খণ্ড ৩৮: বির মাউনা ও রাজীর মর্মান্তিক ঘটনা: সাহাবিদের আত্মদান ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংকট
উহুদ যুদ্ধের পরবর্তী সময়কালটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের জন্য এক অত্যন্ত নাজুক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অধ্যায়। উহুদের ময়দানে মুসলিম বাহিনীর সাময়িক বিপর্যয় এবং কুরাইশদের রণকৌশলগত আগ্রাসন মদিনার চারপাশে অবস্থানরত বেদুইন ও মুশরিক গোত্রগুলোকে এক নতুন সমীকরণের দিকে ঠেলে দেয়। তারা মদিনা রাষ্ট্রের সামরিক ও কৌশলগত শক্তিকে দুর্বল মনে করতে শুরু করে। এই সুযোগে ইসলামের ক্রমবর্ধমান দাওয়াতী মিশনকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা এবং মদিনার সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য মক্কার কুরাইশ ও তাদের মিত্র গোত্রগুলো এক গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বুনে। এই ষড়যন্ত্রেরই চরম ও নৃশংস বহিঃপ্রকাশ ঘটে হিজরি চতুর্থ সালের সফর মাসে সংঘটিত 'রাজী' এবং 'বির মাউনা'-র দুটি পৃথক কিন্তু সমান্তরাল বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনায়। এই দুই ট্র্যাজেডিতে মদিনা রাষ্ট্র তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের—যারা ছিলেন একাধারে কুরআনের হাফেজ, শিক্ষক এবং দক্ষ কূটনীতিক—হারায়। এটি কেবল একটি ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক বিপর্যয় ছিল না, বরং এটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় ধরনের গোয়েন্দা ব্যর্থতা (Intelligence Failure) এবং চরম রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংকট (State Security Crisis)।
১. রাজী-র বিশ্বাসঘাতকতা: বনু লিহয়ানের ষড়যন্ত্র ও আসেম ইবনে ছাবিত (রা.)-এর বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ
হিজরি চতুর্থ সালের সফর মাসে (মতান্তরে তৃতীয় হিজরির শেষভাগে) আদল ও আল-কারাহ গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল মদিনায় রাসুলুল্লাহ সা.-এর দরবারে উপস্থিত হয়। তারা অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেদের ইসলাম গ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করে এবং তাদের গোত্রের লোকদের কুরআন ও দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য কয়েকজন যোগ্য শিক্ষক প্রেরণের আবেদন জানায়। রাসুলুল্লাহ সা. তাদের সরল বিশ্বাসে গ্রহণ করেন এবং আসেম ইবনে ছাবিত রা.-এর নেতৃত্বে দশজন (মতান্তরে সাতজন) বিশিষ্ট সাহাবির একটি দাওয়াতী দল প্রেরণ করেন [1] । এই মিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও শিক্ষামূলক। কিন্তু এই প্রতিনিধি দলটি যখন মক্কা ও আসফানের মধ্যবর্তী 'রাজী' নামক একটি পানির কূপের নিকটে পৌঁছায়, তখন আদল ও আল-কারাহ গোত্রের লোকেরা তাদের পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র অনুযায়ী চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে। তারা মক্কার বনু লিহয়ান গোত্রকে খবর দেয়, যারা উহুদ যুদ্ধে তাদের নিহত নেতাদের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য উন্মুখ ছিল। মুহূর্তের মধ্যে প্রায় একশত দক্ষ তীরন্দাজসহ বনু লিহয়ানের এক বিশাল বাহিনী নিরস্ত্র বা স্বল্প অস্ত্রধারী সাহাবিদের চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে [2] ।
এই চরম সংকটের মুহূর্তে বনু লিহয়ান সাহাবিদের জীবন রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায়। কিন্তু আসেম ইবনে ছাবিত রা. মুশরিকদের এই কপট প্রতিশ্রুতি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, কোনো মুমিন কখনো মুশরিকদের চুক্তির ওপর ভরসা করে আত্মসমর্পণ করতে পারে না। তিনি আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন যেন তাদের এই করুণ পরিস্থিতি ও বীরত্বের খবর রাসুলুল্লাহ সা.-এর নিকট পৌঁছে দেওয়া হয়। সহীহ বুখারীতে আসেম রা.-এর সেই আকুল প্রার্থনা এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
অনুবাদ: "হে আল্লাহ! আমাদের এই অবস্থা সম্পর্কে আপনার নবিকে অবহিত করুন।" [3] আসেম রা. এবং তাঁর সঙ্গীগণ অত্যন্ত বীরত্বের সাথে লড়াই করে শাহাদাত বরণ করেন। বনু লিহয়ানের মুশরিকরা আসেম রা.-এর পবিত্র দেহের একটি অংশ কেটে মক্কার কুরাইশদের নিকট বিক্রি করতে চেয়েছিল, কারণ উহুদ যুদ্ধে আসেম রা. কুরাইশদের এক প্রভাবশালী নেতাকে হত্যা করেছিলেন এবং তার মা মানত করেছিল যে আসেমের মাথার খুলিতে সে মদ পান করবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দার লাশকে মুশরিকদের স্পর্শ থেকে রক্ষা করার জন্য এক অলৌকিক ব্যবস্থা করেন। এক ঝাঁক মৌমাছি বা ভিমরুল এসে তাঁর দেহকে এমনভাবে আবৃত করে ফেলে যে, কোনো মুশরিক তাঁর দেহের কাছে ঘেঁষতে পারেনি। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম তাঁর গ্রন্থে এই অলৌকিক সুরক্ষার বিবরণ দিয়ে লিখেছেন:
অনুবাদ: "অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাঁর ওপর মেঘের ছায়ার মতো এক ঝাঁক ভিমরুল প্রেরণ করলেন, যা তাকে তাদের দূতদের হাত থেকে রক্ষা করল। ফলে তারা তাঁর দেহ থেকে কোনো অংশই কেটে নিতে সক্ষম হয়নি।" [4] পরবর্তীতে রাতে প্রবল বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল এসে আসেম রা.-এর পবিত্র দেহকে এমন এক অজ্ঞাত স্থানে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, যা মুশরিকদের নাগালের বাইরে চলে যায়। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর মুখলিস বান্দাদের জীবিতাবস্থায় যেমন রক্ষা করেন, মৃত্যুর পরও তাদের মর্যাদা ও পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রাখেন [5] ।
২. খুবাইব ইবনে আদি (রা.) ও যায়েদ ইবনে দাসিনাহ (রা.)-এর বন্দিত্ব এবং মক্কার চরম নৃশংসতা
রাজীর সেই নৃশংস হামলায় সমস্ত সাহাবি তাৎক্ষণিকভাবে শহীদ হননি। খুবাইব ইবনে আদি রা., যায়েদ ইবনে দাসিনাহ রা. এবং আবদুল্লাহ ইবনে তারিক রা. নামক তিনজন সাহাবিকে বনু লিহয়ান জীবিত অবস্থায় বন্দি করতে সক্ষম হয়। তারা এই বন্দিদের মক্কার বাজারে চড়া মূল্যে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে নিয়ে রওনা হয়। পথিমধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে তারিক রা. তাদের বাঁধন মুক্ত করে লড়াই করার চেষ্টা করলে মুশরিকরা তাঁকে পাথর ছুড়ে নির্মমভাবে শহীদ করে [6] । অবশিষ্ট দুই সাহাবি, খুবাইব রা. এবং যায়েদ রা.-কে মক্কায় নিয়ে যাওয়া হয়। মক্কার কুরাইশরা, বিশেষ করে বদর যুদ্ধে নিহতদের পরিবারগুলো, এই দুই মহান সাহাবিকে ক্রয়ের জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। অবশেষে খুবাইব রা.-কে হারিছ ইবনে আমিরের সন্তানেরা ক্রয় করে, যাকে খুবাইব রা. বদরের যুদ্ধে হত্যা করেছিলেন। অন্যদিকে যায়েদ ইবনে দাসিনাহ রা.-কে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া ক্রয় করে তার পিতা উমাইয়া ইবনে খালাফের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য [7] ।
মক্কায় বন্দি অবস্থায় খুবাইব রা. যে অটল ঈমান ও অলৌকিক চারিত্রিক দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছিলেন, তা ইসলামের ইতিহাসে এক সোনালী অধ্যায়। হারিছ ইবনে আমিরের কন্যা (পরবর্তীতে যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন) বর্ণনা করেন যে, তিনি খুবাইব রা.-কে লোহার শিকলে বন্দি অবস্থায় এমন এক সময়ে তাজা আঙুরের থোকা থেকে আঙুর খেতে দেখেছেন, যখন সমগ্র মক্কায় কোনো আঙুর পাওয়া যেত না এবং খুবাইবও ছিলেন সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ। এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর প্রিয় বান্দার জন্য প্রেরিত বিশেষ রিযিক বা কারামাত [8] । বন্দিত্বের মেয়াদ শেষ হলে কুরাইশরা এই দুই সাহাবিকে মক্কার হারাম সীমানার বাইরে তানঈম নামক স্থানে নিয়ে যায় জনসমক্ষে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করার জন্য। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও খুবাইব রা. অত্যন্ত শান্ত ও অবিচল ছিলেন। তিনি ঘাতকদের নিকট মাত্র দুই রাকাত নামাজ আদায়ের অনুমতি চান। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু পরম একাগ্রতার সাথে নামাজ শেষ করে তিনি বলেন, "আল্লাহর কসম! তোমরা যদি মনে না করতে যে আমি মৃত্যুর ভয়ে নামাজ দীর্ঘ করছি, তবে আমি আরও দীর্ঘ সময় ধরে নামাজ আদায় করতাম।" [9] । খুবাইব রা.-এর এই সুন্নাতই পরবর্তীতে মুসলিম উম্মাহর জন্য শাহাদাতের পূর্বে দুই রাকাত নামাজ আদায়ের এক ঐতিহাসিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়।
ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানোর পূর্বে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান যায়েদ ইবনে দাসিনাহ রা.-কে লক্ষ্য করে এক মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। সে জিজ্ঞেস করে, "হে যায়েদ! আমি তোমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, তুমি কি এটা পছন্দ করো যে আজ তোমার স্থানে মুহাম্মাদ (সা.) আমাদের হাতে বন্দি থাকুন এবং আমরা তাঁর শিরশ্ছেদ করি, আর তুমি তোমার পরিবারের কাছে নিরাপদে ফিরে যাও?" এই কঠিন মুহূর্তে যায়েদ রা. যে উত্তর দিয়েছিলেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত ঈমানদারদের জন্য ভালোবাসার এক অনন্য মানদণ্ড হয়ে থাকবে। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উত্তর দেন:
অনুবাদ: "আল্লাহর কসম! আমি নিজের পরিবারে নিরাপদে বসে থাকব আর রাসুলুল্লাহ সা. যেখানে আছেন সেখানে তাঁর গায়ে একটি কাঁটার আঁচড় লাগবে—এটিও আমি কখনো সহ্য করতে পারি না।" [10] এই উত্তর শুনে আবু সুফিয়ান বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় এবং মন্তব্য করে, "আমি মানুষের মধ্যে কাউকে অন্য কারও জন্য এমন গভীর ভালোবাসতে দেখিনি, যেমনটি মুহাম্মাদের সাহাবিরা মুহাম্মাদকে ভালোবাসে।" [11] । ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলন্ত অবস্থায় খুবাইব রা. যে কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন, তা ছিল তাওহীদের এক অমর সঙ্গীত:
অনুবাদ: "আমি যখন মুসলিম হিসেবে নিহত হচ্ছি, তখন আল্লাহর পথে আমার দেহটি কোন পাশে লুটিয়ে পড়ছে, তা নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র পরোয়া করি না।" [12] । এই দুই মহান সাহাবির শাহাদাত মক্কার মুশরিকদের নৈতিক পরাজয় এবং মুসলিমদের ঈমানী শ্রেষ্ঠত্বকে বিশ্ব দরবারে পুনর্প্রতিষ্ঠিত করে।
৩. বির মাউনার ট্র্যাজেডি: বনু আমিরের প্রতারণা ও সত্তরজন ক্বারীর শাহাদাত
রাজীর ঘটনার প্রায় সমসাময়িক সময়ে, হিজরি চতুর্থ সালের সফর মাসেই মদিনার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও বেদনাদায়ক ট্র্যাজেডিটি ঘটে, যা 'বির মাউনা'-র হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত। বনু আমির গোত্রের প্রভাবশালী নেতা আবু বারা আমির ইবনে মালিক (যিনি তাঁর যুদ্ধকৌশলের জন্য 'মুলাইবুল আসিন্না' বা বল্লভ নিয়ে ক্রীড়াকারী নামে পরিচিত ছিলেন) মদিনায় রাসুলুল্লাহ সা.-এর দরবারে আগমন করেন। রাসুলুল্লাহ সা. তাকে ইসলামের দাওয়াত দেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ না করলেও ইসলামের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করেন এবং বলেন, "হে মুহাম্মাদ! আপনি যদি আপনার সাহাবিদের একটি দলকে নজদবাসীর নিকট প্রেরণ করেন, তবে আমি আশা করি তারা আপনার দাওয়াত কবুল করবে।" রাসুলুল্লাহ সা. নজদবাসীদের কুখ্যাত বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস স্মরণ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বলেন, "আমি নজদবাসীদের পক্ষ থেকে আমার সাহাবিদের নিরাপত্তার ব্যাপারে আশঙ্কাবোধ করছি।" তখন আবু বারা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সাহাবিদের নিরাপত্তার ব্যক্তিগত গ্যারান্টি (Jiwar/Protection) প্রদান করে বলেন, "তারা আমার আশ্রয়ে থাকবে, নজদবাসী তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।" [13] ।
তৎকালীন আরব সমাজে 'জিওয়ার' বা আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি ছিল অত্যন্ত পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয় একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রোটোকল। আবু বারার মতো একজন প্রভাবশালী নেতার গ্যারান্টির ওপর ভিত্তি করে রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার শ্রেষ্ঠ সত্তরজন সাহাবির একটি দল নজদে প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেন। এই দলটির নেতৃত্বে ছিলেন আল-মুনযির ইবনে আমর রা.। এই সত্তরজন সাহাবি সাধারণ কোনো ব্যক্তি ছিলেন না; তারা ছিলেন 'আসহাবুশ শুফফা'-র অন্তর্ভুক্ত, যারা দিনে কাঠ কেটে জীবিকা নির্বাহ করতেন এবং রাতে গভীর মনোযোগের সাথে কুরআন অধ্যয়ন ও নামাজে লিপ্ত থাকতেন। তারা ইসলামের ইতিহাসে 'ক্বারী' (কুরআন বিশেষজ্ঞ) নামে সুপরিচিত ছিলেন [14] । এই দলটি যখন নজদ ও বনু আমিরের মধ্যবর্তী 'বির মাউনা' (মাউনার কূপ) নামক স্থানে পৌঁছায়, তখন তারা সেখানে যাত্রাবিরতি করেন। সেখান থেকে হারাম ইবনে মিলহান রা. রাসুলুল্লাহ সা.-এর একটি পবিত্র চিঠি নিয়ে বনু আমিরের অন্যতম প্রধান নেতা এবং আবু বারার ভাতিজা আমির ইবনে তুফাইলের নিকট গমন করেন [15] ।
আমির ইবনে তুফাইল ছিল চরম অহংকারী ও ইসলামবিদ্বেষী। সে রাসুলুল্লাহ সা.-এর চিঠিটি পড়ারও প্রয়োজন মনে করেনি। সে কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও আরবের ঐতিহ্যবাহী মেহমানদারির সমস্ত নীতি লঙ্ঘন করে তার এক সহযোগীকে নির্দেশ দেয় হারাম ইবনে মিলহান রা.-কে পেছন থেকে বল্লভ দিয়ে আঘাত করার জন্য। বল্লভটি যখন হারাম রা.-এর পিঠ ফুঁড়ে বুক দিয়ে বের হয়ে যায়, তখন তিনি নিজের রক্ত দুই হাতে মেখে মুখে ও মাথায় মাখতে মাখতে এক ঐতিহাসিক ও ঈমানদীপ্ত চিৎকার করে ওঠেন:
অনুবাদ: "আল্লাহু আকবার! কাবার রবের কসম, আমি সফল হয়ে গেছি!" [16] এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পর আমির ইবনে তুফাইল বনু আমির গোত্রকে বাকি সাহাবিদের ওপর আক্রমণ করার জন্য আহ্বান জানায়। কিন্তু বনু আমিরের লোকেরা তাদের নেতা আবু বারার দেওয়া আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতির কারণে এই অন্যায় আক্রমণে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আমির ইবনে তুফাইল বনু সুলাইম গোত্রের তিনটি উগ্র উপগোত্র—রিল, যাকওয়ান এবং উসাইয়্যা-কে প্ররোচিত করে। এই গোত্রগুলো তাদের বিশাল বাহিনী নিয়ে বির মাউনায় অবস্থানরত নিরস্ত্র ও অপ্রস্তুত সাহাবিদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। সাহাবিগণ বীরত্বের সাথে তাদের তলোয়ার নিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন, কিন্তু বিশাল শত্রু বাহিনীর সামনে তারা একে একে শাহাদাতের সুধা পান করেন। এই ভয়াবহ গণহত্যায় সত্তরজন ক্বারীর প্রায় সকলেই শহীদ হন। কেবল কাব ইবনে যায়েদ রা. মারাত্মকভাবে আহত অবস্থায় লাশের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে বেঁচে যান (যিনি পরবর্তীতে খন্দকের যুদ্ধে শহীদ হন) এবং আমর ইবনে উমাইয়া আদ-দামরি রা., যিনি সেই সময় সাহাবিদের উট চড়াতে চারণভূমিতে থাকায় রক্ষা পেয়েছিলেন [17] । এই ট্র্যাজেডি মদিনা রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের ওপর এক অপূরণীয় আঘাত হেনেছিল।
৪. রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংকট, কূটনৈতিক জটিলতা ও বনু নাযিরের রক্তপণ বিতর্ক
বির মাউনার এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি কেবল একটি মানবিক বিপর্যয় ছিল না, বরং এটি মদিনা রাষ্ট্রের জন্য এক গভীর কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেয়। এই ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ও জীবিত উত্তরসূরি আমর ইবনে উমাইয়া আদ-দামরি রা. যখন মদিনার উদ্দেশ্যে ফিরছিলেন, তখন পথিমধ্যে তিনি বনু আমির গোত্রের দুই ব্যক্তির মুখোমুখি হন। আমর রা. তখনো জানতেন না যে বনু আমির গোত্র এই গণহত্যায় অংশ নিতে অস্বীকার করেছিল এবং তাদের সাথে রাসুলুল্লাহ সা.-এর একটি শান্তি চুক্তি বা নিরাপত্তা চুক্তি (Aman) বলবৎ ছিল। তিনি বির মাউনার প্রতিশোধ নেওয়ার তীব্র ক্ষোভ থেকে সেই দুই ব্যক্তিকে হত্যা করেন। মদিনায় পৌঁছে যখন তিনি রাসুলুল্লাহ সা.-কে এই ঘটনা অবহিত করেন, তখন রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত ব্যথিত ও চিন্তিত হয়ে পড়েন। কারণ, মদিনা রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ও আন্তঃগোত্রীয় চুক্তির প্রতি সর্বদা শ্রদ্ধাশীল ছিল, শত্রু গোত্রের কোনো সদস্যের সাথে চুক্তি থাকলে তা ভঙ্গ করা ইসলামের রাষ্ট্রীয় নীতির পরিপন্থী ছিল [18] ।
রাসুলুল্লাহ সা. আমর ইবনে উমাইয়া রা.-কে লক্ষ্য করে বলেন, "তুমি এমন দুই ব্যক্তিকে হত্যা করেছ, যাদের রক্তপণ (Diyyah) পরিশোধ করা আমার জন্য আবশ্যক।" সহীহ বুখারীতে এই কূটনৈতিক সংকটের বিবরণ এভাবে এসেছে:
অনুবাদ: "তুমি এমন দুই ব্যক্তিকে হত্যা করেছ, আমি অবশ্যই তাদের রক্তপণ আদায় করব।" [19] এই রক্তপণ পরিশোধের আইনি ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকেই মদিনার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক নতুন মোড় ঘোরে। মদিনার ইহুদি গোত্র বনু নাযিরের সাথে বনু আমিরের একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ও সহযোগিতা চুক্তি ছিল। মদিনা সনদের (Constitution of Madinah) ধারা অনুযায়ী, মদিনার কোনো মিত্র গোত্র যদি কোনো বহিঃস্থ গোত্রের সাথে রক্তপণের সংকটে পড়ে, তবে মদিনার অন্যান্য শরিক গোত্রগুলোকেও সেই রক্তপণের অংশীদার হতে হতো। এই যৌথ নিরাপত্তা (Collective Security) প্রোটোকলের অধীনে রাসুলুল্লাহ সা. আবু বকর রা., উমর রা. এবং আলি রা.-সহ কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবিকে নিয়ে বনু নাযিরের দুর্গে গমন করেন তাদের অংশের রক্তপণ দাবি করার জন্য [20] ।
বনু নাযিরের ইহুদিরা বাহ্যিকভাবে রাসুলুল্লাহ সা.-কে স্বাগত জানায় এবং রক্তপণ পরিশোধে সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। কিন্তু পর্দার আড়ালে তারা এক চরম ও জঘন্য ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা করে। তারা ভাবল, মুহাম্মাদ সা. আজ অত্যন্ত অল্প কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে তাদের দুর্গের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন; এটাই তাকে চিরতরে নির্মূল করার সুবর্ণ সুযোগ। তারা তাদের এক লোক আমর ইবনে জিহাসকে দুর্গের ছাদ থেকে একটি বিশাল পাথর রাসুলুল্লাহ সা.-এর মাথার ওপর ফেলে তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়। কিন্তু আল্লাহর বিশেষ সুরক্ষায় জিবরাইল আ. রাসুলুল্লাহ সা.-কে এই ষড়যন্ত্রের কথা তাৎক্ষণিকভাবে জানিয়ে দেন। রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত শান্তভাবে সেখান থেকে উঠে মদিনার দিকে রওনা হন। বনু নাযিরের এই চরম বিশ্বাসঘাতকতা মদিনা সনদের সরাসরি লঙ্ঘন ছিল, যা পরবর্তীতে তাদের মদিনা থেকে বহিষ্কারের সামরিক অভিযানের পথ সুগম করে [21] । এভাবে বির মাউনার ঘটনাটি মদিনার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরাপত্তা সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
৫. রাসুলুল্লাহ সা.-এর গভীর শোক ও কুদরত-ই-নাযিলাহ: একটি ভূ-রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
রাজী এবং বির মাউনার এই জোড়া ট্র্যাজেডির খবর যখন একই দিনে মদিনায় পৌঁছায়, তখন সমগ্র মদিনা জুড়ে এক গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর সুদীর্ঘ নবুওয়াতী জীবনে আর কোনো ঘটনায় এতটা মর্মাহত ও গভীরভাবে শোকগ্রস্ত হননি, যতটা এই দুই ঘটনায় তাঁর প্রিয় সাহাবিদের হারানোর ফলে হয়েছিলেন। শহীদ হওয়া এই সাহাবিগণ ছিলেন মদিনা রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ (Intellectual Capital)। তারা কেবল যোদ্ধা ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুতকৃত এক একটি জীবন্ত বাতিঘর। তাদের এই অকাল ও নৃশংস মৃত্যু মদিনার দাওয়াতী মিশনকে সাময়িকভাবে হলেও এক বড় ধরনের ধাক্কা দেয় [22] ।
এই চরম শোক ও রাষ্ট্রীয় সংকটের মুহূর্তে রাসুলুল্লাহ সা. এক অভূতপূর্ব আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি টানা এক মাস ধরে প্রতিদিনের ফরজ নামাজে, বিশেষ করে ফজর ও মাগরিবের নামাজে রুকু থেকে উঠে আল্লাহর দরবারে হাত তুলে এই নৃশংস হত্যাকারী গোত্রগুলোর ওপর লানত বর্ষণ করেন এবং তাদের কঠোর শাস্তির জন্য দোয়া করেন। ইসলামের ইতিহাসে এটি 'কুনুতে নাযিলাহ' (Qunut al-Nazilah) নামে পরিচিত। সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে:
অনুবাদ: "নিশ্চয়ই নবি সা. এক মাস পর্যন্ত কুনুত পাঠ করেছিলেন, যাতে তিনি রিল, যাকওয়ান ও উসাইয়্যা গোত্রের বিরুদ্ধে বদদোয়া করেছিলেন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্য হয়েছিল।" [23] এই কুনুতে নাযিলাহ কেবল একটি আধ্যাত্মিক প্রার্থনা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psychological Warfare) এবং ভূ-রাজনৈতিক বার্তা। এর মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. সমগ্র আরব উপদ্বীপের গোত্রগুলোকে এই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন যে, মদিনা রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ওপর সংঘটিত যেকোনো নৃশংসতার ঘটনাকে হালকাভাবে নেয় না। এটি মদিনার মুসলিমদের মনোবলকে পুনর্গঠিত করতে এবং শত্রুদের হৃদয়ে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভীতি তৈরি করতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল। এই দোয়ার মাধ্যমে মদিনার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও জাতীয় সংহতি আরও সুদৃঢ় হয় এবং মুনাফিকদের ষড়যন্ত্রের পথ রুদ্ধ হয়ে যায় [24] ।
রাজী ও বির মাউনার এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, একটি নবজাত রাষ্ট্রের পথচলা কখনোই মসৃণ হয় না। আদর্শিক লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে কেবল সামরিক শক্তিই যথেষ্ট নয়, বরং চরম আত্মত্যাগ, কূটনৈতিক দূরদর্শিতা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঠোর নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। সাহাবিদের এই আত্মদান মদিনা রাষ্ট্রকে আরও বেশি সতর্ক, সুসংগঠিত এবং প্রতিরক্ষামূলক কৌশলে দীক্ষিত হতে সাহায্য করেছিল, যা পরবর্তী বড় বড় বিজয়গুলোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।