খণ্ড 97
ফন্ট:100%
থিম:

১১.৫০ তাবারীর হিস্টোরিওগ্রাফিতে মহাজাগতিক সময়ের (Cosmic Time) সাথে ঐতিহাসিক সময়ের (Historical Time) ফিলোসফিক্যাল কানেকশন

ইমাম আবু জাফর মুহাম্মাদ ইবনে জারির তাবারী (রহ.)-এর ইতিহাসতত্ত্ব বা হিস্টোরিওগ্রাফি কেবল কতগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনার কালানুক্রমিক সংকলন নয়; বরং এটি একটি সুসংহত অধিবিদ্যক (Metaphysical) ও দার্শনিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাবারীর কালজয়ী গ্রন্থ 'তারিখ আল-রুসুল ওয়াল মুলুক' (নবিদের ইতিহাস ও রাজাদের ইতিহাস) পাঠ করলে দেখা যায়, তিনি ইতিহাসের সূচনা করেছেন মানবসভ্যতার কোনো নির্দিষ্ট কালখণ্ড দিয়ে নয়, বরং মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব বা কসমোলজি (Cosmology) দিয়ে। এই পদ্ধতিগত বৈশিষ্ট্যটি তাবারীর দর্শনে 'মহাজাগতিক সময়' (Cosmic Time) এবং 'ঐতিহাসিক সময়' (Historical Time)-এর মধ্যে একটি অবিচ্ছেদ্য ও গভীর সংযোগ স্থাপন করে। তাবারীর দৃষ্টিতে ইতিহাস হলো মহাজাগতিক শৃঙ্খলা থেকে মানবিয় ঘটনাবলির দিকে ধাবিত হওয়ার একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া।

তাবারীর এই বিশাল কর্মযজ্ঞের গাম্ভীর্য ও গভীরতা অনুধাবন করতে হলে আমাদের বুঝতে হবে যে, তিনি ইতিহাসকে কেবল 'ঘটনাপ্রবাহ' হিসেবে দেখেননি, বরং একে দেখেছেন 'ঐশ্বরিক অভিপ্রায়' (Divine Will)-এর বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। তাঁর বর্ণনার শৈলী ও কাঠামো নির্দেশ করে যে, মহাবিশ্বের আদিমতম মুহূর্ত থেকে শুরু করে ইসলামের উত্থান পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায় একটি বৃহত্তর মহাজাগতিক পরিকল্পনার অংশ। এই দর্শনে মহাজাগতিক সময় হলো সেই অসীম ও শাশ্বত প্রেক্ষাপট, যার ওপর ভিত্তি করে মানবিয় ঐতিহাসিক সময় বা ক্রনোলজি (Chronology) নির্মিত হয়েছে।

মহাজাগতিক কাল ও সৃষ্টির আদিমতা: তাবারীর কসমোলজিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক

তাবারীর ইতিহাসতত্ত্বের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সৃষ্টির আদিমতা বা 'বিদায়েত আল-খালক' (Bidayat al-Khalq)-এর বিস্তারিত বর্ণনা। তিনি যখন মহাবিশ্বের সৃষ্টি, আসমান ও জমিনের গঠন এবং ফেরেশতা ও জিন জাতির অস্তিত্ব নিয়ে আলোচনা করেন, তখন তিনি মূলত 'মহাজাগতিক সময়' বা Cosmic Time-এর অন্তর্ভুক্ত হন। এই সময়টি মানুষের পরিমাপযোগ্য বা ঘড়ির কাঁটার গতিশীল সময়ের ঊর্ধ্বে। এটি একটি অতীন্দ্রিয় ও শাশ্বত সময়কাল, যেখানে কার্যকারণ সম্পর্ক (Causality) মানুষের যুক্তির চেয়ে ঐশ্বরিক নির্দেশের ওপর অধিক নির্ভরশীল।

তাবারী তাঁর বর্ণনায় সৃষ্টির এই আদিম পর্যায়কে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর এই পদ্ধতিগত বিন্যাস প্রমাণ করে যে, ইতিহাস কেবল মানুষের কর্মকাণ্ডের সমষ্টি নয়, বরং এটি মহাজাগতিক অস্তিত্বের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি যখন সৃষ্টির আদি মুহূর্তের কথা বলেন, তখন তিনি মূলত ইতিহাসের সেই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন যা পরবর্তীকালে মানবিয় ইতিহাসকে একটি অর্থবহ ও উদ্দেশ্যমূলক রূপ দান করে। এই পর্যায়ে তাবারীর বর্ণনাগুলো অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং তা মহাজাগতিক শৃঙ্খলার (Cosmic Order) ওপর আলোকপাত করে।


وكان عالما بالطب. (প্রদত্ত প্রেক্ষাপট অনুযায়ী তাবারীর জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যাপকতা ও বিজ্ঞানের সাথে সংযোগের ইঙ্গিতবাহী)

তাবারীর এই জ্ঞানতাত্ত্বিক বিশালতা কেবল ইতিহাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তিনি মহাবিশ্বের প্রতিটি উপাদানকে ইতিহাসের একটি সম্ভাব্য উপাদান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক ভূ-রাজনীতি বা জিপোলাইটিক্সের (Geopolitics) সেই ধারণার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, যেখানে ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ কোনো জাতির ইতিহাস নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করে। তাবারীর কাছে মহাজাগতিক সময় হলো সেই বিশাল মঞ্চ, যেখানে মানব ইতিহাসের নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

মহাজাগতিক ও ঐতিহাসিক সময়ের সংযোগস্থল: নবুওয়াত ও ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ

মহাজাগতিক সময় (Cosmic Time) এবং ঐতিহাসিক সময় (Historical Time)-এর মধ্যে সংযোগ স্থাপনের প্রধান মাধ্যম হলো 'নবুওয়াত' বা নবিগণের আগমন। তাবারীর হিস্টোরিওগ্রাফিতে যখন মহাজাগতিক সৃষ্টির বর্ণনা শেষ হয় এবং মানবজাতির ইতিহাস শুরু হয়, তখন এই দুই সময়ের মধ্যে একটি দার্শনিক সেতু বা 'ব্রিজ' তৈরি হয়। এই সেতুটি হলো ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ বা 'Divine Intervention'। মহাবিশ্বের সৃষ্টিগত নিয়ম যখন মানবিয় সমাজ ও রাজনৈতিক কাঠামোর সাথে মিলিত হয়, তখনই প্রকৃত অর্থে 'ইতিহাস' বা 'তারিখ' শুরু হয়।

তাবারী দেখিয়েছেন যে, মহাজাগতিক নিয়মাবলি (Laws of Nature) এবং ঐশ্বরিক বিধান (Divine Law) পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পরিপূরক। যখন কোনো নবি সা. পৃথিবীতে আগমন করেন, তখন তিনি মূলত মহাজাগতিক সত্যকে ঐতিহাসিক বাস্তবতার সাথে সংযুক্ত করেন। নবুওয়াতের মাধ্যমে মহাজাগতিক সময়ের সেই শাশ্বত ও নৈতিক মানদণ্ডগুলো মানবিয় সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এই প্রক্রিয়ায় তাবারী ইতিহাসকে কেবল 'কী ঘটেছিল' তার বর্ণনায় সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং 'কেন ঘটেছিল' তার দার্শনিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন।

তাবারীর এই সংযোগ স্থাপনের কৌশলটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। তিনি যখন আদম (আ.) থেকে শুরু করে পরবর্তী নবিদের কাহিনী বর্ণনা করেন, তখন তিনি মূলত মহাজাগতিক শৃঙ্খলা থেকে মানবিয় বিশৃঙ্খলা (Chaos) এবং পুনরায় ঐশ্বরিক নির্দেশনার মাধ্যমে সেই বিশৃঙ্খলাকে শৃঙ্খলায় আনার একটি প্রক্রিয়া চিত্রিত করেন। এই transition বা রূপান্তরটিই তাবারীর দর্শনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। এখানে ঐতিহাসিক সময় আর বিচ্ছিন্ন কোনো কালখণ্ড নয়, বরং তা মহাজাগতিক সময়ের একটি সুনির্দিষ্ট ও উদ্দেশ্যমূলক সম্প্রসারণ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

ঐতিহাসিক কাল ও মানবিয় এজেন্সির বিবর্তন: তাবারীর ক্রনোলজিক্যাল বিশ্লেষণ

যখন তাবারী মহাজাগতিক প্রেক্ষাপট অতিক্রম করে মানবিয় ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করেন, তখন তিনি 'ঐতিহাসিক সময়' বা Historical Time-এর ওপর আলোকপাত করেন। এই সময়টি মানুষের কর্মকাণ্ড, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, যুদ্ধবিগ্রহ এবং রাজনৈতিক কূটনীতির (Diplomacy) মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। তাবারীর কাছে এই ঐতিহাসিক সময়টি একটি রৈখিক (Linear) গতিপথ অনুসরণ করে, যা সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ বা কিয়ামত পর্যন্ত বিস্তৃত।

তাবারীর বর্ণনায় রাজবংশগুলোর উত্থান-পতন এবং বিভিন্ন জাতির আধিপত্য কেবল ক্ষমতার লড়াই হিসেবে নয়, বরং একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক নিয়মের অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন যে, মানুষের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কৌশলগুলো (Geopolitical maneuvers) মূলত সেই মহাজাগতিক ও নৈতিক নিয়মের অধীন যা সৃষ্টির শুরু থেকেই বিদ্যমান। তাবারীর এই দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসকে একটি 'টেলিওলজিক্যাল' (Teleological) বা উদ্দেশ্যমুখী রূপ দান করে, যেখানে প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনা একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

তাবারীর এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মানদণ্ড হিসেবে বলা যায় যে, তিনি ছিলেন একজন العالم العلامة (মহাজ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ পণ্ডিত)।। তাঁর এই জ্ঞানতাত্ত্বিক গভীরতা তাঁকে কেবল একজন তথ্য সংগ্রাহক হিসেবে নয়, বরং একজন দার্শনিক ইতিহাসবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি যখন কোনো যুদ্ধের বর্ণনা দেন বা কোনো শাসকের শাসনকাল বিশ্লেষণ করেন, তখন তিনি মূলত সেই ঘটনার ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলার সাথে তার সামঞ্জস্যতা বিচার করেন।

তাবারীর দর্শনে সময়ের একীভূতকরণ: একটি দার্শনিক সংশ্লেষণ

পরিশেষে, তাবারীর হিস্টোরিওগ্রাফিতে মহাজাগতিক সময় এবং ঐতিহাসিক সময়ের মধ্যে কোনো বিচ্ছিন্নতা নেই; বরং তাদের মধ্যে একটি গভীর ও অবিচ্ছেদ্য দার্শনিক সংশ্লেষণ (Philosophical Synthesis) বিদ্যমান। তাবারীর মতে, মহাজাগতিক সময় হলো সেই 'অস্তিত্বের ভিত্তি' (Ontological Foundation), আর ঐতিহাসিক সময় হলো সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা 'ঘটনার প্রবাহ' (Phenomenological Flow)। মহাজাগতিক সময় যদি হয় একটি বিশাল সমুদ্র, তবে ঐতিহাসিক সময় হলো সেই সমুদ্রের ঢেউ, যা সমুদ্রের নিয়ম মেনেই সৃষ্টি ও ধ্বংস হয়।

তাবারীর এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিককালের 'কালেক্টভ সিকিউরিটি' (Collective Security) বা সামাজিক শৃঙ্খলার ধারণার সাথেও এক প্রকার দার্শনিক সাদৃশ্য রাখে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মহাবিশ্বের প্রতিটি অণু-পরমাণু এবং মানব ইতিহাসের প্রতিটি ঘটনা একটি বৃহত্তর ঐশ্বরিক ও মহাজাগতিক শৃঙ্খলার অংশ। এই শৃঙ্খলাই সভ্যতাকে রক্ষা করে এবং বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তি দেয়। তাবারীর এই বিশাল ইতিহাসতত্ত্ব পাঠ করলে বোঝা যায় যে, তিনি কেবল অতীতকে পুনর্নির্মাণ করেননি, বরং অতীতকে মহাজাগতিক ও ঐশ্বরিক প্রেক্ষাপটে নতুন এক অর্থ প্রদান করেছেন।

তাবারীর এই ঐতিহাসিক দর্শনটি পাঠকদের এই উপলব্ধিতে পৌঁছে দেয় যে, মানুষের ইতিহাস বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনাপ্রবাহ নয়। বরং এটি মহাবিশ্বের সৃষ্টির সেই আদিম মুহূর্ত থেকে শুরু হওয়া এক মহাকাব্যিক যাত্রা, যা মহাজাগতিক নিয়মের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মানবসভ্যতার প্রতিটি ধাপে তার পদচিহ্ন রেখে চলেছে। তাঁর এই পদ্ধতিগত ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে ইতিহাসের জগতে এক অনন্য ও চিরস্থায়ী উচ্চতা প্রদান করেছে।

""
১১.৫০ তাবারীর হিস্টোরিওগ্রাফিতে মহাজাগতিক সময়ের (Cosmic Time) সাথে ঐতিহাসিক সময়ের (Historical Time) ফিলোসফিক্যাল কানেকশন
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১১.৫০ তাবারীর হিস্টোরিওগ্রাফিতে মহাজাগতিক সময়ের (Cosmic Time) সাথে ঐতিহাসিক সময়ের (Historical Time) ফিলোসফিক্যাল কানেকশন কুইজ

1 / 5

তাবারীর ইতিহাসতত্ত্বের সূচনা হয়েছে কোনটি দিয়ে?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...