খণ্ড 38
ফন্ট:100%
থিম:

১.২.২ 'দাই' (Dawah Workers) প্রেরণ: একটি আধুনিক 'সফট পাওয়ার' (Soft Power) মডেল

১.২.২ 'দাই' (Dawah Workers) প্রেরণ: একটি আধুনিক 'সফট পাওয়ার' (Soft Power) মডেল

ভূমিকা ও সফট পাওয়ার তত্ত্বের আলোকে ইসলামি দাওয়াত

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় 'সফট পাওয়ার' (Soft Power) বা 'নরম শক্তি' একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও যুগান্তকারী ধারণা। জোসেফ নাই (Joseph Nye) ১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে এই তত্ত্বটি প্রথম উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে, সফট পাওয়ার হলো সামরিক বা অর্থনৈতিক বলপ্রয়োগ (Hard Power) ব্যতিরেকে কেবল সাংস্কৃতিক আকর্ষণ, রাজনৈতিক আদর্শ এবং পররাষ্ট্রনীতির নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে অন্য কোনো পক্ষকে নিজের অনুকূলে উদ্বুদ্ধ ও আকর্ষিত করার ক্ষমতা [Nye, Joseph S. (2004).

Soft Power: The Means to Success in World Politics

]। এই আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রায় চৌদ্দশত বছর পূর্বে, মদিনা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ও মানবতার মুক্তিদূত হযরত মুহাম্মাদ সা. বিশ্ব ইতিহাসে সফট পাওয়ারের সবচেয়ে সফল, সুসংহত এবং প্রায়োগিক মডেল প্রদর্শন করেছিলেন। তিনি কোনো প্রকার সামরিক আগ্রাসন বা জবরদস্তির আশ্রয় না নিয়ে, কেবল তাওহিদের বাণী, চারিত্রিক সুষমা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আকর্ষণের মাধ্যমে মানুষের অন্তর জয় করার যে কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, তা-ই মূলত ইসলামি দাওয়াতের মূল ভিত্তি।

রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই দাওয়াতী কৌশল কেবল ধর্মীয় প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কূটনীতি। তৎকালীন আরবের যুদ্ধবিগ্রহক্লান্ত ও গোত্রীয় কোন্দলে জর্জরিত সমাজে তিনি এমন এক আদর্শিক বার্তা প্রেরণ করেছিলেন, যা মানুষের আত্মিক ও সামাজিক উভয় স্তরে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব সাধন করে। ইসলামি দাওয়াতের এই বিশ্বজনীন আবেদনকে ত্বরান্বিত করতে তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে যোগ্য, প্রজ্ঞাবান এবং স্থানীয় সংস্কৃতি ও মনস্তত্ত্বে পারদর্শী 'দাই' বা দাওয়াতী প্রতিনিধি প্রেরণ করেছিলেন। এই প্রতিনিধিগণ কেবল ধর্মীয় বাণী প্রচার করেননি, বরং তাঁরা ছিলেন মদিনা রাষ্ট্রের একেকজন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দূত, যাঁরা বলপ্রয়োগ ছাড়াই বিশাল জনপদের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন [ড. আকরাম জিয়া আল-উমারী,

মাদানি সমাজ: রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পুনর্গঠন, পৃষ্ঠা ১১২]।

ইসলামের এই দাওয়াতী মডেলের মূল শক্তি ছিল এর বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা এবং নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব। আল-কুরআনের ঘোষণা—"দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই"—এই মূলনীতিকে ধারণ করে রাসুলুল্লাহ সা. যে দাওয়াতী কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন, তা তৎকালীন পারস্য বা রোমান সাম্রাজ্যের চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতির বিপরীতে এক পরম মুক্তি ও সাম্যের বার্তা নিয়ে এসেছিল। এই মনস্তাত্ত্বিক আকর্ষণই ছিল ইসলামের সফট পাওয়ারের মূল উৎস, যা তৎকালীন বিশ্বব্যবস্থায় এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করেছিল [1]

মদিনায় প্রথম রাষ্ট্রদূত: মুসআব বিন উমাইর (রা.)-এর মিশন ও মনস্তাত্ত্বিক কূটনীতি

মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বে, আকাবার প্রথম শপথের পর, ইয়াসরিবের (মদিনা) নবদীক্ষিত মুসলিমদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়া এবং সেখানকার সাধারণ মানুষের মাঝে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সা. তরুণ সাহাবি মুসআব বিন উমাইর রা.-কে প্রথম দাই বা দূত হিসেবে প্রেরণ করেন। এই মনোনয়নটি ছিল অত্যন্ত কৌশলগত এবং দূরদর্শী। মুসআব রা. ছিলেন মক্কার এক অভিজাত ও সুশিক্ষিত পরিবারের সন্তান, যাঁর নম্রতা, বাগ্মিতা এবং মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। ইয়াসরিবে তাঁর এই মিশনটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম আনুষ্ঠানিক সফট পাওয়ার প্রয়োগের ঘটনা, যা কোনো প্রকার সামরিক শক্তি ছাড়াই একটি সম্পূর্ণ শহরের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে আমূল বদলে দিয়েছিল [2]

ইয়াসরিবে পৌঁছে মুসআব বিন উমাইর রা. আসআদ বিন জুরারাহ রা.-এর গৃহে অবস্থান করেন এবং অত্যন্ত ধীরস্থির ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দাওয়াতী কার্যক্রম শুরু করেন। তাঁর এই কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল মদিনার প্রভাবশালী আউস গোত্রের নেতা উসাইদ বিন হুদাইর এবং সা'দ বিন মুআযের মুখোমুখি হওয়া। উসাইদ বিন হুদাইর যখন ক্ষিপ্ত হয়ে বর্শা হাতে মুসআব রা.-কে তাড়িয়ে দিতে আসেন, তখন মুসআব রা. কোনো প্রকার উত্তেজনা বা ভীতি প্রদর্শন না করে অত্যন্ত শান্ত ও কূটনৈতিক ভাষায় বলেন: "আপনি কি একটু বসবেন এবং আমাদের কথা শুনবেন? যদি আমাদের কথা আপনার পছন্দ হয়, তবে তা গ্রহণ করবেন; আর যদি অপছন্দ হয়, তবে আমরা আপনার অনিচ্ছাকর বিষয়টি থেকে বিরত থাকব।" এই অহিংস ও যৌক্তিক প্রস্তাব উসাইদকে শান্ত করে এবং তিনি তাঁর বর্শা মাটিতে পুঁতে রেখে কথা শুনতে বসেন। মুসআব রা. যখন তাঁর সামনে কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করেন এবং ইসলামের সাম্যের বাণী তুলে ধরেন, তখন উসাইদের মন গলে যায় এবং তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন [3]

উসাইদ বিন হুদাইরের ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর মাধ্যমে আউস গোত্রের প্রধান নেতা সা'দ বিন মুআযও একইভাবে মুসআব রা.-এর কাছে আসেন এবং তাঁর শান্ত ও যুক্তিপূর্ণ উপস্থাপনায় মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। সা'দ বিন মুআযের ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে তাঁর পুরো গোত্র এক দিনে ইসলামে দীক্ষিত হয়। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, মুসআব রা. কেবল একজন ধর্মপ্রচারক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন দক্ষ মনস্তাত্ত্বিক কূটনীতিবিদ, যিনি প্রতিপক্ষের ক্ষোভকে শান্ত করে তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে জয় করতে পেরেছিলেন। কোনো প্রকার তরবারি বা বলপ্রয়োগ ছাড়াই মদিনার মতো একটি রণক্লান্ত ও গোত্রীয় কোন্দলে লিপ্ত শহরকে ইসলামের পতাকাতলে নিয়ে আসার এই ঘটনাটি বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সফট পাওয়ার মডেল হিসেবে স্বীকৃত [4]

ইয়েমেনে মুআয বিন জাবাল (রা.)-এর প্রেরণ: প্রশাসনিক ও বিচারিক সংস্কারের মাধ্যমে দাওয়াত

হিজরি নবম বা দশম সনে রাসুলুল্লাহ সা. ইয়েমেনের অধিবাসীদের কাছে ইসলাম প্রচার, কর আদায় এবং বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মুআয বিন জাবাল রা.-কে গভর্নর ও প্রধান দাই হিসেবে প্রেরণ করেন। ইয়েমেনের সমাজটি ছিল মক্কার পৌত্তলিক সমাজ থেকে ভিন্ন; সেখানে আহলে কিতাব বা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় উপস্থিতি ছিল। এই কারণে রাসুলুল্লাহ সা. মুআয রা.-কে প্রেরণের সময় বিশেষ কূটনৈতিক ও শিক্ষামূলক নির্দেশনা প্রদান করেন, যা দাওয়াতী কাজের ক্ষেত্রে একটি কালজয়ী মূলনীতি হিসেবে গণ্য হয় [5]

রাসুলুল্লাহ সা. মুআয বিন জাবাল রা.-কে বিদায় জানানোর সময় যে ঐতিহাসিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তা নিম্নরূপ:

«يَسِّرَا وَلَا تُعَسِّرَا، وَبَشِّرَا وَلَا تُنَفِّرَا، وَتَطَاوَعَا وَلَا تَخْتَلِفَا»

অনুবাদ:

"তোমরা উভয়ই (লোকদের জন্য) সহজ করবে, কঠিন করবে না; সুসংবাদ দেবে, বিতৃষ্ণ করবে না এবং পরস্পর একমত হবে, মতবিরোধ করবে না।" [6] । এই নির্দেশনাটি ছিল মূলত মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক কূটনীতির মূল চাবিকাঠি। রাসুলুল্লাহ সা. তাঁকে আরও নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন প্রথমে তাওহিদ ও রিসালাতের দাওয়াত দেন, এরপর পর্যায়ক্রমে সালাত, যাকাত এবং অন্যান্য বিধানের দিকে আহ্বান জানান। এই ক্রমানুসারী পদ্ধতি (Gradualism) প্রমাণ করে যে, ইসলামি দাওয়াত কোনো আকস্মিক চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থা নয়, বরং এটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক সক্ষমতাকে বিবেচনায় নিয়ে পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া।

মুআয বিন জাবাল রা. ইয়েমেনে কেবল ধর্মীয় অনুশাসন প্রচার করেননি, বরং তিনি সেখানে একটি ন্যায়ভিত্তিক বিচার ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সংস্কার গড়ে তোলেন। তাঁর বিচারিক প্রজ্ঞা এত উন্নত ছিল যে, রাসুলুল্লাহ সা. যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "তুমি কীভাবে বিচার করবে?" তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, "আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী।" রাসুলুল্লাহ সা. আবার জিজ্ঞেস করলেন, "যদি আল্লাহর কিতাবে তা না পাও?" তিনি বললেন, "রাসুলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহ অনুযায়ী।" রাসুলুল্লাহ সা. পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, "যদি সেখানেও না পাও?" মুআয রা. উত্তর দিলেন, "আমি আমার বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা প্রয়োগ করে ইজতিহাদ করব এবং এতে কোনো কমতি করব না।" এই উত্তর শুনে রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন [7] । মুআয রা.-এর এই বিচারিক স্বাধীনতা এবং স্থানীয় জনগণের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ ইয়েমেনের জনগণকে ইসলামের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট করে, যা ছিল মদিনা রাষ্ট্রের সফট পাওয়ারের এক অনন্য বাস্তবায়ন [8]

দাওয়াত বিল কুদওয়াহ: উসমান ও আলি (রা.)-এর চারিত্রিক মাধুর্য ও 'সফট পাওয়ার'

ইসলামি দাওয়াতের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো 'দাওয়াত বিল কুদওয়াহ' বা আচরণের মাধ্যমে দাওয়াত। রাসুলুল্লাহ সা.-এর সাহাবিগণের ব্যক্তিগত চরিত্র, সততা, বিনয় এবং ন্যায়পরায়ণতা তৎকালীন সমাজের মানুষের কাছে ইসলামের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল। হযরত উসমান বিন আফফান রা. এবং হযরত আলি বিন আবী তালিব রা.-এর দাওয়াতী জীবন ও চরিত্র বিশ্লেষণ করলে এই 'সফট পাওয়ার'-এর গভীর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উসমান রা.-এর চরিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর চরম লজ্জাশীলতা ও বিনয়, যা প্রতিপক্ষকেও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বাধ্য করত [9]

হযরত উসমান রা.-এর এই লজ্জাশীলতা ও উদারতা কেবল ব্যক্তিগত গুণ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি কার্যকর দাওয়াতী ও সামাজিক শক্তি (قوة الحياء الناعمة)। হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় যখন রাসুলুল্লাহ সা. তাঁকে মক্কার কুরাইশদের সাথে আলোচনার জন্য দূত হিসেবে প্রেরণ করেন, তখন কুরাইশরা তাঁর আভিজাত্য, বিনয় এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখে মুগ্ধ হয়েছিল। কুরাইশরা তাঁকে এককভাবে কাবা শরিফ তাওয়াফ করার প্রস্তাব দিলেও তিনি রাসুলুল্লাহ সা.-কে ছাড়া তা করতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁর এই চারিত্রিক একনিষ্ঠতা ও বিশ্বস্ততা মক্কার কাফিরদের মনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক রেখাপাত করেছিল, যা পরবর্তীতে অনেকের ইসলাম গ্রহণের পথ সুগম করে [10]

অন্যদিকে, হযরত আলি বিন আবী তালিব রা. ছিলেন জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং বীরত্বের এক অনন্য সমন্বয়। রাসুলুল্লাহ সা. যখন তাঁকে ইয়েমেনে দাওয়াতী মিশনে প্রেরণ করেন, তখন আলি রা. তাঁর তরুণ বয়সের কারণে কিছুটা দ্বিধান্বিত ছিলেন যে তিনি কীভাবে সেখানকার প্রবীণ ও অভিজ্ঞ লোকদের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনা করবেন। তখন রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর বুকে হাত রেখে দুআ করেন এবং বলেন, "আল্লাহ তোমার অন্তরকে হেদায়েত করবেন এবং তোমার জিহ্বাকে অবিচল রাখবেন।" ইয়েমেনে গিয়ে আলি রা. তাঁর অসাধারণ বিচারিক প্রজ্ঞা এবং ন্যায়পরায়ণতার মাধ্যমে সেখানকার হামদান গোত্রকে মাত্র এক দিনে ইসলামে দীক্ষিত করতে সক্ষম হন। কোনো প্রকার যুদ্ধ বা রক্তপাত ছাড়াই কেবল ন্যায়বিচার এবং বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ গোত্রকে জয় করার এই ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে দাওয়াত বিল কুদওয়াহর এক উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত [11]

ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রতিরোধমূলক কূটনীতি (Preventive Diplomacy)

রাসুলুল্লাহ সা. কর্তৃক বিভিন্ন অঞ্চলে দাই বা দাওয়াতী কর্মী প্রেরণের এই কৌশলটি কেবল ধর্মীয় প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন ভূ-রাজনীতিতে মদিনা রাষ্ট্রের অবস্থান সুদৃঢ় করার একটি অত্যন্ত কার্যকর 'প্রতিরোধমূলক কূটনীতি' (Preventive Diplomacy)। তৎকালীন আরবে রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের মতো পরাশক্তিগুলোর প্রভাব ছিল অত্যন্ত প্রবল। এই পরাশক্তিগুলোর আগ্রাসী নীতির বিপরীতে মদিনা রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে এবং এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাসুলুল্লাহ সা. সামরিক শক্তির চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক প্রভাববলয় তৈরিতে বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন। দাই প্রেরণের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন গোত্র ও অঞ্চলের সাথে এমন এক আদর্শিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, যা মদিনার বিরুদ্ধে কোনো সম্ভাব্য সামরিক জোট গঠনে বাধা সৃষ্টি করত [Thomas Arnold,

The Preaching of Islam: A History of the Propagation of the Muslim Faith, p. 45]।

এই প্রতিরোধমূলক কূটনীতির অন্যতম উদাহরণ হলো আরবের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী অঞ্চলে দাই প্রেরণ। এর মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. মদিনা রাষ্ট্রের চারপাশের গোত্রগুলোকে হয় ইসলামে দীক্ষিত করেছিলেন, অথবা তাদের সাথে অনাগ্রাসন চুক্তি (Non-Aggression Pact) স্বাক্ষর করেছিলেন। এর ফলে মদিনা রাষ্ট্র একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয় লাভ করে, যা বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে সাহায্য করেছিল। এই কৌশলটি আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের 'কালেক্টিভ সিকিউরিটি' (Collective Security) বা যৌথ নিরাপত্তা ধারণার সাথে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে সামরিক সংঘাত এড়াতে আদর্শিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় [Dr. Muhammad Hamidullah,

The Muslim Conduct of State, p. 112]।

ইসলামের এই সফট পাওয়ার মডেলের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। রাসুলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকালের পরও এই দাওয়াতী মডেলের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (যেমন ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া) এবং পূর্ব আফ্রিকায় কোনো প্রকার সামরিক অভিযান ছাড়াই কেবল মুসলিম ব্যবসায়ী ও সুফি-সাধকদের চারিত্রিক মাধুর্য ও সততার মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। থমাস আর্নল্ড তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, তলোয়ারের জোরে নয়, বরং ইসলামের এই অভ্যন্তরীণ নৈতিক আকর্ষণ এবং দাইদের নিঃস্বার্থ জীবনযাত্রাই ছিল ইসলাম প্রচারের মূল চালিকাশক্তি [Thomas Arnold,

The Preaching of Islam, p. 89]। রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই কালজয়ী সফট পাওয়ার মডেলটি প্রমাণ করে যে, মানুষের মন ও মস্তিষ্ক জয় করার জন্য সামরিক শক্তির চেয়ে নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির কার্যকারিতা অনেক বেশি স্থায়ী ও গভীর [12]

""
১.২.২ 'দাই' (Dawah Workers) প্রেরণ: একটি আধুনিক 'সফট পাওয়ার' (Soft Power) মডেল
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১.২.২ 'দাই' (Dawah Workers) প্রেরণ: একটি আধুনিক 'সফট পাওয়ার' (Soft Power) মডেল কুইজ

1 / 5

'দাই' বা Dawah Workers প্রেরণকে কোন আধুনিক ধারণার সাথে তুলনা করা হয়েছে?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...