ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম অলৌকিক ও মহিমান্বিত ঘটনা হলো ইসরা ও মেরাজ। এই ঘটনাটি কেবল একটি আধ্যাত্মিক ভ্রমণ নয়, বরং এটি ইসলামের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যা মক্কার ভূখণ্ড থেকে ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাস এবং অতঃপর ঊর্ধ্বাকাশে মহান রবের সান্নিধ্য পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে এই মহিমান্বিত সফরের সুনির্দিষ্ট সময়কাল, মাস এবং দিন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ও কালানুক্রমিক গবেষণায় (Chronological Historiography) বিভিন্ন স্তরের বৈচিত্র্য ও বিতর্ক পরিলক্ষিত হয়। ঐতিহাসিকদের নিকট এই সফরের সঠিক সময়কাল নির্ণয় করা একটি জটিল বিষয় ছিল, কারণ তৎকালীন আরব্য সমাজ ও পরবর্তীকালের ইতিহাসবিদদের বর্ণনার মধ্যে মাস ও তারিখের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য বিদ্যমান।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ইসরা ও মেরাজের সময়কাল নির্ধারণের বিষয়টি কেবল একটি তারিখের বিষয় নয়; বরং এটি তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং নবুওয়াতের একটি বিশেষ সন্ধিক্ষণকে নির্দেশ করে। এই সফরের সময়কাল নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, তা মূলত বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ একে নির্দিষ্ট একটি মাসের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন, আবার কেউ কেউ একে নবুওয়াতের একটি বিশেষ বর্ষের সাথে মিলিয়েছেন। এই বৈচিত্র্যটি মূলত মৌখিক বর্ণনা এবং লিখিত ইতিহাসের সংকলন প্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক ফলাফল, যা গবেষকদের জন্য একটি গভীর বিশ্লেষণের ক্ষেত্র উন্মোচন করে।
ইসরা ও মেরাজের পারিভাষিক ও তাত্ত্বিক সংজ্ঞা
ঐতিহাসিক ও কালানুক্রমিক বিতর্কে প্রবেশের পূর্বে, এই সফরের স্বরূপ ও সংজ্ঞা স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা অপরিহার্য। ইসলামের ইতিহাসবিদ ও মুহাদ্দিসগণ 'ইসরা' এবং 'মেরাজ' শব্দ দুটিকে দুটি পৃথক কিন্তু অবিচ্ছেদ্য প্রক্রিয়ারূপে সংজ্ঞায়িত করেছেন। ইসরা হলো মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত নৈশকালীন ভ্রমণ, আর মেরাজ হলো ঊর্ধ্বাকাশে রবের সান্নিধ্যে আরোহণ। এই সফরের প্রকৃতি সম্পর্কেও ঐতিহাসিকদের মধ্যে গভীর তাত্ত্বিক আলোচনা রয়েছে।
সীরাত ও হাদিসের আলোকে ইসরা ও মেরাজের সংজ্ঞা নিম্নরূপভাবে প্রদান করা হয়েছে:
الإسراء: هو إذهاب الله نبيه محمدا صلّى الله عليه وسلّم من المسجد الحرام بمكة إلى المسجد الأقصى بإيلياء- مدينة القدس- في جزء من الليل، ثم رجوعه من ليلته.[1]
উপরোক্ত আরবি ইবারতটি নির্দেশ করে যে, ইসরা হলো মহান আল্লাহ কর্তৃক তাঁর নবি সা.-কে মক্কার মাসজিদুল হারাম থেকে ইলিয়া বা জেরুজালেমের মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত রাতের একটি অংশে নিয়ে যাওয়া এবং পুনরায় সেই রাতেই ফিরে আসা। অন্যদিকে, মেরাজ হলো এই সফরের পরবর্তী ধাপ, যেখানে নবি সা.-কে আসমানি স্তরসমূহে আরোহণ করানো হয়। এই সফরের প্রকৃতি বা মাধ্যম সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক রয়েছে—এটি কি কেবল রূহানি (আধ্যাত্মিক) ছিল নাকি শারীরিক (জাসানি)? অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য ও বিশুদ্ধ মতানুসারে, এই সফরটি ছিল রূহ ও শরীর উভয় অবস্থায় এবং এটি ছিল জাগ্রত অবস্থায় সম্পন্ন হওয়া একটি বাস্তব ঘটনা।
والصواب القول الأول: وهو أن الإسراء والمعراج في ليلة واحدة، وأن الإسراء والمعراج كان بروحه وجسده عليه الصلاة والسلام، وأنه كان يقظة لا...[2]
এই ইবারতটি নিশ্চিত করে যে, ইসরা ও মেরাজ একই রাতে সংঘটিত হয়েছিল এবং এটি নবি সা.-এর রূহ ও শরীর উভয় অবস্থায় সম্পন্ন হয়েছিল। এই তাত্ত্বিক ভিত্তিটি ঐতিহাসিকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যদি এটি কেবল স্বপ্ন বা রূহানি সফর হতো, তবে এর ঐতিহাসিক ও কালানুক্রমিক গুরুত্ব ভিন্ন হতো। কিন্তু যেহেতু এটি একটি শারীরিক ও বাস্তব ঘটনা, তাই এর সুনির্দিষ্ট সময়কাল ও তারিখ নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
মাস ও তারিখ নির্ধারণে ঐতিহাসিকদের মতভেদ
ইসরা ও মেরাজ কোন মাসে এবং কোন তারিখে সংঘটিত হয়েছিল, সে বিষয়ে ইসলামের ইতিহাসে কোনো একক ঐকমত্য নেই। বিভিন্ন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও মুহাদ্দিসগণ ভিন্ন ভিন্ন মাস ও তারিখের কথা উল্লেখ করেছেন, যা কালানুক্রমিক গবেষণায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই মতভেদগুলো মূলত বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রের ভিন্নতা থেকে উদ্ভূত।
ঐতিহাসিকদের বর্ণনার একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে উপস্থাপন করা হলো:
- আস-সুদী (রহ.): তাঁর মতে, ইসরা সংঘটিত হয়েছিল জিলকদ মাসে [3] ।
- ইবনে আবদিল বার (রহ.): তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ইসরা সংঘটিত হয়েছিল রবিউল আউয়াল মাসে [4] ।
- ইমাম আন-নববী (রহ.): তাঁর মতে, এই ঘটনাটি রজব মাসে সংঘটিত হয়েছিল [5] ।
- আল-ওয়াকিদী (রহ.): তাঁর বর্ণনায় ভিন্নতা রয়েছে, যা অন্যান্যদের মতের সাথে সাংঘর্ষিক [6] ।
তবে সমসাময়িক ও বহুল প্রচলিত মতানুসারে, অনেক গবেষক এবং ঐতিহাসিকগণ রজব মাসের ২৭ তারিখকে এই মহিমান্বিত সফরের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে গণ্য করেন। একটি উল্লেখযোগ্য সূত্র অনুযায়ী, এই ঘটনাটি নবুওয়াতের ১০ম বর্ষের রজব মাসের ২৭ তারিখ রাতে সংঘটিত হয়েছিল [7] । যদিও এই তারিখটি সর্বাধিক জনপ্রিয়, তবুও ঐতিহাসিকদের মধ্যে এর সত্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে, কারণ অন্যান্য মাস যেমন রবিউল আউয়াল বা জিলকদ সম্পর্কেও শক্তিশালী বর্ণনা বিদ্যমান।
এই মতভেদের কারণ হিসেবে ঐতিহাসিকগণ মূলত বর্ণনাকারীদের ভিন্ন ভিন্ন উৎস এবং তথ্যের পরম্পরাকে দায়ী করেন। প্রাচীন আরবে যখন ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা হচ্ছিল, তখন অনেক ক্ষেত্রে মৌখিক বর্ণনা বা 'হাদিস' থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হতো, যেখানে সময়ের সূক্ষ্মতা বা তারিখের ক্ষেত্রে সামান্য বিচ্যুতি ঘটার সম্ভাবনা থাকে। তবে এই মতভেদগুলো ইসলামের ইতিহাসের বৈচিত্র্যকে ফুটিয়ে তোলে এবং গবেষকদের আরও গভীর অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ করে।
কালানুক্রমিক অসংগতি ও ঐতিহাসিক গ্রন্থসমূহের বিশ্লেষণ
ইসলামি ইতিহাস রচনার বিভিন্ন ধ্রুপদী গ্রন্থে ইসরা ও মেরাজের সময়কাল নিয়ে যে তথ্য পাওয়া যায়, তা অত্যন্ত জটিল ও বৈচিত্র্যময়। বিশেষ করে 'মুরূজ আদ-জাহাব', 'আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত' এবং 'আন-নিহায়াতুল আরব'-এর মতো গ্রন্থগুলোতে সময়ের হিসাব নিয়ে যে অসংগতি দেখা যায়, তা গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
গ্রন্থভেদে সময়ের হিসাবগুলো নিম্নরূপ:
- মুরূজ আদ-জাহাব (৪/৩৫১): এখানে সময়ের একটি নির্দিষ্ট হিসাব প্রদান করা হয়েছে যা ৫ দিনের সাথে সম্পর্কিত [8] ।
- আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত (২/২৯৯) ও আন-নিহায়াতুল আরব (২৩/১৫২): এই গ্রন্থদ্বয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঘটনাটি রবিউল আখির মাসের মাঝামাঝি সময়ে ঘটেছিল [9] ।
- আল-মুনতাযাম (৬/৩২৪): এই গ্রন্থে বলা হয়েছে, ঘটনাটি রবিউল আখির মাসের ১৪ তারিখ, শনিবার রাতে সংঘটিত হয়েছিল [10] ।
- মুরূজ আদ-জাহাব (৪/৩৬৪): এখানে একটি ভিন্ন হিসাব প্রদান করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে নবুওয়াতের ৬ বছর ১১ মাস ৩ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর এই ঘটনা ঘটে [11] ।
- আল-ইকদ আল-ফারীদ ও আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত (২/২৯৯): এখানে বলা হয়েছে নবুওয়াতের ৬ বছর ১০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর এই ঘটনা ঘটে [12] ।
এই তথ্যের বিশাল বৈচিত্র্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ঐতিহাসিকগণ কেবল মাস বা দিন নয়, বরং নবুওয়াতের কততম বর্ষে এই ঘটনাটি ঘটেছে, তা নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন গণনার ওপর নির্ভর করেছেন। কেউ কেউ নবুওয়াতের ৬ বছর বা ১০ বছরের হিসাব দিয়েছেন, আবার কেউ কেউ ভিন্নতর সময়কাল উল্লেখ করেছেন। এই অসংগতিটি মূলত 'কালানুক্রমিক ইতিহাসতত্ত্বের' (Chronological Historiography) একটি জটিল দিক। ঐতিহাসিকদের এই ভিন্নতা মূলত তাদের ব্যবহৃত 'কালপঞ্জি' বা ক্যালেন্ডার পদ্ধতি এবং নবুওয়াতের শুরুর তারিখ নির্ধারণের ভিন্নতার কারণে হতে পারে।
তদুপরি, সময়ের এই ধারণাটি আরও গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় যে, প্রাচীন আরব্য পণ্ডিতগণ সময়ের সংজ্ঞা ও পরিমাপ নিয়ে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। 'মির'আত আল-জামান' গ্রন্থে সময়ের সংজ্ঞা প্রদান করতে গিয়ে বলা হয়েছে:
الزمان: اسمٌ لقليلِ الوقتِ وكثيره، وطويلِهِ وقصيرِه، ويُجمع على أزمان وأزمِنة وأَزْمُن.[13]
এই ইবারতটি নির্দেশ করে যে, 'জামান' বা সময় হলো স্বল্প বা দীর্ঘ, কম বা বেশি—যেকোনো সময়ের সমষ্টি। জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাজাগতিক গতির (حركات الفلك) ওপর ভিত্তি করে দিন ও রাতের সময়কাল নির্ধারিত হতো। এই বৈজ্ঞানিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত প্রেক্ষাপটটি বুঝতে পারলে বোঝা যায় কেন ঐতিহাসিকদের কাছে নির্দিষ্ট তারিখ বা মুহূর্ত নির্ধারণ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল। সময়ের এই গাণিতিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত জটিলতা ঐতিহাসিক বর্ণনার বৈচিত্র্যের একটি অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে সময়ের গুরুত্ব
ইসরা ও মেরাজের সময়কাল নির্ধারণের এই বিতর্কটি কেবল একটি গাণিতিক বা তারিখ সংক্রান্ত বিষয় নয়; বরং এর পেছনে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। নবুওয়াতের এই বিশেষ সময়ে মক্কাবাসীদের কঠোর বিরোধিতা এবং নবি সা.-এর ওপর নেমে আসা নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে এই সফরটি সম্পন্ন হয়েছিল। এই সফরের সময়কালটি ছিল নবি সা.-এর জন্য একটি বিশাল মানসিক প্রশান্তি ও ঐশ্বরিক সান্ত্বনার মুহূর্ত।
ঐতিহাসিকদের মতে, এই সফরের সময়কালটি এমন এক সন্ধিক্ষণে ছিল যখন ইসলামি দাওয়াতের জন্য মক্কায় পথ অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে ইসরা ও মেরাজের মতো একটি অলৌকিক ঘটনা কেবল একটি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা ছিল না, বরং এটি ছিল উম্মতের জন্য একটি রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয়। মক্কার কুরাইশদের আধিপত্য ও তাদের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের বিপরীতে, বায়তুল মুকাদ্দাস বা জেরুজালেমের সাথে মক্কার আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক সংযোগ স্থাপন করা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
পরিশেষে বলা যায়, ইসরা ও মেরাজের সময়কাল নিয়ে বিদ্যমান ঐতিহাসিক বিতর্কগুলো মূলত তথ্যের ভিন্নতা ও বর্ণনার বৈচিত্র্যের ফসল। যদিও রজব মাসের ২৭ তারিখটি সর্বাধিক স্বীকৃত, তবুও অন্যান্য ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলো ইসলামের ইতিহাসের বিশালতা ও এর জটিলতাকে নির্দেশ করে। এই কালানুক্রমিক বৈচিত্র্যগুলো কোনোভাবেই ঘটনার সত্যতাকে ক্ষুণ্ণ করে না, বরং এটি প্রমাণ করে যে, এই মহিমান্বিত ঘটনাটি ইতিহাসের পাতায় কতটা গভীর ও বহুমাত্রিক প্রভাব বিস্তার করেছিল। গবেষকদের জন্য এই ভিন্ন ভিন্ন মতবাদগুলো একটি গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে, যা ইসলামের ইতিহাসের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচনে সহায়তা করে।