে চুক্তি পালনকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি পবিত্রতম রাজনৈতিক দায়িত্বে উন্নীত করা হয়েছে, যা কোনো সাময়িক রাজনৈতিক স্বার্থে লঙ্ঘন করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।

কূটনৈতিক অলঙ্ঘনীয়তা ও দূতদের সুরক্ষা নীতি (Diplomatic Immunity and Security Protocols)

আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে 'কূটনৈতিক অলঙ্ঘনীয়তা' (Diplomatic Immunity) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ধারণা। আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনে ১৯৬১ সালের 'ভিয়েনা কনভেনশন অন ডিপ্লোম্যাটিক রিলেশনস'-এর মাধ্যমে দূত ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের যে সর্বাত্মক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা অধিকার প্রদান করা হয়েছে, তার প্রায় সাড়ে তেরশো বছর আগেই রাসুলুল্লাহ সা. এই নীতিকে রাষ্ট্রীয় আইনি প্রথা হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করেছিলেন। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বিশ্বে অনেক সময় যুদ্ধ কিংবা শত্রুতার সময় বিরোধী পক্ষের রাজনৈতিক দূতদের হত্যা বা বন্দী করা হতো, যা কৌশলগত বার্তা আদান-প্রদানে এক বিরাট বাধা ছিল। কিন্তু মহানবি সা. শত্রু বা মিত্র নিরপেক্ষভাবে সকল কূটনৈতিক দূতের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদার পূর্ণ সুরক্ষার নীতি ঘোষণা ও প্রয়োগ করেন। [4]

কূটনৈতিক নিরাপত্তার এই বাস্তব প্রয়োগ ফুটে ওঠে নবুওয়াতের চরম শত্রু ও নবুওয়াতের মিথ্যা দাবিদার মুসাইলিমা কাযযাবের পক্ষ থেকে আগত দূতদ্বয়ের সাথে রাসুলুল্লাহ সা.-এর রাষ্ট্রীয় আচরণের মধ্য দিয়ে। মুসাইলিমা যখন মদিনায় নিজ বার্তা নিয়ে ইবনুন নাওয়্যাহাহ এবং ইবনে আছাল নামক দুজন দূত প্রেরণ করে, সেই বার্তাটি ছিল অত্যন্ত উসকানিমূলক, রাজনৈতিকভাবে আপত্তিকর এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। দূত দুজনও প্রকাশ্য দরবারে মুসাইলাইমার মিথ্যা দাবির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে। তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী এই ধরনের ধৃষ্টতার কারণে তাদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা সমীচীন ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাসুলুল্লাহ সা. আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও আইন রক্ষা করে অসামান্য প্রজ্ঞা প্রদর্শন করেন এবং ঐতিহ্যবাহী আইনি নীতি উচ্চারণ করেন:

أَمَا وَاللَّهِ لَوْلَا أَنَّ الرَّسُلَ لَا تُقْتَلُ لَضَرَبْتُ أَعْنَاقَكُمَا

“আল্লাহর কসম! যদি এই নিয়ম না থাকতো যে, কূটনৈতিক দূতদের হত্যা করা যায় না, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের দুজনের শিরচ্ছেদ করতাম।” [5] । এই ঐতিহাসিক বক্তব্যের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. রাষ্ট্রীয় আইনের যে মৌলিক ধারাটি প্রতিষ্ঠা করেন, তা হলো—প্র প্রেরকের রাজনৈতিক শত্রুতা কিংবা বার্তার উসকানিমূলক উপাদান যতই চরম হোক না কেন, বার্তাবহক বা দূত ব্যক্তিগতভাবে সর্বপ্রকার শারীরিক ও আইনগত সুরক্ষা পাবে। এটি আধুনিক কূটনৈতিক প্রটোকলের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক।

অনুরূপভাবে, পারস্যের সম্রাট কিসরা আবরোয়েজ যখন রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রেরিত কূটনৈতিক পত্র ছিঁড়ে ফেলে অহংকার প্রদর্শন করে এবং ইয়েমেনের পারসিক গভর্নর বাযানকে নির্দেশ দেয় রাসুলুল্লাহ সা.-কে বন্দী করে দরবারে নিয়ে যেতে, তখন বাযানের পক্ষ থেকে দুজন ফার্সি প্রতিনিধি মদিনায় আগমন করে। তারা রাষ্ট্রে প্রবেশ করে একপ্রকার ঔদ্ধত্যপূর্ণ বার্তা প্রদান করে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সা. তাদের প্রতি কোনো প্রকার বলপ্রয়োগ বা অবমাননাকর আচরণ করেননি। বরং অত্যন্ত শান্ত, সুসংহত ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদাসম্পন্ন পরিবেশে তাদের আপ্যায়ন করেন এবং অপেক্ষা করতে বলেন। পরবর্তীতে যখন তিনি ঐশ্বরিক মাধ্যমে কিসরার মৃত্যুর খবর জানতে পারেন, তখন সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক সংবাদের ভিত্তিতে তাদের নিরাপদে প্রত্যাবর্তন করার সুযোগ দেন এবং গভর্নর বাযানের কাছে নতুন বার্তা প্রেরণ করেন। [6] । শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিনিধিদের প্রতি এরূপ সহনশীলতা ও প্রটোকল প্রদান প্রমাণ করে যে, বিশ্বনবি সা.-এর গৃহীত নীতি ছিল সম্পূর্ণ পেশাদারিত্ব, আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার এবং মানসিক পরিপক্কতায় সমৃদ্ধ।

দূতদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ সা. তাঁদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন এবং রাষ্ট্রীয় উপহার প্রদানের প্রথাও চালু করেছিলেন। মদিনা রাষ্ট্রে বিদেশী কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের কেবল নিরাপত্তা ও সুরক্ষাই দেওয়া হতো না, বরং তাঁদের রাষ্ট্রীয় মেহমানখানায় অবস্থান করানো হতো, উপহার-উপঢৌকন দিয়ে সম্মানিত করা হতো এবং তাঁদের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা হতো। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী থমাস আর্নল্ড তাঁর গবেষণায় ইসলামি কূটনীতির এই পরোপকারী ও মানবিক দিকটিকে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, যেখানে কোনো বিদেশী প্রতিনিধি মদিনায় এসে কেবল নিরাপত্তা লাভই করতেন না, বরং রাষ্ট্রীয় কৃষ্টি ও নৈতিকতার এক অনুপম দৃষ্টান্ত প্রত্যক্ষ করতেন। [7]

চুক্তিগত প্রতিশ্রুতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূলনীতি (Treaty Compliance, Geopolitical Realism, and International Law)

আন্তর্জাতিক আইনের (Public International Law) একটি মৌলিক ভিত্তি হলো 'প্যাক্টা সান্ট সারভান্ডা' (Pacta sunt servanda), যার অর্থ হলো "চুক্তি অবশ্যই পালনীয়"। আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে প্রায়শই দেখা যায় যে, রাষ্ট্রসমূহ নিজেদের জাতীয় স্বার্থ (National Interest) কিংবা সামরিক সুবিধার দোহাই দিয়ে দ্বি-পাক্ষিক বা বহু-পাক্ষিক চুক্তি এককভাবে ভঙ্গ করে থাকে। কিন্তু ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনে এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক নীতিতে চুক্তি ভঙ্গ করা একটি অত্যন্ত মারাত্মক অপরাধ ও পাপাচার হিসেবে বিবেচিত। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে সততা ও ওয়াদা পালনের যে দৃষ্টান্ত নবুওয়াতের যুগে স্থাপিত হয়েছিল, তা বিশ্বের সমগ্র রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল। [8]

রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটের চরম মুহূর্তেও চুক্তি পালনের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন রাসুলুল্লাহ সা. বদর যুদ্ধের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে। সাহাবি হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান রা. এবং তাঁর পিতা হুসাইল রা. মদিনায় আসার পথে কুরাইশদের দ্বারা অবরুদ্ধ হন। কুরাইশরা তাঁদের কাছ থেকে এই মর্মে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেয় যে, তারা মদিনায় গিয়ে মুহাম্মাদ সা.-এর সাথে সামরিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবেন না। পরবর্তীতে হুজাইফা রা. এবং তাঁর পিতা রাসুলুল্লাহ সা.-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে সমস্ত ঘটনা ব্যক্ত করেন এবং বদরের কঠিন যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিমদের তীব্র লোকবল সংকট থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধে অংশ নেওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সা. কৌশলগত সামরিক সুবিধার ওপর চুক্তিগত নৈতিকতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত প্রদান করেন:

انْصَرِفَا، نَفِي لَهُمْ بِعَهْدِهِمْ وَنَسْتَعِينُ اللَّهَ عَلَيْهِمْ

“তোমরা উভয়ই ফিরে যাও (যুদ্ধ থেকে বিরত থাকো)। আমরা তাদের সাথেকৃত ওয়াদা পূর্ণ করব এবং তাদের বিরুদ্ধে কেবল আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করব।” [9] । চরম সামরিক প্রয়োজনের মুহূর্তেও মাত্র দুজন যোদ্ধার অংশগ্রহণকে বাদ দিয়ে হলেও কুরাইশদের মতো কাফির শত্রুপক্ষের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার এই ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত। এটি স্পষ্ট করে যে, ইসলামি রাষ্ট্রে কৌশলগত লাভ কখনো নৈতিক নীতিকে লঙ্ঘন করতে পারে না।

তদুপরি, আন্তর্জাতিক আইনবিদ সাইয়্যিদ কুতুব তাঁর রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, ইসলামি রাষ্ট্র কেবল প্রতিপক্ষের সাথে সম্পাদিত চুক্তি রক্ষা করতেই বাধ্য নয়, বরং প্রতিপক্ষ চুক্তি ভঙ্গ করার সুস্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশ না করা পর্যন্ত তাদের ওপর আক্রমণ চালানো বা বিশ্বাসঘাতকতা করাও ইসলামি রাষ্ট্রীয় আইনে অবৈধ। যদি কোনো মিত্র বা শত্রুরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার সুনির্দিষ্ট আশঙ্কা দেখা দেয়, তবে ইসলামি রাষ্ট্রের জন্য আবশ্যক হলো আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিয়ে প্রতিপক্ষকে সমান সমতলে (Level Playing Field) দাঁড় করানো, যাতে কোনো ধরনের গোপন আক্রমণ বা প্রতারণার আশ্রয় না নেওয়া হয়। [10] । এই প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ কুরআনে বর্ণিত হয়েছে:

وَإِمَّا تَخَافَنَّ مِنْ قَوْمٍ خِيَانَةً فَانْبِذْ إِلَيْهِمْ عَلَى سَوَاءٍ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْخَائِنِينَ

“আর যদি তুমি কোনো সম্প্রদায়ের থেকে খেয়ানত বা চুক্তিভঙ্গের ভয় করো, তবে তাদের চুক্তি তাদের দিকে সমতা ও ন্যায়নীতির ভিত্তিতে ছুঁড়ে ফেলে দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ খেয়ানতকারীদের পছন্দ করেন না।” [11] । এই নীতি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে 'স্বচ্ছতা ও সমতার নীতি' (Principle of Transparency and Equality) হিসেবে স্বীকৃত, যা যেকোনো প্রকার ছদ্মবেশী আগ্রাসনকে প্রতিহত করে।

মদিনা রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোয় ভৌগোলিক সীমানার বাইরে অবস্থানরত অন্য মুসলিমদের সুরক্ষার চেয়ে অন্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত শান্তিচুক্তিকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। যদি কোনো অমুসলিম বা নিরপেক্ষ রাষ্ট্র বা গোত্রের সাথে মদিনা রাষ্ট্রের কোনো অলঙ্ঘনীয় নন-অ্যাগ্রেশন বা শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়ে থাকে, আর সেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নিগৃহীত কোনো মুসলিম গোষ্ঠী মদিনা রাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তা চায়, তবে চুক্তি বিদ্যমান থাকা অবস্থায় ইসলামি রাষ্ট্র চুক্তিগত বাধ্যবাধকতার কারণে সেই আক্রান্ত মুসলিমদের সামরিক সাহায্য প্রদান করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক আইন ও ইসলামি শরীয়াহর এই মৌলিক নীতিটি কুরআনে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে বিধৃত হয়েছে:

وَإِنِ اسْتَنْصَرُوكُمْ فِي الدِّينِ فَعَلَيْكُمُ النَّصْرُ إِلَّا عَلَى قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ مِيثَاقٌ

“তবে তারা যদি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, তবে তাদের সাহায্য করা তোমাদের জন্য আবশ্যক; তবে এমন কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়, যাদের সাথে তোমাদের কোনো চুক্তি বিদ্যমান রয়েছে।” [12] । এই বিধান প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রীয় চুক্তির স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা করা ইসলামি রাষ্ট্রনীতির এক সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও কূটনীতির আধুনিক তত্ত্বসমূহে সার্বভৌম রাষ্ট্রের যে অধিকার, দায়িত্ব ও আইনগত বাধ্যবাধকতার চর্চা লক্ষ্য করা যায়, রাসুলুল্লাহ সা.-এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও আদর্শিক নেতৃত্ব তার চেয়ে অনেক বেশি বস্তুনিষ্ঠ, সুষম ও সর্বজনীন নৈতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

""
৯.১ রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও কূটনীতি (Political Science and Diplomacy)
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

৯.১ রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও কূটনীতি (Political Science and Diplomacy) কুইজ

1 / 5

প্রাক-ইসলামি যুগের গোত্রীয় নৈরাজ্যকে ইতিহাসবিদগণ কী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...