সংঘাতকালীন প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকতা কেবল তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার। যখন কোনো রাষ্ট্র বা সমাজ যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ কিংবা তীব্র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়, তখন সংবাদমাধ্যমের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি প্রতিবেদন এবং প্রতিটি শিরোনাম জনমনে গভীর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। 'কনফ্লিক্ট সেনসিটিভ জার্নালিজম' বা সংঘাত-সংবেদনশীল সাংবাদিকতা হলো এমন একটি পেশাদারী দৃষ্টিভঙ্গি, যা সংঘাতের বিদ্যমান পরিস্থিতিকে আরও উসকে না দিয়ে বরং শান্তি স্থাপনে (Peace-building) সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এই সাংবাদিকতার মূল দর্শন হলো 'Do No Harm' বা 'ক্ষতি না করা' নীতি অনুসরণ করা, যাতে সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা বা সহিংসতা ছড়িয়ে না পড়ে।
ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, সংবাদমাধ্যম একদিকে যেমন জনমত গঠন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে, অন্যদিকে এটি সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী করার ক্ষেত্রেও একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। সাংবাদিকতার এই দ্বান্দ্বিক প্রকৃতি এবং সংঘাতের সময় এর প্রভাব বিশ্লেষণ করতে হলে আমাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের কৌশলসমূহ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে যখন সংবাদমাধ্যম রাজনৈতিক অস্থিরতা বা ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন এর গুরুত্ব ও ঝুঁকি উভয়ই বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
সংঘাতের অস্থিরতা ও সাংবাদিকতার অনিশ্চিত অবস্থান
সংঘাতের সময় সাংবাদিকতা একটি অত্যন্ত অস্থির ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা বা যুদ্ধের সময় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রায়শই খর্ব করা হয় এবং সংবাদ পরিবেশন পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত বা এমনকি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধও হয়ে যেতে পারে। এই অস্থিরতা কেবল সংবাদপত্রের বিষয়বস্তুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের সংকটেও প্রতিফলিত হয়।
বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক বদর শাকির আল-সায়্যাব-এর জীবন ও সাহিত্য পর্যালোচনায় এই অস্থিরতার একটি চিত্র ফুটে ওঠে। তাঁর জীবন ও কর্মের প্রেক্ষাপটে দেখা যায় যে, সাংবাদিকতা ছিল পরিস্থিতির পরিবর্তনের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। যখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে উঠত, তখন সংবাদমাধ্যমকে হয় লুকিয়ে থাকতে হতো অথবা তা সম্পূর্ণভাবে বাতিল বা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হতো। এই বিষয়টি সম্পর্কে বলা হয়েছে:
الصحافة كان مرهونا بما تواجهه من تقلبات الحال، إذ كانت تحتجب أو يلغى [1] ।এই ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণটি আধুনিক সংঘাতকালীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যুদ্ধের ময়দানে বা দাঙ্গার সময় সংবাদমাধ্যম যখন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডার অধীনে চলে আসে, তখন তা নিরপেক্ষ তথ্য পরিবেশনের পরিবর্তে সংঘাতকে উসকে দেওয়ার কাজ করে। সাংবাদিকতার এই অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক চাপের মুখে এর পরিবর্তনশীলতা প্রমাণ করে যে, সংঘাতের সময় সংবাদমাধ্যম কেবল একটি নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক নয়, বরং এটি নিজেই একটি ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitical) লড়াইয়ের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিকতা: মিশরীয় সংবাদমাধ্যম ও বিপ্লবী চেতনা
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে মিশরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং উরাবি বিপ্লবের (Urabi Revolution) সময় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা 'কনফ্লিক্ট সেনসিটিভ জার্নালিজম'-এর একটি জটিল ও ধ্রুপদী উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সেই সময়ে সংবাদমাধ্যম একদিকে যেমন জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত করেছিল, অন্যদিকে এর তীব্র ও আক্রমণাত্মক ভাষা অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উত্তেজনাকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল।
মিশরের সংবাদপত্রের বিবর্তন ও রাজনৈতিক ভূমিকার বিশ্লেষণে দেখা যায়, 'আল-তায়েফ' (Al-Taif) নামক পত্রিকাটির একটি বিশেষ অবস্থান ছিল। এটি সামাজিক বিষয় থেকে সরে এসে গভীর রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী বিষয়ে মনোনিবেশ করেছিল। বিপ্লবের সময় এই পত্রিকাটির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বিপ্লব এবং বিপ্লবীদের পক্ষে জনমত গঠন করত। তবে এর ভাষা ছিল অত্যন্ত উগ্র ও আক্রমণাত্মক, যা অনেক সময় রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও তীব্র করে তুলত। এই বিষয়ে ঐতিহাসিক তথ্য প্রদান করে:
انتقلت "الطائف" من المقالات الاجتماعية الخالصة إلى الموضوعات السياسية العميقة والأخبار المهمة التي تميزت بها في عهد الثورة... وكان من أهم وظائف الطائف الدفاع عن الثورة ورجالها [2] ।'আল-তায়েফ' পত্রিকার এই বিপ্লবী ভূমিকা একদিকে যেমন জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটিয়েছে, অন্যদিকে এর 'উগ্রতা' বা 'তীব্রতা' (Violence in editing) তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী ও খদিভ ইসমাইল-এর বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। এমনকি খদিভ ইসমাইল-এর বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও আক্রমণাত্মক ভাষায় লেখা হয়েছিল, যা ঐতিহাসিক নিরপেক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিশোধের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বেশি প্রতীয়মান হতো। এই ধরনের সাংবাদিকতা যখন কোনো সংঘাতের সময় বিদ্যমান বিভাজনকে আরও গভীর করে তোলে, তখন তা পিস-বিল্ডিংয়ের পরিবর্তে কনফ্লিক্ট-এস্কেলেশন বা সংঘাত বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
তদুপরি, মিশরের সেই সময়ের সামরিক আইন ও সেন্সরশিপের বিষয়টিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যখন দেশ সামরিক শাসনের অধীনে ছিল, তখন সংবাদপত্রের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল। সংবাদপত্রের বিষয়বস্তু একটি 'আদালত' বা 'কাউন্সিল'-এর মাধ্যমে যাচাই করা হতো যাতে ধর্মীয় উগ্রতা বা রাজনৈতিক আক্রমণ রোধ করা যায়। এই নিয়ন্ত্রণের একটি উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, যদিও এর ফলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছিল। [3] ।
রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ ও প্রতিরোধমূলক আখ্যানের দমন
সংঘাতের সময় রাষ্ট্র প্রায়শই সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। বিশেষ করে ঔপনিবেশিক শাসন বা কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে, প্রতিরোধমূলক বা গেরিলা যুদ্ধের (Guerrilla warfare) সাথে সম্পর্কিত যেকোনো তথ্য বা সাহিত্যকে রাষ্ট্রীয়ভাবে দমন করা হয়। এটি মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psychological warfare), যেখানে জনগণের প্রতিরোধের চেতনাকে স্তব্ধ করার জন্য মিডিয়া ও সংস্কৃতির ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়।
আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই চিত্রটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। সেখানে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি চালানো হতো এবং এমন সব বই ও চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ করা হতো যা প্রতিরোধ বা সশস্ত্র সংগ্রামের সাথে সম্পর্কিত ছিল। আলজেরিয়ার এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বলা হয়েছে:
نشطت الرقابة السياسية في ميداني الثقافة والإعلام، حيث صودرت مجموعة من الكتب لأنها تتعرض لحرب العصابات وحروب التحرير بصفة عامة، ومنعت من العرض بعض الأفلام الأمريكية... مما له صلة بالمقاومة والكفاح المسلح [4] ।এই সেন্সরশিপের মূল লক্ষ্য ছিল সংঘাতের সময় জনমনে প্রতিরোধের ধারণা বা 'Resistance Narrative' তৈরি হতে না দেওয়া। যখন কোনো রাষ্ট্র বা ঔপনিবেশিক শক্তি দেখে যে সংবাদমাধ্যম বা সাহিত্য জনগণের মধ্যে ঐক্য ও লড়াইয়ের প্রেরণা জোগাচ্ছে, তখন তারা সরাসরি সেই মাধ্যমগুলোর ওপর আঘাত হানে। আলজেরিয়ার জেনারেল শারিয়ারের (General Chariar) দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত কঠোর; তাঁর মতে, ইসলামি দেশগুলোতে ধীরস্থিরতা বা দুর্বলতা কোনো কাজে আসে না, বরং কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি প্রমাণ করে যে, সংঘাতের সময় মিডিয়াকে কীভাবে একটি 'নিরাপত্তা হুমকি' হিসেবে দেখা হয় এবং কীভাবে তা দমন করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।
এই ধরনের রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন সংবাদপত্রের নিরপেক্ষতাকে ধ্বংস করে দেয় এবং সংবাদকর্মীদের একটি কঠিন নৈতিক সংকটের মুখোমুখি করে—সত্য বলা নাকি জীবন রক্ষা করা। যখন সংবাদমাধ্যম কেবল রাষ্ট্রের প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা পিস-বিল্ডিংয়ের পরিবর্তে সংঘাতকে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও সহিংস করে তোলে।
মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ও পিস-বিল্ডিংয়ে সাংবাদিকতার নৈতিক দায়বদ্ধতা
সংঘাত-সংবেদনশীল সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য হলো সংঘাতের সময় তথ্যের প্রবাহকে এমনভাবে পরিচালনা করা যাতে তা সামাজিক মেরুকরণ (Social polarization) না ঘটায়। যুদ্ধ বা দাঙ্গার সময় সংবাদমাধ্যম যদি কেবল একটি পক্ষের জয়গান গায় বা অন্য পক্ষের প্রতি ঘৃণা ছড়ায়, তবে তা 'Collective Security' বা সামষ্টিক নিরাপত্তার ধারণাকে হুমকির মুখে ফেলে। সাংবাদিকতার ভাষা যদি উগ্র ও আক্রমণাত্মক হয়, তবে তা মানুষের অবচেতন মনে ভয়ের সংস্কৃতি বা প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করতে পারে।
পিস-বিল্ডিং বা শান্তি স্থাপনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার ভূমিকা হতে পারে বহুমুখী। প্রথমত, এটি সংঘাতের মূল কারণসমূহ সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, এটি বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সংলাপের (Dialogue) সুযোগ তৈরি করতে পারে। তৃতীয়ত, এটি মিথ্যা তথ্য বা গুজব (Misinformation) প্রতিরোধ করে সামাজিক অস্থিরতা কমাতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সাংবাদিকের উচ্চতর নৈতিকতা এবং সংবেদনশীলতা।
পরিশেষে বলা যায়, সংঘাতের সময় সাংবাদিকতা একটি দুধারী তলোয়ারের মতো। এটি একদিকে যেমন নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর হতে পারে, অন্যদিকে এটি সহিংসতার আগুনে ঘি ঢালার মাধ্যমও হতে পারে। ঐতিহাসিক উদাহরণগুলো—তা মিশরের উরাবি বিপ্লব হোক বা আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ—আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য। সংঘাত-সংবেদনশীল সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশাদারী কৌশল নয়, বরং এটি একটি মানবিক ও নৈতিক আবশ্যকতা, যা যুদ্ধের ধ্বংসলীলার মাঝেও শান্তির বীজ বপন করতে সক্ষম।