খণ্ড 90
ফন্ট:100%
থিম:

অধ্যায় ৪: তাহরীফ (Tahrif) ও টেক্সচুয়াল ক্রিটিসিজম (Textual Criticism): তাওরাত ও ইঞ্জিলের ঐতিহাসিক ব্যবচ্ছেদ

মানব সভ্যতার জ্ঞানতাত্ত্বিক ও ধর্মতাত্ত্বিক ইতিহাসে আসমানি কিতাবসমূহের সংরক্ষণ ও বিবর্তন একটি অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল আলোচনার বিষয়। যখন আমরা 'তাহরীফ' (Tahrif) বা বিকৃতি শব্দটির প্রেক্ষাপটে তাওরাত ও ইঞ্জিলের ঐতিহাসিক ব্যবচ্ছেদ করি, তখন এটি কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয় থাকে না, বরং এটি হয়ে ওঠে ভাষাতাত্ত্বিক (Linguistic), পাণ্ডুলিপিগত (Paleographic) এবং ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitical) বিশ্লেষণের একটি সমন্বিত ক্ষেত্র। টেক্সচুয়াল ক্রিটিসিজম বা পাঠ্য সমালোচনা পদ্ধতির মাধ্যমে যখন প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের মূল পাঠ ও বর্তমান প্রচলিত পাঠের মধ্যে ব্যবধান নির্ণয় করা হয়, তখন দেখা যায় যে, ঐশ্বরিক বাণীর বিশুদ্ধতা রক্ষায় মানবসৃষ্ট বিভিন্ন হস্তক্ষেপের ফলে মূল নির্যাসটি বহুস্তরীয় বিবর্তনের মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত হয়েছে।

ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাওরাত ও ইঞ্জিলের ক্ষেত্রে এই বিকৃতি বা তাহরীফ কেবল আকস্মিক কোনো ভুল নয়, বরং এটি ছিল দীর্ঘস্থায়ী ভাষাতাত্ত্বিক কারসাজি এবং তাত্ত্বিক অপব্যাখ্যার একটি সম্মিলিত প্রক্রিয়া। মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত অভিমত হলো যে, পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবসমূহে ইচ্ছাকৃতভাবে বা অনুবাদের ত্রুটির কারণে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে [1] । এই পরিবর্তনগুলো মূলত টেক্সট বা পাঠ্যের কাঠামোগত পরিবর্তন এবং এর অন্তর্নিহিত অর্থের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে, যা পরবর্তীকালে নতুন নতুন ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদের জন্ম দিয়েছে।

তাওরাতের ভাষাতাত্ত্বিক কারসাজি ও ত্রিত্ববাদের অপব্যাখ্যা

তাওরাতের ঐতিহাসিক ব্যবচ্ছেদ করতে গেলে আমাদের প্রথমেই দৃষ্টিপাত করতে হবে এর ভাষাতাত্ত্বিক ও ব্যাকরণগত কাঠামোর ওপর। প্রাচীন হিব্রু ও পরবর্তীকালের অনুবাদগুলোতে এমন কিছু শব্দ ও বাক্যরীতি ব্যবহার করা হয়েছে, যা মূলত একত্ববাদের (Tawhid) পরিবর্তে বহুত্ববাদ বা ত্রিত্ববাদের (Trinity) ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। গবেষক ও ইতিহাসবিদরা লক্ষ্য করেছেন যে, তাওরাতের কিছু নির্দিষ্ট অংশে ব্যবহৃত বহুবচন বা 'Plurality' সংক্রান্ত শব্দগুলোকে অত্যন্ত কৌশলে ব্যবহার করে ঈশ্বরকে একটি 'গোষ্ঠী' বা 'বহুত্বের সত্তা' হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে।

এর একটি প্রকট উদাহরণ হলো তাওরাতের সৃষ্টিতত্ত্ব সংক্রান্ত বর্ণনা। যেখানে ঈশ্বর মানুষের সৃষ্টি সম্পর্কে কথা বলেন, সেখানে ব্যবহৃত শব্দচয়নকে কেন্দ্র করে খ্রিস্টান ধর্মতাত্ত্বিকরা তাদের ত্রিত্ববাদী মতবাদকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। যেমনটি নিম্নোক্ত আয়াতে বা বর্ণনায় লক্ষ্য করা যায়:

وَقَالَ اللهُ نَعْمَلُ الْإِنْسَانَ عَلَى صُورتِنَا كَشَبَهِنَا

[2]

উপরোক্ত আরবি ইবারতটি (সফরে তেকিন, অধ্যায় ১) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে 'نعمل' (আমরা কাজ করি) এবং 'صورتنا' (আমাদের প্রতিচ্ছবি) শব্দগুলোর বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। তাত্ত্বিক বিশ্লেষকগণ দেখিয়েছেন যে, খ্রিস্টান পণ্ডিতগণ এই বহুবচন শব্দগুলোকে ব্যবহার করে দাবি করেন যে, ঈশ্বর এখানে একটি 'গোষ্ঠী' বা 'ত্রিত্ব' হিসেবে কথা বলছেন। অথচ ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এটি 'Majestic Plural' বা সম্মানসূচক বহুবচন হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল, যা মূলত একক সত্তার মহিমা প্রকাশ করে। কিন্তু তারা এই ভাষাতাত্ত্বিক সূক্ষ্মতাকে এড়িয়ে গিয়ে একে বহুত্বের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

এই ধরনের ভাষাতাত্ত্বিক কারসাজি কেবল শব্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাওরাতের এই অপব্যাখ্যা বা তাহরীফ মূলত একটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যাতে তৎকালীন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারে। যখন কোনো পবিত্র গ্রন্থে 'আমরা' বা 'আমাদের' শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়, তখন তা মূলত ঐশ্বরিক মহিমা প্রকাশের একটি শৈলী মাত্র, কিন্তু তা থেকে ত্রিত্ববাদের মতো জটিল ও বিতর্কিত মতবাদ উদ্ভাবন করা ছিল একটি সুপরিকল্পিত তাত্ত্বিক বিচ্যুতি [3]

ইঞ্জিলের পাণ্ডুলিপিগত বিচ্যুতি ও টেক্সচুয়াল ক্রিটিসিজম

ইঞ্জিল বা সুসমাচারের ক্ষেত্রে তাহরীফের বিষয়টি আরও বেশি জটিল এবং এটি সরাসরি পাণ্ডুলিপিগত বিচ্যুতি ও ঐতিহাসিক সময়ের ব্যবধানের সাথে জড়িত। ইঞ্জিলের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর লিখনকাল এবং বর্তমান প্রচলিত সংস্করণগুলোর মধ্যে একটি বিশাল ব্যবধান বিদ্যমান। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ইঞ্জিলসমূহের লিখনকাল মূলত খ্রিস্টীয় ৬৫ থেকে ৬৭ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ে হয়ে থাকে [4] । এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান এবং মৌখিক বর্ণনা থেকে লিখিত পাঠে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি টেক্সচুয়াল ক্রিটিসিজমের দৃষ্টিতে অত্যন্ত সন্দেহজনক।

টেক্সচুয়াল ক্রিটিসিজম বা পাঠ্য সমালোচনার মাধ্যমে যখন ইঞ্জিলের বিভিন্ন সংস্করণ পরীক্ষা করা হয়, তখন দেখা যায় যে, চারজন সুসমাচার লেখকের (মথি, মার্ক, লূক ও যোহন) বর্ণনার মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যিশু বা ঈসা সা.-এর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি মথি, মার্ক, লূক ও যোহন—প্রত্যেকটি ইঞ্জিলে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বর্ণিত হয়েছে [5] । এই বৈচিত্র্য কেবল বর্ণনামূলক নয়, বরং এটি ইঞ্জিলের মূল পাঠের বিশুদ্ধতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করে।

পাণ্ডুলিপিগত বিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, চার্চ বা গির্জা কর্তৃক অনুমোদিত সংস্করণের বাইরেও অনেক প্রাচীন ও ভিন্নধর্মী সংস্করণ বা পাণ্ডুলিপি বিদ্যমান। যেমনটি দেখা যায় ইরাসমাস (Erasmus) কর্তৃক উপস্থাপিত প্রাচীন ইঞ্জিলী সংস্করণগুলোর ক্ষেত্রে, যা চার্চের প্রথাগত সংস্করণের চেয়ে ভিন্ন ছিল [6] । এই বৈচিত্র্য প্রমাণ করে যে, ইঞ্জিল কোনো একক ও অপরিবর্তনীয় গ্রন্থ হিসেবে সংরক্ষিত থাকেনি; বরং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক স্বার্থে এর পাঠ্য বা টেক্সট পরিবর্তন ও পরিমার্জন করা হয়েছে। এমনকি মার্টিন লুথারের মতো সংস্কারবাদীরাও ইঞ্জিলের বিভিন্ন অনুবাদের মাধ্যমে নতুন নতুন তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, যা প্রমাণ করে যে ইঞ্জিলের পাঠ্যটি সময়ের সাথে সাথে বিবর্তিত ও পরিবর্তিত হয়েছে [7]

ধর্মতাত্ত্বিক বিবর্তন ও ইউরোপীয় রেনেসাঁর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

তাহরীফ বা ধর্মগ্রন্থের বিকৃতি কেবল ধর্মীয় আলোচনার বিষয় নয়, এটি ইউরোপের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তনের সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইউরোপীয় রেনেসাঁ এবং পরবর্তীকালে প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলনের (Protestant Reformation) প্রেক্ষাপটে ইঞ্জিলের পাঠ্যগত পরিবর্তনগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যখন ইউরোপীয় সমাজ মধ্যযুগীয় ক্যাথলিক আধিপত্য থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিল, তখন ইঞ্জিলের বিভিন্ন অনুবাদের মাধ্যমে নতুন নতুন ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদ প্রচার করা হচ্ছিল।

মজার বিষয় হলো, ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও আধুনিক চিন্তাধারার বিকাশে ইসলামি সভ্যতার প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য। উসমানীয় সাম্রাজ্যের উত্থান এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে এক বিশাল পরিবর্তন এনেছিল [8] । অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, ইউরোপীয় সংস্কারবাদীরা যখন ক্যাথলিক চার্চের কঠোর ও ত্রিত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন, তখন তারা প্রকারান্তরে ইসলামের একত্ববাদী দর্শনের একটি পরোক্ষ প্রভাব অনুভব করছিলেন। এমনকি ভলতেয়ারের মতো দার্শনিকগণও খ্রিস্টান চার্চের গোঁড়ামি ও ত্রিত্ববাদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছিলেন, যদিও তিনি সরাসরি ইসলামকে গ্রহণ করেননি [9]

ভূ-রাজনৈতিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব কেবল ধর্মীয় ছিল না, বরং এটি ছিল ক্ষমতার লড়াই। এই লড়াইয়ে ইঞ্জিলের পাঠ্য বা টেক্সটকে নিজেদের অনুকূলে ব্যবহার করা হয়েছিল। যেমনটি দেখা যায়, স্পেনের ক্যাথলিক শাসকরা যখন মুসলিমদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখন তা ছিল মূলত একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যা জনগণের স্বার্থের চেয়ে চার্চের কর্তৃত্বকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিল [10] । সুতরাং, তাওরাত ও ইঞ্জিলের ঐতিহাসিক ব্যবচ্ছেদ করলে আমরা দেখতে পাই যে, ধর্মগ্রন্থের পাঠ্যগত পরিবর্তন বা তাহরীফ কেবল ভুলবশত হয়নি, বরং এটি ছিল ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল এবং সামাজিক পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

""
অধ্যায় ৪: তাহরীফ (Tahrif) ও টেক্সচুয়াল ক্রিটিসিজম (Textual Criticism): তাওরাত ও ইঞ্জিলের ঐতিহাসিক ব্যবচ্ছেদ
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

অধ্যায় ৪: তাহরীফ (Tahrif) ও টেক্সচুয়াল ক্রিটিসিজম (Textual Criticism): তাওরাত ও ইঞ্জিলের ঐতিহাসিক ব্যবচ্ছেদ কুইজ

1 / 5

ধর্মতত্ত্বে 'তাহরীফ' (Tahrif) বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...