৭.১ ইয়েমেনের জিও-পলিটিক্স: পারস্য সাম্রাজ্যের (সাসানীয়) প্রভাব বলয় থেকে মুক্ত হয়ে মদিনার সাথে ডিপ্লোম্যাটিক অ্যালাইনমেন্ট (Diplomatic Alignment)
সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভিক দশকে আরব উপদ্বীপের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র ছিল অত্যন্ত জটিল এবং বৈচিত্র্যময়। এই সময়ের প্রেক্ষাপটে ইয়েমেন কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তি—পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্য এবং রোমানদের বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের একটি প্রধান রণক্ষেত্র বা 'প্রক্সি ওয়ার জোন'। ইয়েমেনের কৌশলগত অবস্থান, বিশেষ করে বাব-আল-মান্দেব প্রণালী এবং লোহিত সাগরের উপকূলীয় নিয়ন্ত্রণ, একে বিশ্ব বাণিজ্যের একটি অপরিহার্য কেন্দ্রে পরিণত করেছিল। এই নিবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব কীভাবে ইয়েমেন দীর্ঘস্থায়ী পারস্য প্রভাব বলয় থেকে বিচ্যুত হয়ে মদিনার নবগঠিত ইসলামি রাষ্ট্রের সাথে একটি নতুন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণ (Diplomatic Alignment) স্থাপন করেছিল।
পারস্য সাম্রাজ্যের (সাসানীয়) ছায়া ও ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতে পারস্য বা সাসানীয় সাম্রাজ্যের প্রভাব ছিল সুগভীর এবং বহুমাত্রিক। পারস্য কেবল সামরিক শক্তির মাধ্যমে নয়, বরং জনতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশের মাধ্যমেও ইয়েমেনের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র অনুযায়ী, ইয়েমেনের অভ্যন্তরে পারস্য বংশোদ্ভূত মানুষের উপস্থিতি ছিল একটি বাস্তব সত্য, যা পারস্যের রাজনৈতিক প্রভাবকে সুসংহত করেছিল।
أي أبناء أهل فارس في اليمن [1] উপরোক্ত আরবি ইবারতটি নির্দেশ করে যে, ইয়েমেনের ভূখণ্ডে পারস্য বংশোদ্ভূত বা পারস্যের অনুসারী জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিদ্যমান ছিল। এই জনতাত্ত্বিক উপস্থিতি কেবল বাণিজ্যিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ইয়েমেনের স্থানীয় গোত্রীয় রাজনীতিতে পারস্যের একটি 'ইনফ্লুয়েন্স গ্রুপ' হিসেবে কাজ করত। সাসানীয় সাম্রাজ্য ইয়েমেনের উপকূলীয় অঞ্চল এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য এই গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করত। ফলে, ইয়েমেনের তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী এবং অভিজাত শ্রেণির একটি বড় অংশ পারস্যের রাজনৈতিক এজেন্ডার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।
এই পারস্য প্রভাব বলয় ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বকে একটি সংকীর্ণ পরিসরে আবদ্ধ করে ফেলেছিল। ইয়েমেনের গোত্রীয় কাঠামো যখন নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছিল, তখন পারস্যের এই হস্তক্ষেপ একটি 'চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স' হিসেবে কাজ করত, যা মূলত ইয়েমেনের স্বকীয়তা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে খর্ব করে আসছিল। পারস্যের এই আধিপত্য কেবল সামরিক নয়, বরং অর্থনৈতিকভাবেও ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যবর্তী বাণিজ্যের একটি বিশাল অংশ পারস্যের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল, যা ইয়েমেনের অর্থনৈতিক মেরুকরণকে পারস্যের দিকে ধাবিত করেছিল।
সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইয়েমেনের কিছু শক্তিশালী গোত্র পারস্যের পৃষ্ঠপোষকতা গ্রহণ করেছিল যাতে তারা প্রতিবেশী গোত্রগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। এই 'প্রক্সি পলিটিক্স' ইয়েমেনের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে দিচ্ছিল। [2] । এই কিতাব অনুযায়ী, আরব উপদ্বীপের গোত্রীয় বিন্যাস অত্যন্ত জটিল ছিল এবং পারস্যের মতো বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপ এই জটিলতাকে আরও বৃদ্ধি করেছিল। ফলে, ইয়েমেনের রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল একদিকে পারস্যের সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষা এবং অন্যদিকে স্থানীয় গোত্রীয় স্বায়ত্তশাসনের মধ্যকার এক নিরন্তর সংঘাতের ক্ষেত্র।
সান'আ: কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব
ইয়েমেনের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বুঝতে হলে এর প্রধান কেন্দ্রবিন্দু সান'আ (Sana'a) শহরের কৌশলগত অবস্থান বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য। সান'আ কেবল একটি জনপদ ছিল না, বরং এটি ছিল ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার মূল ভিত্তি। এই শহরটি ইয়েমেনের উচ্চভূমি এবং কৌশলগত বাণিজ্য পথগুলোর সংযোগস্থলে অবস্থিত ছিল।
صنعاء اليمن هي قاعدة اليمن وأكبر مدنها [3] উপরোক্ত ইবারতটি নিশ্চিত করে যে, সান'আ ছিল ইয়েমেনের মূল ঘাঁটি বা 'বেস' এবং দেশটির বৃহত্তম শহর। একটি অঞ্চলের 'কুইড প্রোরো' বা মূল কেন্দ্র হিসেবে সান'আ-র গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। যে কোনো শক্তি যদি ইয়েমেনের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চাইত, তবে সান'আ নিয়ন্ত্রণ করা ছিল তাদের জন্য একটি অপরিহার্য শর্ত। পারস্য সাম্রাজ্য তাদের প্রভাব বিস্তারের জন্য সান'আ-র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে প্রভাবিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছিল।
সান'আ-র ভৌগোলিক অবস্থান একে একটি প্রাকৃতিক দুর্গের মতো সুরক্ষা প্রদান করত, যা একই সাথে একে একটি বাণিজ্যিক হাব হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এই শহরটি কেবল ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল না, বরং এটি ছিল দক্ষিণ আরব থেকে উত্তর আরবের দিকে ধাবিত হওয়া সুগন্ধি (Incense) ও মশলা বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। এই বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণই ছিল পারস্য ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মূল কারণ। সান'আ-র ওপর নিয়ন্ত্রণ মানে ছিল সমগ্র দক্ষিণ আরবের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সান'আ-র নিয়ন্ত্রণ ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ গোত্রীয় ভারসাম্য রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যে কোনো শাসক বা সাম্রাজ্য যদি সান'আ-র ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারত, তবে তারা সহজেই ইয়েমেনের অন্যান্য উপত্যকা ও গোত্রগুলোকে তাদের অনুগত করতে পারত। পারস্যের প্রভাব বলয় মূলত এই সান'আ-কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতো, যা ইয়েমেনের অন্যান্য অঞ্চলের রাজনৈতিক গতিশীলতাকে সীমিত করে দিচ্ছিল। এই কারণে, মদিনার সাথে ইয়েমেনের সম্ভাব্য কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে সান'আ-র রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
মদিনার সাথে কূটনৈতিক মেরুকরণ: একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে মদিনার নবগঠিত ইসলামি রাষ্ট্রের উত্থান ইয়েমেনের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করে। দীর্ঘকাল পারস্য ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের প্রভাব বলয়ে থাকা ইয়েমেনের জন্য মদিনার সাথে 'ডিপ্লোম্যাটিক অ্যালাইনমেন্ট' বা কূটনৈতিক মেরুকরণ ছিল একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এটি কেবল একটি ধর্মীয় পরিবর্তন ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত ভূ-রাজনৈতিক কৌশল যা ইয়েমেনের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন পুনরুদ্ধারের একটি পথ হিসেবে কাজ করেছিল।
মদিনার সাথে ইয়েমেনের এই কূটনৈতিক ঝোঁক বা অ্যালাইনমেন্টের পেছনে বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কারণ বিদ্যমান ছিল। প্রথমত, পারস্যের সাম্রাজ্যবাদী চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ইয়েমেনের গোত্রীয় নেতাদের মধ্যে প্রবল হয়ে উঠেছিল। মদিনার নেতৃত্ব ইয়েমেনের গোত্রগুলোকে একটি নতুন ও সমমর্যাদার পরিচয় প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল, যা পারস্যের অধীনস্থ 'ভ্যাসাল স্টেট' বা অনুগত রাজ্যের মর্যাদার চেয়ে অনেক উন্নত ছিল। এই নতুন রাজনৈতিক মডেলটি ইয়েমেনের অভিজাত ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি নতুন আত্মপরিচয় ও রাজনৈতিক সংহতি তৈরি করেছিল।
দ্বিতীয়ত, মদিনার সাথে এই অ্যালাইনমেন্ট ইয়েমেনের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছিল। পারস্যের আধিপত্য ছিল মূলত শোষণমূলক, যেখানে ইয়েমেনের সম্পদ ও বাণিজ্য পথগুলো পারস্যের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে ব্যবহৃত হতো। বিপরীতে, মদিনার সাথে একটি নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোট গঠনের মাধ্যমে ইয়েমেনের গোত্রগুলো তাদের নিজস্ব সম্পদ ও বাণিজ্যের ওপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ লাভের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছিল। এটি ছিল একটি 'পাওয়ার শিফট' বা ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের প্রক্রিয়া, যেখানে ইয়েমেন তার পুরনো সাম্রাজ্যবাদী প্রভুর পরিবর্তে একটি নতুন ও শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তির সাথে মিত্রতা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল।
তৃতীয়ত, এই কূটনৈতিক মেরুকরণ ইয়েমেনের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে পুনর্নির্ধারণ করেছিল। মদিনার সাথে ইয়েমেনের এই সম্ভাব্য জোট লোহিত সাগরের নিরাপত্তা এবং আরব উপদ্বীপের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। এটি পারস্যের দক্ষিণমুখী সম্প্রসারণের পথে একটি বড় বাধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। মদিনার সাথে ইয়েমেনের এই অ্যালাইনমেন্ট কেবল একটি আঞ্চলিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির একটি নতুন সমীকরণ, যা পারস্য ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্যকে আমূল বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখছিল। এই পরিবর্তনের ফলে ইয়েমেনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব একটি নতুন ও শক্তিশালী আদর্শিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে ধাবিত হতে শুরু করে, যা পরবর্তীকালে সমগ্র আরব উপদ্বীপের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।