পরিশিষ্ট ৬: আসহাবুল উখদুদ এবং সমকালীন জিও-পলিটিক্স: নাজরানের খ্রিষ্টানদের ওপর হিময়ারি রাজা যুনুওয়াসের নির্যাতনের হিস্টোরিওগ্রাফি
আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও হিময়ারি সাম্রাজ্যের উত্থান
প্রাক-ইসলামিক যুগের আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্ত, বিশেষত বর্তমান ইয়েমেন অঞ্চলটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্র। এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসে সাবা সাম্রাজ্যের পতনের পর হিময়ারি রাজবংশের উত্থান একটি যুগান্তকারী ঘটনা। হিময়ারি সাম্রাজ্য কেবল সামরিক শক্তিতেই নয়, বরং বাণিজ্যিক রুট এবং কৃষি ব্যবস্থাপনায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল। তবে এই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্তরালে বিদ্যমান ছিল এক গভীর আদর্শিক ও ধর্মীয় সংঘাত, যা পরবর্তীতে নাজরানের খ্রিষ্টানদের ওপর চরম নির্যাতনের রূপ পরিগ্রহ করে। হিময়ারি রাজবংশের শেষ দিকের শাসকরা যখন তাদের ক্ষমতাকে কেন্দ্রিক করতে চাইলেন, তখন তারা ধর্মীয় একমুখিতা বা 'Religious Uniformity' কে রাজনৈতিক সংহতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন [1] ।
দক্ষিণ আরবের এই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণটি কেবল অভ্যন্তরীণ ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের দুটি পরাশক্তি—পূর্ব রোমান (বাইজান্টাইন) সাম্রাজ্য এবং ইথিওপিয়ার আকসুম সাম্রাজ্যের প্রভাবাধীন। নাজরান ছিল খ্রিষ্টধর্মের একটি শক্তিশালী কেন্দ্র, যা বাইজান্টাইন এবং আকসুমীয় প্রভাবের সাথে সংযুক্ত ছিল। হিময়ারি রাজাদের দৃষ্টিতে নাজরানের খ্রিষ্টানরা কেবল ধর্মীয় ভিন্নমতাবলম্বী ছিল না, বরং তারা ছিল বহিঃশক্তির সম্ভাব্য 'প্রক্সি' বা প্রতিনিধি। এই সন্দেহ এবং রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা থেকেই জন্ম নেয় এক চরম দমনমূলক শাসনব্যবস্থা, যার লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ আরবে খ্রিষ্টীয় প্রভাব সম্পূর্ণ নির্মূল করা এবং হিময়ারি সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নাতীত করা [2] ।
হিময়ারি রাজা যুনুওয়াসের শাসনকাল ছিল এই সংঘাতের চরম পর্যায়। তিনি কেবল একজন শাসক ছিলেন না, বরং তিনি নিজেকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় মতাদর্শের রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। তার এই রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামি তাকে নাজরানের খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে এক নৃশংস যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। এখানে আমরা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের (State-sponsored Terror) এক আদি রূপ দেখতে পাই, যেখানে রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিত করার জন্য ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আঘাত হানা হয়। যুনুওয়াসের এই পদক্ষেপটি ছিল মূলত একটি 'ক্লিনজিং অপারেশন', যার মাধ্যমে তিনি দক্ষিণ আরবের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে খ্রিষ্টীয় প্রভাব মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন [3] ।
আসহাবুল উখদুদ: নাজরানের গণহত্যা ও আদর্শিক দৃঢ়তার বিশ্লেষণ
কুরআনে বর্ণিত 'আসহাবুল উখদুদ' বা খন্দকবাসীদের ঘটনাটি ঐতিহাসিকভাবে নাজরানের খ্রিষ্টানদের ওপর যুনুওয়াসের নির্মম নির্যাতনের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এই ঘটনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল বিশ্বাসের পরীক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখে অটল থাকা। রাজা যুনুওয়াস যখন নাজরানের খ্রিষ্টানদের তাদের ধর্ম ত্যাগ করে তার আদর্শ গ্রহণ করার নির্দেশ দিলেন, তখন তারা তা প্রত্যাখ্যান করল। এই প্রত্যাখ্যানকে যুনুওয়াস তার ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক মর্যাদার ওপর আঘাত হিসেবে গণ্য করেন। ফলে তিনি এক ভয়াবহ শাস্তির পরিকল্পনা করেন, যা ইতিহাসে 'উখদুদ' বা আগুনের খন্দক হিসেবে পরিচিত।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, যুনুওয়াস বিশাল খন্দক খনন করে তাতে আগুন জ্বালিয়ে দেন এবং বিশ্বাসীদের সেখানে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন। এই ঘটনার ভয়াবহতা এবং বিশ্বাসীদের দৃঢ়তা সম্পর্কে বলা হয়েছে:
وإن أهل نجران أخلصوا فى المسيحية وقبلوا فى سبيلها العذاب الشديد، ورضوا به عن أن يغيروا دينهم غير مطمئنين إلى عقيدة سواه، وابتلوا فى ذلك، فأبلوا بلاء حسنا [4] । এই ইবারাতটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, নাজরানের খ্রিষ্টানরা তাদের বিশ্বাসের প্রতি এতটাই একনিষ্ঠ ছিলেন যে, তারা চরম শারীরিক যন্ত্রণা এবং মৃত্যুর চেয়ে ধর্মত্যাগ করাকে অধিকতর ঘৃণ্য মনে করতেন। এটি কেবল একটি ধর্মীয় ঘটনা নয়, বরং এটি ছিল মানুষের আত্মিক স্বাধীনতার সাথে রাষ্ট্রীয় স্বৈরাচারের এক সংঘাত।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুনুওয়াসের উদ্দেশ্য ছিল কেবল হত্যা করা নয়, বরং বাকিদের মনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করা। আগুনের খন্দকটি ছিল একটি 'পাবলিক স্পেকটাকল' বা প্রকাশ্য প্রদর্শনী, যার মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, রাষ্ট্রের আদেশের বাইরে যাওয়ার পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তবে এই কৌশলটি বিপরীত ফল বয়ে আনে। যখন মানুষ দেখল যে তাদের সহযোদ্ধারা হাসিমুখে আগুনের কুণ্ডলীতে ঝাঁপ দিচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে এক ধরণের 'কালেক্টিভ রেজিলিয়েন্স' বা সমষ্টিগত সহনশীলতা তৈরি হয়। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, চরম নিপীড়ন অনেক সময় বিশ্বাসকে আরও সুদৃঢ় করে এবং স্বৈরাচারী শাসনের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল করে দেয় [5] ।
হিস্টোরিওগ্রাফিক বিতর্ক: ইবনে আব্বাস এবং ওয়াহব বিন মুনাব্বিহ-এর বর্ণনা
আসহাবুল উখদুদ-এর ঘটনাটি বিভিন্ন ঐতিহাসিক এবং মুফাসসিরগণ ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বর্ণনা করেছেন, যা এই ঘটনার হিস্টোরিওগ্রাফিকে আরও সমৃদ্ধ করে। ইবনে আব্বাস রা. এই ঘটনার একটি ভিন্ন বর্ণনা প্রদান করেছেন, যেখানে তিনি একে বনী ইসরায়েলের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী:
هم ناس من بني إسرائيل خدوا أخدوداً في الأرض، ثم أوقدوا فيه ناراً، ثم أقاموا على ذلك الأخدود رجالاً ونساء، فعُرضوا عليها، وزعموا أنه دانيال وأصحابه [6] । ইবনে আব্বাস রা.-এর এই বর্ণনাটি ইঙ্গিত দেয় যে, খন্দকে পুড়িয়ে মারার এই নৃশংস পদ্ধতিটি ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জাতি বা গোষ্ঠীর ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে। এখানে দানিয়াল (আ.) এবং তার সাথীদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা এই ঘটনার একটি প্রাচীনতর সংস্করণকে নির্দেশ করে।
অন্যদিকে, ইবনে হিশাম এবং ইবনে ইসহাক রহ.-এর বর্ণনায় এই ঘটনাটি সরাসরি নাজরানের খ্রিষ্টান এবং রাজা যুনুওয়াসের সাথে যুক্ত। তারা ওয়াহব বিন মুনাব্বিহ-এর সূত্রে এই তথ্যটি উপস্থাপন করেছেন। ইবনে হিশাম রহ. উল্লেখ করেছেন যে, নাজরানে খ্রিষ্টধর্মের বিস্তার ঘটেছিল আব্দুল্লাহ বিন সামিরের প্রচেষ্টায় এবং পরবর্তীতে এটিই সেখানে প্রধান ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় [7] । এই দুই ধরণের বর্ণনার মধ্যে একটি আপাত বৈপরীত্য থাকলেও, প্রকৃতপক্ষে এটি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির একটি উদাহরণ। অর্থাৎ, 'উখদুদ' বা খন্দক পদ্ধতিটি স্বৈরাচারী শাসকদের একটি পরিচিত অস্ত্র ছিল, যা বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে।
গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণে দেখা যায়, নাজরানের ঘটনাটি মক্কার ভৌগোলিক এবং সাময়িক অবস্থানের সাথে অধিকতর সংগতিপূর্ণ। অনেক গবেষক মনে করেন, কুরআনে বর্ণিত আসহাবুল উখদুদ-এর ঘটনাটি নাজরানের খ্রিষ্টানদের ওপর যুনুওয়াসের নির্যাতনেরই প্রতিফলন, কারণ এটি তৎকালীন আরবদের কাছে অধিক পরিচিত ছিল [8] । এই হিস্টোরিওগ্রাফিক ভিন্নতা আমাদের শেখায় যে, পবিত্র কুরআনের বর্ণনাটি কেবল একটি নির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ নয়, বরং এটি একটি চিরন্তন সত্যের উপস্থাপনা—যেখানে সত্যের পথে চলা মুমিনদের পরীক্ষা এবং জালিমের পরাজয় অনিবার্য।
জিও-পলিটিক্যাল ইমপ্লিকেশন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
নাজরানের গণহত্যা কেবল দক্ষিণ আরবের অভ্যন্তরীণ ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি একটি আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নেয়। তৎকালীন বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি ছিল একটি 'ক্যাটালিস্ট' বা অনুঘটক, যা আকসুম সাম্রাজ্য এবং হিময়ারি সাম্রাজ্যের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে। নাজরানের খ্রিষ্টানদের ওপর এই নির্মম নির্যাতনের খবর যখন ইথিওপিয়ার আকসুমীয় সম্রাট আবহা (বা কালেব)-এর কাছে পৌঁছাল, তখন তিনি একে কেবল ধর্মীয় নিপীড়ন হিসেবে নয়, বরং তার প্রভাব বলয়ে (Sphere of Influence) একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করলেন।
আকসুমীয় সাম্রাজ্যের এই হস্তক্ষেপ ছিল মূলত 'কালেক্টিভ সিকিউরিটি' বা সমষ্টিগত নিরাপত্তার একটি আদি রূপ, যদিও এর পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থ বিদ্যমান ছিল। সম্রাট আবহা একটি বিশাল নৌবাহিনী এবং সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন, যার লক্ষ্য ছিল যুনুওয়াসের পতন ঘটানো এবং নাজরানের খ্রিষ্টানদের রক্ষা করা। এই সামরিক অভিযানটি দক্ষিণ আরবের রাজনৈতিক মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে দেয়। যুনুওয়াসের পতন ঘটে এবং হিময়ারি সাম্রাজ্যের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয়, যার ফলে দক্ষিণ আরব আকসুমীয় প্রভাবের অধীনে চলে আসে [9] ।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় আমরা 'প্রক্সি ওয়ার' বা ছায়াযুদ্ধের লক্ষণ দেখতে পাই। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য সরাসরি যুদ্ধে না নামলেও তারা আকসুমীয়দের সমর্থন প্রদান করেছিল, যাতে করে আরবের দক্ষিণ প্রান্তে তাদের মিত্র খ্রিষ্টানদের আধিপত্য বজায় থাকে এবং পারস্য সাম্রাজ্যের প্রভাব সীমিত হয়। এভাবে নাজরানের খ্রিষ্টানদের ওপর যুনুওয়াসের নির্যাতন কেবল একটি ধর্মীয় ট্র্যাজেডি ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক দাবার একটি চাল। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় নিপীড়ন প্রায়শই বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং এর প্রতিক্রিয়া অনেক সময় সাম্রাজ্যের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায় [10] ।